মধ্যবর্তী নির্বাচন
পরাজয়ের ভয়ে আগ্রাসী ট্রাম্প, ডেমোক্র্যাটদের পাল্টা প্রস্তুতি
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যবর্তী নির্বাচনে কারচুপির চেষ্টা করতে পারেন কি না—এমন প্রশ্ন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক অঙ্গনে জোর আলোচনা চলছে। বিশেষ করে ২০২০ সালের নির্বাচনের পর তার ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক থাকায় ডেমোক্র্যাট নেতারা সম্ভাব্য বিভিন্ন পরিস্থিতি নিয়ে আগাম প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসম্যান জো মরেল জানিয়েছেন, তার নেতৃত্বে একটি কমিটি সম্ভাব্য ১৫০টি ভিন্ন পরিস্থিতি নিয়ে কাজ করছে—যেখানে ভোটকেন্দ্রে অভিবাসন বাহিনী মোতায়েন, ডাকযোগে ভোট বাতিল বা ব্যালট বাক্স জব্দ করার মতো আশঙ্কাও রয়েছে। যদিও এসবের অনেক কিছু আগে কখনো ঘটেনি, তবুও তারা প্রস্তুতি রাখছেন।
২০২০ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের হস্তক্ষেপের চেষ্টার কারণেই এই সতর্কতা। যদিও এবার ট্রাম্প নিজে প্রার্থী নন, তবে হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভস বা প্রতিনিধি পরিষদে হেরে গেলে তার আইনি এজেন্ডাগুলো ভেস্তে যাবে এবং তার বিরুদ্ধে তদন্ত ও অভিশংসনের ঝুঁকি বাড়বে। এই ভয়ে ট্রাম্প ডেমোক্র্যাটদের বিরুদ্ধে ‘জালিয়াতি’র পাল্টাপাল্টি অভিযোগ তুলছেন এবং ফেডারেল সরকারকে ভোট গণনায় সরাসরি হস্তক্ষেপ করার জন্য প্ররোচিত করছেন।
ভোটের আগে ও পরে হস্তক্ষেপের ভয়
ডেমোক্র্যাটরা ভয় পাচ্ছেন যে ট্রাম্প ভোট চলাকালীন এবং ভোট গণনার সময়—উভয় ক্ষেত্রেই হস্তক্ষেপ করতে পারেন। একটি বড় ভয়ের বিষয় হলো, অশ্বেতাঙ্গ ভোটারদের উপস্থিতি কমাতে তিনি আইসিই বা অভিবাসন কর্মকর্তাদের ভোটকেন্দ্রে পাঠাতে পারেন। যদিও ট্রাম্প প্রশাসন একে গুজব বলছে, কিন্তু মিনেসোটার মতো অঙ্গরাজ্যে এর আগে জালিয়াতির অজুহাতে আইসিই এজেন্ট মোতায়েন করা হয়েছিল।
আইনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভোটকেন্দ্রে সৈন্য বা সশস্ত্র লোক পাঠানো বেআইনি এবং আদালত তা তৎক্ষণাৎ বন্ধ করে দেবে। তবে ডেমোক্র্যাটদের ভয় হলো, কয়েক জায়গায় আইসিইর অভিযান ল্যাটিনো ভোটারদের মনে ভয় ধরিয়ে দিতে পারে, যা ভোটার উপস্থিতি কমিয়ে দিয়ে রিপাবলিকানদের সুবিধা করে দেবে। যদিও এর উল্টোটাও হতে পারে—ভয় পেয়ে ভোটাররা আরও বেশি সংখ্যায় ভোট দিতে আসতে পারেন।
ভোট গণনা ও শংসাপত্র
ভোট গণনার সময় কারচুপি করা বেশি কার্যকর হতে পারে। যদি ভোটের ব্যবধান খুব সামান্য হয়, তবে জালিয়াতির সুযোগ বাড়ে। ২০২০ সালে ট্রাম্প ডাকযোগের ভোট গণনা বন্ধের দাবি জানিয়েছিলেন। এবারও তিনি ডাকযোগের ভোটকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছেন। তিনি একটি নির্বাহী আদেশ দিয়েছেন যেন ‘নাগরিক নয়’ এমন কাউকে ডাকযোগে ব্যালট পাঠানো না হয়। যদিও বিচারকরা সম্ভবত এটি আটকে দেবেন।
মার্কিন বিচার বিভাগ এরই মধ্যে ৩০টি ডেমোক্র্যাট-শাসিত অঙ্গরাজ্যের বিরুদ্ধে মামলা করেছে তাদের ভোটার তালিকা এবং ব্যক্তিগত তথ্য (যেমন সোশাল সিকিউরিটি নম্বর) হস্তান্তরের জন্য। সমালোচকরা মনে করেন, ট্রাম্প জালিয়াতির অভিযোগ তোলার সময় এই তথ্যগুলোকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে চান।
সংবিধান কী বলে?
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান প্রেসিডেন্টকে নির্বাচন পরিচালনার কোনো ক্ষমতা দেয়নি; এই ক্ষমতা অঙ্গরাজ্যগুলোর। কংগ্রেস চাইলে রাজ্যগুলোর পদ্ধতি পরিবর্তন করতে পারে, কিন্তু সম্প্রতি কংগ্রেস ট্রাম্পের চাওয়া ‘সেভ আমেরিকা অ্যাক্ট’ পাস করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
ট্রাম্পের কিছু সমর্থক চান তিনি যেন জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে ভোটিং মেশিনগুলো নিষিদ্ধ করেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংবিধানে এমন কোনো সুযোগ নেই। ডেমোক্র্যাটরা আরও ভয় পাচ্ছেন যে, ট্রাম্প এফবিআইকে ব্যবহার করে ব্যালট বাক্স জব্দ করতে পারেন, যা ভোট গণনার ধারাবাহিকতা বা ‘চেইন অব কাস্টডি’ নষ্ট করে দেবে।
আস্থার সংকট
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এসব বিতর্কের ফলে সাধারণ মানুষের মনে নির্বাচনি ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা তৈরি হয়েছে। একটি জরিপ বলছে, নির্বাচনে স্বচ্ছতা নিয়ে মানুষের আস্থা ৪৪ শতাংশ থেকে কমে এখন ২৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। নির্বাচনি কর্মীরা এখন নিয়মিত হুমকি ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ট্রাম্পের পক্ষে নির্বাচন পাল্টে দেওয়া বা বড় ধরনের জালিয়াতি করে সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম। ২০২০ সালেও তিনি সফল হননি। কিন্তু তিনি যা পেরেছেন তা হলো—গণতান্ত্রিক জয়ের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা এবং জনগণের মনে সন্দেহ সৃষ্টি করা। তবে আশার কথা হলো, ট্রাম্পের এসব কর্মকাণ্ড ডেমোক্র্যাট ভোটারদের আরও বেশি উত্তেজিত করে তুলছে এবং নভেম্বরের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে।
সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট
কেএএ/