এএফপির প্রতিবেদন
বাংলাদেশে রাজনীতির ময়দানে নারীরা কেন উপেক্ষিত?
নির্বাচনের পথ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নারীরা এখন প্রায় অদৃশ্য হয়ে পড়ছেন। আগামী সপ্তাহে যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, নির্বাচনের পর বাংলাদেশ কার্যত পুরুষদের দিয়েই শাসিত হবে।
এবারের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো ভোটার হয়েছেন ২০ বছর বয়সী আরিয়ানা রহমান। তিনি বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘আমি আগে গর্ব অনুভব করতাম যে আমার দেশ খুব উদার না হলেও শীর্ষে দুইজন নারী ছিলেন। যে-ই জিতুক না কেন, নারীই প্রধানমন্ত্রী হতেন।’
কিন্তু এবারের নির্বাচনে সেই বাস্তবতা আর নেই।
নারী প্রার্থী ৪ শতাংশেরও কম
বাংলাদেশে এবারের নির্বাচনে ৩০০ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মোট ১ হাজার ৯৮১ জন প্রার্থী। তাদের মধ্যে নারী মাত্র ৭৬ জন, যা চার শতাংশেরও কম। অধিকাংশ রাজনৈতিক দলই শুধু পুরুষ প্রার্থী দিয়েছে।
রক্ষণশীল দক্ষিণ এশীয় এই দেশে নারীদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব বরাবরই সীমিত। স্বাধীনতার পর সর্বোচ্চ ২২ জন নারী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন ২০১৮ সালে।
আরও পড়ুন>>
জেন জির হাতে স্বৈরাচার পতন: নির্বাচনের দৌড়ে এগিয়ে পুরোনো শক্তিরাই
বাংলাদেশে গণতন্ত্র ফেরানোর নির্বাচন, কার হাতে ভবিষ্যৎ?
তারেক রহমানকে নিয়ে টাইম ম্যাগাজিনের বিশেষ প্রতিবেদন
আল-জাজিরার প্রতিবেদন/ ড. ইউনূসকে কীভাবে মনে রাখবে বাংলাদেশ?
বাংলাদেশের নির্বাচন কী প্রভাব ফেলবে ভারত-নেপালে?
তবে ১৯৯১ সাল থেকে ২০২৪ সালের বিপ্লব পর্যন্ত টানা তিন দশকেরও বেশি সময় বাংলাদেশের রাজনীতি, আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিত্ব ও রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষে ছিলেন দুই নারী—শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতা খালেদা জিয়া চার দশক দল পরিচালনা ও তিন দফা প্রধানমন্ত্রী থাকার পর গত ডিসেম্বর মারা যান।
অন্যদিকে, পাঁচবারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন। বর্তমানে তিনি ভারতে আত্মগোপনে রয়েছেন। মানবতাবিরোধী অপরাধে অনুপস্থিতিতে তার মৃত্যুদণ্ড হয়েছে।
‘নিয়ন্ত্রিত, অপমানিত, বিচারিত’
শেখ হাসিনার স্বৈরশাসনের অবসান হওয়ায় অনেক নারী অধিকারকর্মী আশা করেছিলেন, এই বিপ্লব নতুন সমতা বয়ে আনবে, বিশেষ করে নারীদের জন্য।
নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন গঠন করলেও, সেই কমিশনকে কার্যত কোণঠাসা করা হয়েছে। নারী প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই একতরফা সিদ্ধান্ত নেওয়ারও অভিযোগ উঠেছে।
বর্তমানে কট্টরপন্থিরা আরও সাহসী হয়ে উঠেছে। ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও জনসমাবেশ থেকে নারীদের বাদ দেওয়ার দাবি উঠছে, এমনকি নারী ফুটবল ম্যাচ আয়োজনেও বাধা দেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে।
