ট্রাম্পের ১০ শতাংশ শুল্ক বাতিল হচ্ছে কাদের জন্য?

খান আরাফাত আলী
খান আরাফাত আলী খান আরাফাত আলী , সহ -সম্পাদক
প্রকাশিত: ০২:৫৫ পিএম, ১০ মে ২০২৬
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প/ গ্রাফিকস: জাগোনিউজ

যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে আবারও ধাক্কা খেলো প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি। গত বৃহস্পতিবার (৮ মে) দেশটির একটি ফেডারেল আদালত ট্রাম্পের ঘোষিত বিশ্বব্যাপী ১০ শতাংশ ঢালাও আমদানি শুল্ককে ‘অবৈধ’ বলে রায় দিয়েছেন। চলতি বছর তার বাণিজ্য নীতির ওপর এটি দ্বিতীয় বড় আঘাত।

নিউইয়র্কভিত্তিক ইউএস কোর্ট অব ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড-এর (সিআইটি) তিন বিচারকের একটি প্যানেল ২-১ ভোটের ব্যবধানে এই ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেন। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ‘সেকশন ১২২’ ব্যবহার করে প্রেসিডেন্ট যেভাবে এই শুল্ক আরোপ করেছেন, তার পর্যাপ্ত আইনি ভিত্তি নেই।

আদালতের লড়াই ও আইনি মারপ্যাঁচ

গত ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের তথাকথিত ‘লিবারেশন ডে’ শুল্কনীতিকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন। এর পরপরই তড়িঘড়ি করে ‘সেকশন ১২২’ নামে একটি পুরোনো আইনি ধারা ব্যবহার করে নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন ট্রাম্প। এই ধারা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে যদি বড় ধরনের ‘পেমেন্ট ঘাটতি’ দেখা দেয়, তবে প্রেসিডেন্ট সাময়িকভাবে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করতে পারেন।

আরও পড়ুন>>
ট্রাম্পের ‘একতরফা শুল্ক’ অবৈধ: মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের রায়
ট্রাম্পের নতুন শুল্কের ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত
শুল্ক বাতিল/ আইনি যুদ্ধে অসহায় ট্রাম্প

তবে আদালতের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারক মার্ক বারনেট এবং ক্লেয়ার কেলি তাদের রায়ে উল্লেখ করেন, ট্রাম্প প্রশাসন যে ধরনের বাণিজ্যিক ঘাটতিকে ভিত্তি করে এই শুল্ক বসিয়েছে, তা ১৯৭৪ সালের আইনের সংজ্ঞায় পড়ে না। তাদের মতে, সাধারণ বাণিজ্যিক ঘাটতি আর আইনের বর্ণিত ‘পেমেন্ট ঘাটতি’ এক বিষয় নয়। প্রেসিডেন্টের এই পদক্ষেপকে তারা ‘আল্ট্রা ভায়ার্স’ বা ক্ষমতার অপব্যবহার হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। অন্যদিকে, জর্জ ডব্লিউ বুশের আমলে নিযুক্ত বিচারক টিমোথি স্ট্যানসিউ এই রায়ের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেছেন।

সুবিধা পাবেন কারা?

মার্কিন আদালতের এই রায় তাৎক্ষণিকভাবে সবার জন্য কার্যকর হচ্ছে না। রায় অনুযায়ী, আপাতত কেবল মামলার বাদী পক্ষগুলোই এই সুবিধা পাবেন। এর মধ্যে রয়েছে ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্য এবং দুটি ক্ষুদ্র আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান—মশলা আমদানিকারক ‘বারল্যাপ অ্যান্ড ব্যারেল’ এবং খেলনা নির্মাতা ‘বেসিক ফান!’।

আদালতের নির্দেশে বলা হয়েছে, এই তিন পক্ষের কাছ থেকে আর কোনো শুল্ক আদায় করা যাবে না এবং আগে সংগৃহীত অর্থ সুদসহ ফেরত দিতে হবে। তবে এই রায়ের কোনো ‘দেশব্যাপী নির্দেশনা’ জারি না হওয়ায় অন্য সাধারণ আমদানিকারকদের আগামী জুলাই মাস পর্যন্ত এই ১০ শতাংশ শুল্ক গুনেই পণ্য আমদানি করতে হবে।

বাদীর প্রতিক্রিয়া

এই রায়কে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসাগুলোর জন্য একটি বিশাল বিজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। ‘বেসিক ফান’-এর প্রধান নির্বাহী জে ফোরম্যান এক বিবৃতিতে বলেন, ‘অবৈধ শুল্ক নীতি আমাদের মতো কোম্পানিগুলোর জন্য বিশ্ববাজারে টিকে থাকা অসম্ভব করে তুলছিল। এই রায় কেবল আমাদের অর্থ সাশ্রয় করবে না, বরং ব্যবসার স্থিতিশীলতাও ফিরিয়ে আনবে।’

একইভাবে ‘বারল্যাপ অ্যান্ড ব্যারেল’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ইথান ফ্রিশ বলেন, ‘ন্যায্য ও পূর্বাভাসযোগ্য বাণিজ্য নীতির পক্ষে এটি একটি বড় বিজয়। ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলো এখন মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে।’

এখন কী করবেন ট্রাম্প?

