নির্বাচন মানেই কি অর্থনীতির অস্থিরতা?

খান আরাফাত আলী
খান আরাফাত আলী খান আরাফাত আলী , সহ -সম্পাদক
প্রকাশিত: ০৫:৫০ পিএম, ২৭ জানুয়ারি ২০২৬
নির্বাচনের সময় অর্থনীতিতে দেখা যায় অস্থিরতা/ গ্রাফিকস: জাগোনিউজ

নির্বাচনের সময় কেন হঠাৎ বাজারে অস্থিরতা বাড়ে, বিনিয়োগ কেন থমকে যায়—এই প্রশ্ন নতুন নয়। সাধারণত ভোটের আগে অর্থনীতিতে কৃত্রিম চাঙাভাব দেখা যায়, আর ভোট শেষে শুরু হয় কঠোর বাস্তবতা। অর্থনীতিবিদরা একে ‘পলিটিক্যাল বিজনেস সাইকেল’ বলে অভিহিত করে থাকেন। এই চক্রে অর্থনীতিতে কখনো দেখা যায় বিরাট উত্থান, কখনো আচমকা পতন। তবে পরিস্থিতি কেমন হবে, সেটি নির্ভর করে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলোর ওপর।

নির্বাচনের সময় অর্থনীতিতে বেশ কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। যেমন:

১. সরকারি ব্যয়ের আধিক্য

নির্বাচনের আগে ক্ষমতাসীন সরকারগুলো সাধারণত জনপ্রিয় হতে চায়। ফলে তারা:

  • নতুন নতুন অবকাঠামো প্রকল্প (যেমন- রাস্তা, সেতু) দ্রুত শেষ করার চেষ্টা করে।
  • সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী বা ভাতার পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়।
  • প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর জন্য মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও বাজারে অর্থের সরবরাহ বাড়িয়ে দিতে পারে।

২. শেয়ার বাজারে অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা

বিনিয়োগকারীরা অনিশ্চয়তা পছন্দ করেন না। নির্বাচনের ফলাফল কী হবে এবং নতুন সরকারের নীতি কেমন হবে, তা নিয়ে সংশয় থাকায়:

  • শেয়ার বাজার: নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে শেয়ার বাজারে বড় ধরনের ওঠানামা দেখা দেয়।
  • বিনিয়োগ স্থবিরতা: বড় কোম্পানি বা বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নতুন কোনো বড় প্রকল্পে হাত না দিয়ে ‘অপেক্ষা করো এবং দেখো’ নীতি গ্রহণ করে। এর ফলে বেসরকারি বিনিয়োগ কিছুটা কমে যেতে পারে।

৩. মূল্যস্ফীতি ও পণ্যের চাহিদা

নির্বাচনী প্রচারণার সময় বাজারে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থের প্রবাহ বাড়ে (প্রচারণা খরচ, দলীয় কর্মীদের ব্যয় ইত্যাদি)। এতে:

  • পণ্য ও সেবার চাহিদা বেড়ে যায়।
  • খাদ্যদ্রব্য, পরিবহন এবং মুদ্রণ (পোস্টার-ব্যানার) শিল্পের ব্যবসা চাঙা হয়।
  • অনেক সময় অতিরিক্ত অর্থ প্রবাহের কারণে পণ্যমূল্য বা মূল্যস্ফীতি সাময়িকভাবে বেড়ে যেতে পারে।

৪. মুদ্রা পাচার ও ক্যাপিটাল ফ্লাইট (উন্নয়নশীল দেশে)

অনেক উন্নয়নশীল দেশে নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক অস্থিরতার ভয় থাকে। এই আশঙ্কায়:

  • ধনী ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা অনেক সময় তাদের সম্পদ বিদেশে সরিয়ে নিতে থাকেন।
  • এর ফলে স্থানীয় মুদ্রার মান কিছুটা কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।

৫. নির্বাচনের পর ‘কঠোর’ নীতি

নির্বাচন শেষ হওয়ার পর অর্থনীতিতে দেখা যায় এক ধরনের বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়া। জনপ্রিয় হওয়ার জন্য নির্বাচনের আগে যে বাড়তি খরচ করা হয়েছিল, তা সামাল দিতে সরকার অনেক সময়:

  • নতুন করে কর আরোপ করে।
  • ভর্তুকি কমিয়ে দেয়।
  • কঠোর কোনো অর্থনৈতিক সংস্কারের পথে হাঁটে।

