দ্য গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণ

মিনিয়াপোলিসে ট্রাম্প প্রশাসনের অভিযানে ‘ফ্যাসিবাদের’ ছায়া

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ১২:৩৯ পিএম, ২৬ জানুয়ারি ২০২৬
ট্রাম্পের বিকৃত ছবি হাতে এক বিক্ষোভকারী/ ছবি: এএফপি

যুক্তরাষ্ট্রের মিনিয়াপোলিসে ফেডারেল অভিবাসন কর্মকর্তাদের অভিযানে সৃষ্ট আতঙ্ককে গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করছেন সমালোচকরা। গত শনিবার (২৪ জানুয়ারি) শহরের রাস্তায় ফেডারেল এজেন্টরা ৩৭ বছর বয়সী আইসিইউ নার্স অ্যালেক্স প্রেট্টিকে মাটিতে ফেলে গুলি করে হত্যা করেন।

ঘটনার সময় হেলমেট, গ্যাস মাস্ক ও বুলেটপ্রুফ ভেস্ট পরা এজেন্টদের অস্ত্র তাক করে প্রস্তুত হতে দেখা যায়। একটি টেলিভিশন মাইক্রোফোনে এক এজেন্টকে বলতে শোনা যায়, ‘এটা কল অব ডিউটির মতো’—একটি সামরিক ভিডিও গেমের নাম উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘দারুণ না?’

এই হত্যাকাণ্ডটি এমন এক এলাকায় ঘটে, যেখানে চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি রেনে গুড নামে আরেক মার্কিন নাগরিক অভিবাসন কর্মকর্তাদের গুলিতে নিহত হন। সেই স্থানটি আবার ২০২০ সালের মে মাসে পুলিশের হাতে জর্জ ফ্লয়েড নিহত হওয়ার জায়গা থেকে মাত্র এক মাইল দূরে।

আরও পড়ুন>>
যুক্তরাষ্ট্রে ফেডারেল এজেন্টদের গুলিতে আরও এক মার্কিনি নিহত
অভিবাসন কর্মকর্তার গুলিতে নারী নিহত, বিক্ষোভে উত্তাল যুক্তরাষ্ট্র
২ বছরের শিশুকে আটক করে ভিনরাজ্যে পাঠালো ট্রাম্পের আইসিই বাহিনী
অ্যালেক্স হত্যাকাণ্ড নিয়ে মিথ্যা বলছে ট্রাম্প প্রশাসন?

মিনিয়াপোলিসের মেয়র জ্যাকব ফ্রে প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘এই অভিযান বন্ধ করতে আর কত বাসিন্দা, কত মার্কিন নাগরিককে মরতে হবে?’ ঘটনার পর ক্ষুব্ধ জনতা ফেডারেল এজেন্টদের ‘কাপুরুষ’ বলে গালাগাল দেয় এবং শহর ছাড়ার আহ্বান জানায়।

নয় বছর আগে প্রথম অভিষেক ভাষণে ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘আমেরিকান ধ্বংসযজ্ঞ’-এর কথা বলেছিলেন। সমালোচকদের মতে, আইসিইউ ও অভিবাসন কর্মকর্তাদের বড় শহরের রাস্তায় নামিয়ে তিনি সেই ধ্বংসযজ্ঞই বাস্তবে রূপ দিচ্ছেন, যা অনেকের কাছে গৃহযুদ্ধ বা ভিডিও গেমের দৃশ্যের মতো মনে হচ্ছে।

দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বছরে ট্রাম্পের আইসিইউ মোতায়েন মূলত ডেমোক্র্যাটশাসিত ও কৃষ্ণাঙ্গ-নেতৃত্বাধীন শহরগুলোকে লক্ষ্য করে করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি এক ধরনের সমষ্টিগত শাস্তি আরোপ, যা স্বৈরাচারী শাসনের কৌশলের সঙ্গে তুলনীয়।

মিনেসোটায় ট্রাম্পের বিশেষ ক্ষোভের পেছনে রাজনৈতিক কারণও রয়েছে। তিনি ২০১৬, ২০২০ ও ২০২৪—এই তিনটি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রাজ্যটিতে হেরে যান। তবুও সম্প্রতি তিনি মিথ্যাভাবে দাবি করেন, তিনবারই তিনি মিনেসোটায় জিতেছেন। বাস্তবে ১৯৭২ সালের পর কোনো রিপাবলিকান প্রার্থী সেখানে জয়ী হননি।

