ব্রেক্সিট গল্পের এখানেই শেষ নয়

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ১২:৩৩ পিএম, ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | আপডেট: ১২:৫০ পিএম, ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২০
প্রতীকী ছবি

শুক্রবার (৩১ জানুয়ারি) লন্ডন সময় রাত ১১টায় (বাংলাদেশ সময় শনিবার ভোর ৫টা) আনুষ্ঠানিকভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে বেরিয়ে গেছে যুক্তরাজ্য। গণভোটে রায়ের সাড়ে তিন বছর পর অবশেষে কার্যকর হলো ব্রেক্সিট। তবে এই গল্পের এখানেই শেষ নয়। কারণ এ ব্রেক্সিট পুরোপুরি কার্যকরে ১১ মাস ট্রানজিশন পিরিয়ড বা পরিবর্তনকাল হাতে নিয়েছে যুক্তরাজ্য। অর্থাৎ এই ১১ মাস যুক্তরাজ্যকে ইইউ’র নিয়ম-নীতি মেনেই চলতে হবে, তার সুবাদে আঞ্চলিক এ জোটটির সুযোগ-সুবিধাও ভোগ করবে যুক্তরাজ্যের নাগরিকরা।

এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনা ট্রানজিশন পিরিয়ড বা পরিবর্তনকাল নিয়ে। পরিবর্তনকাল আসলে কী? কেন দরকার? এ নিয়ে সম্যক ধারণা দিয়েছে যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম বিবিসি।

ট্রানজিশন পিরিয়ড কী
ব্রেক্সিট প্রক্রিয়ায় ট্রানজিশন পিরিয়ড হলো এই পদক্ষেপ বাস্তবায়নের সময়কাল। এটির মেয়াদ আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। অর্থাৎ ৯ মাস। এই সময়ে যুক্তরাজ্য থাকতে পারবে ইইউ’র কাস্টম ইউনিয়নেও (ইইউ’র প্রধানতম অংশ), থাকতে পারবে একক বাজারেও।
কাস্টম ইউনিয়নে থাকার অর্থ ট্রানজিশন পিরিয়ড শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত বেশিরভাগ কার্যক্রমই চলবে আগের মতো যেমন :
** ইইউভুক্ত দেশে যুক্তরাজ্যের নাগরিকদের গমনাগমন (ড্রাইভিং লাইসেন্স ও পেট পাসপোর্ট বিষয়ে নিয়ম-নীতি মেনে)
** অবাধে চলাচলের স্বাধীনতা (ইইউভুক্ত দেশে কাজ ও বাসের সুবিধাসহ)
** ইইউভুক্ত অন্য দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাজ্যের বাণিজ্য (কোনো ধরনের বাড়তি কর বা নিরীক্ষা ছাড়াই এটি চলবে)।

তবে যুক্তরাজ্য স্বাভাবিকভাবেই ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট ও ইউরোপিয়ান কমিশনের মতো ইইউ’র রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে বাদ পড়ে যাবে। সদস্যপদ না থাকলেও যুক্তরাজ্যকে এই সময়ে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের আইন-কানুন মেনে চলতে হবে এবং যেকোনো আইনি বিষয়ে ইউরোপিয়ান বিচার আদালত যা বলবে, তা-ই শেষ কথা হবে।

ট্রানজিশন পিরিয়ড চলা পর্যন্ত ইইউ’র বাজেটে নির্ধারিত অর্থ যোগান দিতে হবে যুক্তরাজ্যকে।

ট্রানজিশন পিরিয়ড কেন জরুরি
ট্রানজিশন পিরিয়ড এজন্য রাখা হয়েছে, যেন ইইউ ছাড়ার প্রশ্নে এই জোটের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের নতুন সমঝোতার সুযোগ তৈরি হয়। আসলে দু’পক্ষের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক কেমন হবে তা এই সমঝোতা সংলাপে ঠিক হবে বলেই আশা করা হচ্ছে।

EU

ইউরোপীয় ইউনিয়ন কাউন্সিল থেকে সরিয়ে নেয়া হচ্ছে যুক্তরাজ্যের পতাকা

যুক্তরাজ্য-ইইউ দু’পক্ষই ২৭ পৃষ্ঠার রাজনৈতিক ঘোষণায় তাদের ‘বড় লক্ষ্য’র কথা জানিয়েছে। এই ‘বড় লক্ষ্য’ যে দু’পক্ষের উদার দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশের ইঙ্গিত, তা-ই মনে হচ্ছে পর্যবেক্ষকদের।

ট্রানজিশন পিরিয়ডে যা জরুরি
ব্রেক্সিটের ট্রানজিশন পিরিয়ডে ‘করণীয়’ তালিকায় শীর্ষে থাকবে যুক্তরাজ্য-ইইউ মুক্তবাণিজ্য চুক্তি। ট্রানজিশন পিরিয়ড পেরিয়ে যাওয়ার পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্তরাজ্য যদি কোনো ধরনের শুল্ক বা এ জাতীয় বাধা ছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্য করতে চায়, তবে এই চুক্তিটি অপরিহার্য। যদিও মুক্তবাণিজ্য চুক্তি হলেই যুক্তরাজ্য ও ইইউ’র মধ্যকার ব্যবসা-বাণিজ্যে সব যাচাই প্রক্রিয়াই উঠে যাবে না।