সহজ কথায়, নির্বাচনের সময় অর্থনীতিতে এক ধরনের ‘কৃত্রিম চাঙাভাব’ কাজ করে। কিন্তু তার আড়ালে থাকে গভীর অনিশ্চয়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকি।

আরও পড়ুন>>
২০২৬ সালে বিশ্ব অর্থনীতির সামনে চ্যালেঞ্জের পাহাড়

প্রথমবার ১০০ ডলার ছাড়ালো রুপা, সোনার দাম ৫০০০ ডলার ছুঁইছুঁই
ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হামলার পরও বিশ্ববাজারে কমেছে তেলের দাম

দেশে দেশে নির্বাচনকালীন অর্থনীতির ভিন্ন চিত্র

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর নির্বাচনকালীন অর্থনীতি পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, এসব দেশে বিনিয়োগ, মূল্যস্ফীতি এবং সরকারি ব্যয়ের চিত্র বেশ ভিন্ন।

১. যুক্তরাষ্ট্র: নীতি পরিবর্তনের আশঙ্কায় বাজার অস্থিরতা

বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচনের সময় সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে পুঁজিবাজারে। বিনিয়োগকারীরা নির্বাচনের ফলাফলের অপেক্ষায় থাকেন, কারণ রিপাবলিকান বা ডেমোক্র্যাট—কারা ক্ষমতায় আসবে তার ওপর নির্ভর করে কর নীতি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তি।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ২০২৪ সালের নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্ভাব্য জয় এবং তার প্রস্তাবিত সংরক্ষণবাদী বাণিজ্য নীতির (শুল্ক) প্রভাবে ভোটের আগে থেকেই বিশ্ববাজারে মুদ্রার মানে অস্থিরতা দেখা দেয়। বিনিয়োগকারীরা অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা স্থগিত রেখে ‘নিরাপদ বিনিয়োগ’, যেমন- সোনা বা ট্রেজারি বন্ডে ঝুঁকেছিলেন।

২. ভারত: দ্রুত প্রবৃদ্ধি ও বিপুল নির্বাচনী ব্যয়

বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের দেশ ভারতে নির্বাচনের সময় অর্থনীতির চাকা বেশ দ্রুত ঘোরে। সেন্টার ফর মিডিয়া স্টাডিজের তথ্যমতে, ভারতের সাধারণ নির্বাচনে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ হয়। যেমন- ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের সময় মুদ্রণ, ডিজিটাল প্রচারণা, এবং পরিবহন খাতে বিপুল অর্থের প্রবাহ লক্ষ্য করা গেছে।

গ্রামীণ এলাকায় সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ ছাড়ের হিড়িক পড়ায় সাময়িকভাবে ভোগব্যয় বেড়ে যায়, যা জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। তবে নির্বাচনের পর অনেক সময় কঠোর রাজস্ব নীতি গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।

৩. বাংলাদেশ: অনিশ্চয়তা ও বিনিয়োগে স্থবিরতা

বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতিতে নির্বাচনের সময়টি সাধারণত চ্যালেঞ্জিং হয়। ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতার আশঙ্কা করেন।

যেমন- ২০২৪ সালের শুরুর দিকে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় দেশের অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। যদিও এই সংকট নির্বাচনের কারণে সৃষ্টি হয়নি, এগুলো আগে থেকেই বিদ্যমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ সমস্যা ছিল। তবে নির্বাচনকালীন অনিশ্চয়তা এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছিল। এছাড়া, রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ায় নিত্যপণ্যের দামও বেড়ে যায়।

নির্বাচনের পরে কী?

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) তথ্যমতে, বাংলাদেশে নির্বাচনের আগে বেসরকারি বিনিয়োগ বা নতুন কলকারখানা স্থাপনের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। তবে নির্বাচনের পর স্থিতিশীলতা ফিরলে অর্থনীতি আবার গতি পাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়।

অর্থনীতিবিদদের মতে, নির্বাচনের সময় দেশের অর্থনীতিতে সাময়িক চাঙাভাব বা অস্থিরতা দেখা দিলেও দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ। নির্বাচনের পর নতুন সরকারের প্রথম ১০০ দিনের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তই মূলত পরবর্তী কয়েক বছরের প্রবৃদ্ধির গতিপথ নির্ধারণ করে দিতে পারে।

কেএএ/

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।