লেবাননে যুদ্ধ কি থামবে না?
লেবাননে ইসরায়েলের চলমান আগ্রাসন থামার যেন কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না। গত ১৭ এপ্রিল শুরু হওয়া মূল যুদ্ধবিরতি চুক্তি কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকার পর সম্প্রতি ওয়াশিংটনে দুই পক্ষ আরও ৪৫ দিনের জন্য চুক্তির মেয়াদ বাড়াতে সম্মত হয়েছে। তবে এই সমঝোতার মধ্যেই লেবাননের দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। রোববারের (১৭ মে) এই দফায় দফায় হামলায় অন্তত আটজন নিহত এবং এক ডজনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলের তৈর ফেলসে, তৈর দেব্বা, আজ-জরারিয়াহ এবং জেবচিত পৌর এলাকায় ইসরায়েলি হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন। দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ন্যাশনাল নিউজ এজেন্সি (এনএনএ) জানিয়েছে, জুয়াইয়া গ্রামে পৃথক আরেকটি ইসরায়েলি হামলায় আরও তিনজন প্রাণ হারিয়েছেন।
হামলার পাশাপাশি দক্ষিণ লেবাননের সোহমর, রুমাইন, আল-কুসাইবাহ, কফার হুনাহ এবং নাকুরা গ্রামের বাসিন্দাদের জরুরি ভিত্তিতে এলাকা ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে দখলদার ইসরায়েলি বাহিনী।
দক্ষিণাঞ্চলীয় টায়ার শহর থেকে গণমাধ্যমকর্মীরা জানিয়েছেন, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও মাঠে দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র। ইসরায়েল তাদের হামলার তীব্রতা আরও বাড়িয়েছে।
এ বিষয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু রোববার মন্ত্রিসভার বৈঠকে বলেন, ‘আমরা এলাকা দখলে রাখছি, শত্রুমুক্ত করছি এবং ইসরায়েলি সম্প্রদায়কে রক্ষা করছি। একই সঙ্গে আমরা এমন এক শত্রুর বিরুদ্ধে লড়ছি যারা আমাদের চেয়ে চতুর হতে চাইছে।’
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ২ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত ইসরায়েলি হামলায় দেশটিতে ২ হাজার ৯৮৮ জন নিহত এবং ৯ হাজার ২১০ জন আহত হয়েছেন।
ওয়াশিংটনে আলোচনা ও হিজবুল্লাহর বিরোধিতা
কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও গত মাসে কয়েক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো সরাসরি বৈঠকে বসেছিল ইসরায়েল ও লেবানন। তারই ধারাবাহিকতায় ওয়াশিংটনে তৃতীয় দফা আলোচনা শেষে দুই পক্ষ ৪৫ দিনের জন্য যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়াতে সম্মত হয়। আগামী ২৯ মে থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় একটি নিরাপত্তা প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা রয়েছে এবং আগামী ২ ও ৩ জুন ওয়াশিংটনে পরবর্তী দফার বৈঠক নির্ধারিত হয়েছে।
তবে এই সরাসরি আলোচনার তীব্র বিরোধিতা করছে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। বিশেষ করে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলের বোমাবর্ষণ এবং এলাকা দখল করে রাখার বিষয়টিকে তারা মেনে নিতে পারছে না।
হিজবুল্লাহর আইনপ্রণেতা হুসেইন হাজ হাসান বলেন, ‘ইসরায়েলি শত্রুদের সঙ্গে লেবানন কর্তৃপক্ষের এই সরাসরি আলোচনা আসলে একটি কানাগলি, যা একের পর এক ছাড় দেওয়া ছাড়া আর কিছুই বয়ে আনবে না। কর্তৃপক্ষ দেশের জন্য বড় সংকট তৈরি করছে। কেউ হিজবুল্লাহর অস্ত্র সমর্পণের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে পারবে না।’
এরই মধ্যে গত শনিবার হিজবুল্লাহ উত্তর ইসরায়েলের একটি সামরিক স্থাপনায় এবং দক্ষিণ লেবাননে অবস্থানরত ইসরায়েলি বাহিনীর ওপর বেশ কয়েকটি পাল্টা হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছে।
মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়
দীর্ঘমেয়াদি এই যুদ্ধ লেবাননকে এক ভয়াবহ মানবিক সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে। ডেনিশ রিফিউজি কাউন্সিলের তথ্যমতে, গত মার্চ ও এপ্রিলের মধ্যেই যুদ্ধের কারণে ১২ লাখেরও বেশি মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন।
পাশাপাশি দেশটির অর্থনীতি এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। লেবানিজ বিজনেস অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান বাসেম এল-বাওয়াব জানিয়েছেন, ২০২৪ সালে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত লেবাননের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ক্ষতি ২৫ বিলিয়ন (২ হাজার ৫০০ কোটি) ডলার ছাড়িয়ে গেছে। দেশটিতে প্রতিদিন পরোক্ষভাবে প্রায় ৩০ মিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, যুদ্ধবিধ্বস্ত ঘরবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও অবকাঠামো পুনর্নির্মাণের জন্য এখন অন্তত ১২ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। যুদ্ধ যদি এভাবে চলতে থাকে, তবে ক্ষয়ক্ষতির এই খতিয়ান আরও দীর্ঘ হবে।
সূত্র: আল-জাজিরা
কেএএ/