এক হিসাবে, ২০১৮ সালে যুক্তরাজ্যের বাণিজ্য-আয় (পণ্য ও সেবা) ছিল ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি পাউন্ড (১ পাউন্ড= ১.৩২ ডলার), এর মধ্যে ইইউ থেকেই এসেছে ৪৯ শতাংশ।

আরও যেসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে
ইইউ’র সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি সংক্রান্ত আলোচনার পাশাপাশি ট্রানজিশন পিরিয়ডে যুক্তরাজ্য এ বিষয়ে আলাপ চালিয়ে যেতে পারবে যুক্তরাষ্ট্র-অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলোর সঙ্গে।

তবে বাণিজ্য সংক্রান্ত বিষয়াদির পাশাপাশি ইইউ’র সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আরও কিছু বিষয়ে যুক্তরাজ্যকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যেমন: আইন প্রয়োগ, তথ্য বিনিময় ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়াদি; বিমান চলাচলের মান ও নিরাপত্তা; মৎস্য আহরণ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ, ওষুধ সামগ্রীর লাইসেন্সসহ নিয়ম-নীতি ইত্যাদি। এছাড়া এতোদিন ধরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের আইনে অভিবাসন সংক্রান্ত বিষয়াদি পরিচালিত হলেও ভবিষ্যতে তা কীভাবে চলবে, সে বিষয়েও যুক্তরাজ্যকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

Trade

২০১৮ সালে যুক্তরাজ্যের ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি পাউন্ড বাণিজ্য আয়ের ৪৯ শতাংশই এসেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে

ট্রানজিশন পিরিয়ডের পর পরিবর্তন আসবে যেসব বিষয়ে

** ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট থেকে বাদ
যুক্তরাজ্য থেকে ৭৩ জন সদস্য ছিলেন ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টে। ট্রানজিশন পিরিয়ডেই তারা সদস্যপদ হারাবেন প্রভাবশালী এ জোটগত সংসদের।

** ইইউ সামিটে যুক্তরাজ্য আর নয়
ভবিষ্যতে যদি ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন কাউন্সিল সামিটে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অংশ নিতে চান, তাহলে তার জন্য দরকার হবে বিশেষ আমন্ত্রণ। যুক্তরাজ্যের কোনো মন্ত্রীও এখন থেকে আর ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিয়মিত বৈঠকে অংশ নিতে পারবেন না।

** বাণিজ্যে উন্মুক্ত ‘বিশ্বদ্বার’
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য থাকার সময় যুক্তরাষ্ট্র বা অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলোর সাথে আনুষ্ঠানিক বাণিজ্য আলোচনা করতে পারতো না যুক্তরাজ্য। ট্রানজিশন পিরিয়ডেই যুক্তরাজ্য তাদের পণ্য ও সেবা বিক্রির জন্য নতুন নিয়ম ঠিক করতে বিশ্বের যেকোনো দেশের সাথে আলোচনা শুরু করতে পারবে।

** পাসপোর্টের রঙ পরিবর্তন হবে
ব্রেক্সিট কার্যকরের মাধ্যমে ৩০ বছর পর পুরনো নকশার পাসপোর্ট ফিরে আসবে যুক্তরাজ্যে। ঐতিহ্যবাহী নীল ও সোনালী রঙের নকশার এ পাসপোর্ট প্রথম ব্যবহার শুরু হয়েছিল ১৯২১ সালে। তবে বর্তমান যে পাসপোর্ট রয়েছে সেটিও বৈধ থাকবে।

** ব্রেক্সিট কয়েন
ট্রানজিশন পিরিয়ডে প্রায় ৩০ লাখ বিশেষ কয়েন ছাড়া হবে, যেখানে লেখা থাকবে ‘পিস, প্রসপারিটি অ্যান্ড ফ্রেন্ডশিপ উইথ অল নেশনস’ (সব দেশের সঙ্গে শান্তি, সমৃদ্ধি ও বন্ধুত্বের সম্পর্ক)।

** জার্মানি কাউকে যুক্তরাজ্যে প্রত্যর্পণে বাধ্য থাকবে না
আগে সন্দেহভাজন অপরাধী কেউ যুক্তরাজ্য থেকে পালিয়ে গিয়ে জার্মানিতে আশ্রয় নিলে তাকে ফেরত পাঠাতে বাধ্য থাকতো বার্লিন। তবে ব্রেক্সিট কার্যকরের পর জার্মানি আশ্রয়প্রার্থী কাউকে ফেরত পাঠাতে বাধ্য থাকবে না। কারণ, সেদেশের সংবিধান অনুযায়ী ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশ ছাড়া অন্য কোনো দেশের নাগরিককে প্রত্যর্পণের সুযোগ নেই।

এইচএ/পিআর

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]