নীল নদের বাঁধ বদলে দেবে তিন দেশের ভাগ্য

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ১০:৪৬ এএম, ০৪ জুলাই ২০২০

গ্র্যান্ড ইথিওপিয়ান রেনেসাঁ বাঁধের নির্মাণকাজ শেষ হলে এর উচ্চতা হবে স্ট্যাচু অব লিবার্টির প্রায় দ্বিগুণ, চওড়া হবে ব্রুকলিন ব্রিজের সমান, আর এর জলাধারের আকার হবে প্রায় লন্ডনের মতো। নীল নদের অন্যতম প্রধান উপনদ ব্লু নীলের ওপর তৈরি এ বাঁধটি হচ্ছে আফ্রিকার বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। শিগগিরই এটি ছয় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে, যা ইথিওপিয়ার এখনকার মোট উৎপাদনের দ্বিগুণেরও বেশি। বাঁধটি ইথিওপিয়ার পাশাপাশি আশীর্বাদ হয়ে উঠতে পারে প্রতিবেশী দুই দেশ মিসর ও সুদানের জন্যেও। তবে এখন পর্যন্ত এটি শুধু বিরোধেরই জন্ম দিয়েছে।

মিসর তাদের ৯০ শতাংশ বিশুদ্ধ পানির জন্য নীল নদের ওপর নির্ভরশীল। তারা ইথিওপিয়ার বাঁধটিকে নিজেদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি বলে মনে করছে। ২০১১ সালে বাঁধের নির্মাণকাজ শুরুর পরপরই কায়রো এতে বাধ সাধে, এমনকি সাবেক এক মিসরীয় প্রেসিডেন্ট এতে বোমা হামলারও প্রস্তাব দিয়েছিলেন। গত মাসে বাঁধের কাজ ক্ষতিগ্রস্ত করতে মিসরের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রসমর্থিত সাইবার হামলার অভিযোগ করেছে ইথিওপিয়া।

jagonews24

এমন যুদ্ধ যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেই জলাধার কত দ্রুত পূরণ করা হবে, কতটা পানি ছাড়া হবে এবং সম্ভাব্য বিরোধ কীভাবে নিষ্পত্তি হবে তা নিয়ে আলোচনায় বসেছে ইথিওপিয়া, মিসর ও সুদান। এখন পর্যন্ত এ নিয়ে চূড়ান্ত কোনও চুক্তি হয়নি। তবে সেখান থেকে কিছু নতুন সিদ্ধান্ত বেরিয়ে এসেছে। যেমন- ইথিওপিয়া বলছে, তারা আগামী মাসেই বাঁধের জলাধার ভর্তি শুরু করবে। মিসর নিজেদের স্বার্থরক্ষায় যেকোনও কিছু করার প্রতিজ্ঞা করেছে। এ অবস্থায় ভবিষ্যতে সংঘাত এড়াতে সব পক্ষকেই কিছুটা ছাড় দেয়ার মানসিকতা থাকতে হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তিন দেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে- বিশ্বাসের ঘাটতি। মিসরের লোকজন নীল নদের ওপর নিজেদের জন্মগত অধিকার রয়েছে বলে মনে করে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মিসরীয়রে মধ্যে জনপ্রতি পানি সরবরাহের হার বেশ কমে এসেছে। দেশটির দাবি, ইথিওপিয়া যেন জলাধারটি ধীরে ভর্তি করে এবং নদের পানিপ্রবাহে যেন কোনও সমস্যা না হয়, বিশেষ করে খরার সময়। কায়রো মনে করে, বাঁধের কাজ চলার মধ্যেই ইথিওপিয়া আলোচনার প্রস্তাব দিচ্ছে নিজেদের দরাদরির ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য। ইতোমধ্যেই গ্র্যান্ড ইথিওপিয়ান বাঁধের কাজ প্রায় ৭০ শতাংশ শেষ হয়েছে।

কায়রোর এমন মারমুখী মনোভাবে অনমনীয় অবস্থানে চলে যাচ্ছে আদ্দিস আবাবাও। ইথিওপিয়া তাদের ৫০০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ যত দ্রুত সম্ভব তুলে আনতে চায়। তারা মনে করে, মিসর এখনও অতীতেই পড়ে রয়েছে, নীল নদ শাসনের নিষিদ্ধ এক চুক্তি আঁকড়ে রয়েছে তারা। এছাড়া, ইথিওপিয়ার অর্ধেকের বেশি জনগণের বাড়িতে বিদ্যুৎ নেই। সরকারের আশা, গ্র্যান্ড বাঁধটির মাধ্যমেই দেশটির দারিদ্র্য দূর হবে। এ কারণে তারা চুক্তি হোক বা না হোক জলাধার পূরণের দিকেই যাবে। তাছাড়া, আগামী বছর পুনর্নির্বাচন ইস্যুতেও ইথিওপিয়ান প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদের ওপর চাপ বাড়ছে। ফলে তিনি শক্ত পদক্ষেপ নিতে পিছপা হবেন না বলেই মনে করা হচ্ছে।

jagonews24

এদিক থেকে সুদানের অবস্থান বেশ নমনীয়। সীমান্তের ২০ কিলোমিটার দূরবর্তী এ বাঁধ নির্মাণের পক্ষেই রয়েছে তারা। কারণ, সেখান থেকে বেশ সস্তায় বিদ্যুৎ পাবে সুদান। এছাড়া, সুনিশ্চিত পানি সরবরাহে ফসল উৎপাদনও বাড়বে তাদের। তবে, একটি উদ্বেগও রয়েছে। নতুন বাঁধের কারণে সুদানের নিজস্ব রোজেইরেস বাঁধে পানি সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে দেশটি।

বলা হচ্ছে, গ্র্যান্ড ইথিওপিয়ান বাঁধ নিয়ে তিন দেশ একটি চুক্তির ৯০ শতাংশে পৌঁছে গেছে। বর্ষার সময় কী হবে তা নিয়ে খুব একটা সমস্যা না থাকলেও মূল বিরোধ খরার সময় পানি সরবরাহ নিয়ে। চুক্তির ক্ষেত্রে ইথিওপিয়া দীর্ঘ সময় নেয়ার পক্ষপাতী। বিপরীতে, মিসর ও সুদান এখনই সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি চায়। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সালিশ হতে পারে সবচেয়ে উপযুক্ত সমাধান। আর সেই কাজটি করে দিতে পারে আফ্রিকান ইউনিয়ন (এইউ)।

বিশ্লেষকদের মতে, একবার চুক্তি হয়ে গেলেই বদলে যাবে এ অঞ্চলের চেহারা। গ্র্যান্ড ইথিওপিয়ান রেনেসাঁ বাঁধের হাত ধরে তিন দেশের জন্যই উন্মুক্ত হতে পারে বিপুল সম্ভাবনার দুয়ার।

দ্য ইকোনমিস্ট থেকে অনূদিত

কেএএ/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]