নারী অধিকার বিষয়ক সংগঠন ‘নারীর রাজনৈতিক অধিকার ফোরাম’র মুখপাত্র মাহরুখ মহিউদ্দিন বলেন, ‘ইতিহাসজুড়েই নারীর অংশগ্রহণ কম ছিল, কিন্তু অভ্যুত্থানের পর পরিবর্তনের যে প্রত্যাশা ছিল, তা বাস্তবে হয়নি।’
তিনি বলেন, পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার কারণে নারীদের গৃহস্থালির ভূমিকায় সীমাবদ্ধ রাখা হয়।
যারা কথা বলার সাহস করন, তারা প্রায়ই শত্রুতার মুখোমুখি হন।
অভ্যুত্থানের অন্যতম নেতা উমামা ফাতেমা বলেন, ‘নারীরা নিয়ন্ত্রিত, অপমানিত... শুধু একটি রাজনৈতিক দলে থাকার কারণেই তারা সমালোচিত হন—এটাই বাস্তবতা।’
ছাত্রদের দলেও উপেক্ষিত নারীরা
অভ্যুত্থানের ছাত্রনেতাদের গড়া জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৩০ জন প্রার্থীর মধ্যে মাত্র দুইজন নারীকে মনোনয়ন দিয়েছে।
দলের সদস্য সামান্থা শারমিন বলেন, ‘দলের কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় আমি নেই। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো আমাদের উপস্থিতি ছাড়াই নেওয়া হয়।’
এনসিপির জোটসঙ্গী জামায়াতে ইসলামী এবারের নির্বাচনে একজনও নারী প্রার্থী দেয়নি।
জামায়াতের সহকারী মহাসচিব আহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, সমাজ এখনো নারীদের রাজনীতির জন্য ‘প্রস্তুত ও নিরাপদ’ নয়।
দলের নারী শাখার নেত্রী নুরুন্নেসা সিদ্দিকা বলেন, ‘ইসলামী সংগঠনে নারী নেতা থাকতে পারে না—আমরা সেটা মেনে নিয়েছি।’
সংরক্ষিত আসন ‘অপমানজনক’
এবারের নির্বাচনে অল্প যে কয়জন নারী প্রার্থী লড়ছেন, তাদের একজন মনীষা চক্রবর্ত্তী। তিনি বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ মূলত প্রতীকী।
১৭ কোটি জনসংখ্যার দেশে ৩০০ জন সংসদ সদস্য সরাসরি নির্বাচিত হন, আর অতিরিক্ত ৫০টি নারী সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন দেওয়া হয়।
মনীষা চক্রবর্ত্তী বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের মনোনীত প্রার্থী। দলটির ২৯ প্রার্থীর মধ্যে ১০ জন নারী রয়েছেন, যা এবারের নির্বাচনে সর্বোচ্চ অনুপাত।
মনীষা বলেন, ‘সংরক্ষিত আসনের ধারণাই অপমানজনক। তদবির, দলীয় পছন্দ, স্বজনপ্রীতি—সব মিলিয়ে সংসদে নারীর উপস্থিতি কেবল আনুষ্ঠানিকতা।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির একমাত্র নারী সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, ‘যোগ্য নারী নেত্রীরা দলীয় সমর্থনের অভাবে ধীরে ধীরে হারিয়ে যান।’
তার মতে, শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া দুজনই পারিবারিক সূত্রে ক্ষমতার শীর্ষে উঠেছিলেন—যা নারীর ক্ষমতায়নের কাঠামোগত দুর্বলতাকেই তুলে ধরে।
সামনে কঠিন সময়
প্রথমবারের ভোটার আরিয়ানা রহমান মনে করেন, সামনে লড়াই আরও কঠিন। তার কথায়, ‘এই নির্বাচনে আরও বেশি নারী প্রার্থী থাকলে নিজেকে বেশি প্রতিনিধিত্বশীল মনে হতো। আগামী কয়েক বছর নারীদের জন্য আরও বৈরী হতে পারে।’
সূত্র: এএফপি
কেএএ/