জার্মানিতে দক্ষ কর্মীর চরম সংকট, দরকার লাখ লাখ অভিবাসী
জার্মানিতে বর্তমানে দক্ষ কর্মীর চরম সংকট চলছে। নার্স থেকে শুরু করে আইটি বিশেষজ্ঞ পর্যন্ত বিভিন্ন পেশায় দক্ষ কর্মীর অভাবে ভুগছে ইউরোপীয় দেশটি। এই শূন্যস্থান পূরণের জন্য লাখ লাখ পেশাজীবী প্রয়োজন। তবে বিদেশ থেকে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় জটিলতা ও রাজনৈতিক বাধায় কাজ এগোচ্ছে ধীরগতিতে।
চেন্নাইয়ের একটি শ্রেণিকক্ষে প্রায় ২০ জন নার্স জার্মান ভাষা শিখছেন। তাদের লক্ষ্য ছয় মাসের মধ্যে এমনভাবে দক্ষ হওয়া যাতে জার্মানিতে গিয়ে কাজ করতে পারেন।
রামলক্ষী নামে এক নার্স জানান, পরিবারের আর্থিক সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে পড়াশোনা করেছেন। এখন বিদেশে যেতে চান। তিনি বলেন, ‘আমার লক্ষ্য বিদেশে কাজ করা। আমি চাই পরিবার আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হোক। আর আমি নিজের একটা বাড়ি বানাতে চাই।’
দক্ষ কর্মীর চাহিদা
জার্মানির বেবি-বুমার প্রজন্মের (১৯৪৬ থেকে ১৯৬৪ সালের মধ্যে জন্মগ্রহণকারী) কর্মীরা আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই অবসরে যাচ্ছেন। আবার, দেশটিতে জন্মের হার বেশ কম। ফলে সেখানে নতুন দক্ষ কর্মীর প্রয়োজন। হাসপাতালগুলোতে নার্সের ঘাটতি, স্কুলে শিক্ষক এবং আইটি খাতে ডেভেলপার খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
আরও পড়ুন>>
জার্মান চ্যান্সেলরকে মাদুরোর মতো ‘তুলে নেওয়ার হুমকি’
জার্মানিতে ব্যাংকের ভল্ট থেকে কোটি ইউরো নিয়ে পালালো চোর
রেকর্ড ফলনে জার্মানিতে বিনামূল্যে আলু বিতরণের হিড়িক
নিউরেমবার্গের ইনস্টিটিউট ফর এমপ্লয়মেন্ট রিসার্চ (আইএবি)-এর অর্থনীতিবিদরা জানিয়েছেন, জার্মানিকে শুধু বর্তমান অবস্থা বজায় রাখতেই বছরে প্রায় তিন লাখ দক্ষ কর্মী বিদেশ থেকে আনা প্রয়োজন।
আইএবির গবেষক মাইকেল ওবারফিখটার বলেন, কর্মী না থাকলে জার্মানদের বেশি সময় কাজ করতে হবে, অবসর নিতে হবে দেরিতে, অথবা জীবনযাপন মান কমবে।
প্রশাসনিক বাধা
বর্তমানে বিদেশি কর্মীরা জার্মানিতে কাজের জন্য নানা বাধার মুখে পড়ছেন। জার্মান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করা ইরানি তরুণী জাহরা এক বছর ধরে ভিসা রূপান্তরের জন্য অপেক্ষা করেছেন। তিনি বলেন, ‘ছয় বছর পার হলেও স্থায়ী কাজের অনুমতি পাইনি।’
কলোন শহরের অভিবাসন আইনজীবী জর্ন মাইবাউম বলেন, ‘এ ধরনের সমস্যা সারা দেশেই রয়েছে।’
শরণার্থী ও অভিবাসী কর্মী
জার্মানির অভিবাসন ও শরণার্থী অফিসের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার বিদেশি দক্ষ কর্মী হিসেবে নিবন্ধিত। তবে যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে আগত শরণার্থীদের আবেদনও তাদের দায়িত্বে।
ডিজিটালাইজেশনের অভাব ও প্রশাসনিক ধীরগতি অভিবাসী কর্মী নিয়োগে বাধা সৃষ্টি করছে। ফলে দেশজুড়ে অভিবাসী নীতি নিয়ে অসন্তোষ বেড়েছে। এর ফলে জনসমর্থন বেড়েছে উগ্র-ডানপন্থি দল ‘অলটারনেটিভ ফর জার্মানি’ পার্টির।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চ্যালেঞ্জ
রাইনল্যান্ড-প্যালাটিনেটের ভ্যালেন্ডার শহরের বিডিএইচ ক্লিনিকে কাজ করছেন তামিলনাড়ুর কায়ালভলি রাজাভিল। তিনি বলেন, জার্মান ভাষা প্রথমে কঠিন ছিল, তবে সহকর্মীরা সাহায্য করেছেন।
ক্লিনিকের জার্গ বিয়েব্রাচ বলেন, জার্মানিতে বিদেশিদের প্রতি বিদ্বেষ এবং বর্ণবৈষম্য অন্যতম সমস্যা। এছাড়া, ঘর-পরিবারের দূরত্ব, সাংস্কৃতিকভাবে মানিয়ে নেওয়া এবং চুক্তির মেয়াদও বিদেশি কর্মীদের স্থায়ীভাবে না থাকার কারণ।
সমাধানের পথ
জার্মানির ক্লিনিকগুলো এখন উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করা ভারতীয়দের জন্য শিক্ষানবিশ প্রোগ্রাম চালু করেছে, যা নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুততর করেছে। তবে জার্মানির ১৬টি রাজ্যের ভিন্ন নিয়ম এবং জটিল নথিপত্র যাচাইয়ে অনেক সময় লাগে।
বিয়েব্রাচ বলেন, প্রতিটি দেশ দক্ষ কর্মীর দরকার বলছে, কিন্তু সব কিছু সুষ্ঠুভাবে চালানোর পথ এখনো অনেক দূরে।
সূত্র: ডয়েচে ভেলে
কেএএ/