মিনেসোটায় যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সোমালি সম্প্রদায় বসবাস করে। এ কারণে রাজ্যটি ট্রাম্পের বিরাগের লক্ষ্যবস্তু বলেও মনে করা হচ্ছে। চলতি সপ্তাহে তিনি সোমালিদের ‘নিম্ন আইকিউসম্পন্ন মানুষ’ বলে মন্তব্য করেন, যা ব্যাপকভাবে বর্ণবাদী বলে সমালোচিত হয়। এ রাজ্যেই সোমালি বংশোদ্ভূত কংগ্রেস সদস্য ইলহান ওমর ও গভর্নর টিম ওয়ালজের মতো ট্রাম্প-সমালোচক নেতারা রয়েছেন।

মিনেসোটায় বর্তমানে তিন হাজার আইসিইউ ও সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে, যা রাজ্যের বড় ১০টি পুলিশ সংস্থার সম্মিলিত সংখ্যার চেয়েও বেশি। অভিযোগ রয়েছে, পর্যাপ্ত উত্তেজনা প্রশমন প্রশিক্ষণ ছাড়াই তারা অস্ত্র ও ক্ষমতার দাপট দেখাচ্ছেন।

আইন পর্যবেক্ষকদের আটক, স্কুলশিক্ষার্থীদের ওপর টিয়ার গ্যাস ছোড়া, গাড়ি থেকে চালকদের টেনে নামানো—এমন নানা ঘটনার অভিযোগ উঠেছে। এমনকি আদিবাসীদেরও থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। শুধু এজেন্টদের ভিডিও করলেই ‘ঘরোয়া সন্ত্রাসী’ তকমা দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ।

সাংবাদিক ও ইতিহাসবিদ গ্যারেট গ্রাফ এ সপ্তাহে তার ডুমসডে সিনারিও ব্লগে লিখেছেন, ‘এটাই ফ্যাসিবাদের চেহারা। গণতন্ত্র ও স্বৈরতন্ত্রের মধ্যে কোনো স্পষ্ট সীমারেখা নেই—এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যুক্তরাষ্ট্রের একটি শহর এখন ফ্যাসিবাদী প্রেসিডেন্টের গোপন পুলিশের দখলে।’

শনিবারের দৃশ্য সেই বক্তব্যকেই সত্য বলে মনে করিয়ে দিচ্ছে। টেলিভিশনের ফুটেজে টিয়ার গ্যাসে আচ্ছন্ন রাস্তায় এক বিক্ষোভকারীকে চিৎকার করতে শোনা যায়, ‘আমি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক! আপনারা আমাকে মেরে ফেলবেন?’

নিহত অ্যালেক্স প্রেট্টিকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র দপ্তর দাবি করেছে, তিনি নাকি অস্ত্র হাতে এগিয়ে এসেছিলেন এবং আত্মরক্ষার্থে গুলি চালানো হয়েছে। তবে গভর্নর টিম ওয়ালজ এ বক্তব্যকে ‘অসুস্থকর’ আখ্যা দিয়ে কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন।

ঘটনাটি নিয়ে ডেমোক্র্যাট নেতাদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেকেই মিনিয়াপোলিস থেকে আইসিইউ প্রত্যাহার এবং তাদের অর্থায়ন বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।

কংগ্রেস সদস্য আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কোর্তেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘আমাদের সরকার রাস্তায় মার্কিন নাগরিকদের হত্যা করছে। সংবিধান ছিন্নভিন্ন হচ্ছে। প্রতিরোধ গড়ে তুলুন।’

বিশ্লেষকদের মতে, দাভোসে ট্রাম্পের আগ্রাসী নীতির বিরুদ্ধে যেমন পশ্চিমা নেতারা অবস্থান নিয়েছেন, তেমনি প্রেট্টির মৃত্যু যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও একটি বড় মোড় ঘোরানোর ঘটনা হয়ে উঠতে পারে।

ইলিনয়ের ডেমোক্র্যাটিক গভর্নর জেবি প্রিটজকার এমএস নাউ নেটওয়ার্ককে বলেছেন, ‘আমরা এক অনিশ্চিত মুহূর্তের মধ্যে আছি। আমরা যদি এটি এখনই বন্ধ না করি, তাহলে সত্যিই ভয়াবহ কিছুতে পরিণত হবে।’

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
কেএএ/

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।