আদালতের এই প্রতিকূল রায়ের পরও দমে যাননি ট্রাম্প। গত বৃহস্পতিবার রাতে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বরাবরের মতোই আক্রমণাত্মক মেজাজে বলেন, ‘আদালতের কোনো কিছুতেই আমি আর অবাক হই না। আমাদের সামনে এক বিচারক ইতিবাচক ভোট দিয়েছেন, আর দুজন কট্টর বামপন্থি বিচারক বিপক্ষে রায় দিয়েছেন। ঠিক আছে, আমরা সবসময়ই ভিন্ন উপায়ে কাজ করি। আমরা একটি রায় পাই, আর আমরা সেটি অন্যভাবে করার পথ খুঁজি।’

হোয়াইট হাউজ সূত্র জানিয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন এই রায়ের বিরুদ্ধে দ্রুত আপিল করবে। তবে বাণিজ্য বিশ্লেষকরা বলছেন, আপিল বিভাগে এই রায় টিকবে কি না তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। কারণ গত কয়েক মাসে মার্কিন উচ্চ আদালতগুলো প্রেসিডেন্টের একক বাণিজ্য ক্ষমতার বিষয়ে কড়া অবস্থান নিয়েছে।

১৬৬ বিলিয়ন ডলার ফেরতের চাপ ও নতুন শুল্কের হুমকি

এর আগে, গত ফেব্রুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্ট ‘ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট’ (আইইইপিএ)-এর অধীনে ট্রাম্পের আরোপিত আগের শুল্কগুলো বাতিল করেছিলেন। সেই নির্দেশের পর প্রশাসন প্রায় ১৬৬ বিলিয়ন (১৬ হাজার ৬০০ কোটি) ডলার ফেরত দেওয়ার বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু করেছে। ‘কেপ’ নামে একটি নতুন ইলেকট্রনিক সিস্টেমের মাধ্যমে আমদানিকারকদের টাকা ফেরত দেওয়া হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী সোমবার থেকেই প্রথম দফার বড় অংকের চেকগুলো বিলি করা শুরু হবে।

তবে ট্রাম্প প্রশাসনও দমে যাওয়ার পাত্র নয়। জুলাই মাসে বর্তমান ১০ শতাংশ শুল্কের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তারা ‘সেকশন ৩০১’-এর অধীনে নতুন করে তদন্ত শুরু করেছে। ট্রাম্পের লক্ষ্য হলো, আদালতের রায়কে পাশ কাটিয়ে নতুন আইনি ধারায় চীন-মেক্সিকোর মতো দেশগুলোর ওপর আরও বড় অংকের শুল্ক চাপানো। এমনকি তিনি ইউরোপীয় দেশগুলোর বিরুদ্ধে আরও উচ্চ হারে শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন।

অনিশ্চয়তার মুখে বাজার ও সরবরাহ ব্যবস্থা

আদালতের এই রায় এবং ট্রাম্পের পাল্টা হুমকির ফলে মার্কিন বাজারে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বারবার শুল্কনীতি পরিবর্তনের কারণে পণ্যের দাম বাড়া-কমা করছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, আইনি লড়াই দীর্ঘায়িত হলে এবং নতুন করে তদন্তের নামে শুল্ক আরোপ করা হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা সংকটে পড়বে।

আদালতের এই রায় ট্রাম্পের বাণিজ্য যুদ্ধকে সাময়িকভাবে বাধাগ্রস্ত করলেও লড়াই এখনো বাকি। জুলাই মাস পর্যন্ত সাধারণ আমদানিকারকদের জন্য এই শুল্ক বহাল থাকলেও মামলার বাদীপক্ষের এই জয় অন্য হাজারও ব্যবসায়ীকে আদালতে যাওয়ার নতুন পথ দেখাতে পারে। এখন দেখার বিষয়, হোয়াইট হাউজ আইনি এই দেওয়াল ভাঙতে ভিন্ন কোনো উপায় বের করে কি না।

সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস, সিএনএন, পলিটিকো, টাইম
কেএএ/

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।