ট্রাম্পকে হত্যাচেষ্টার ঘটনাগুলো ‘সাজানো’ মনে করেন অনেক মার্কিন নাগরিকই
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ঘিরে সাম্প্রতিক হত্যাচেষ্টার ঘটনাগুলো নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। একটি নতুন জরিপে দেখা গেছে, বহু মার্কিনি মনে করেন এসব হামলার ঘটনা আসলে ‘সাজানো’ ছিল।
সোমবার (১১ মে) প্রকাশিত এক জরিপ অনুযায়ী, প্রায় প্রতি চারজন মার্কিন নাগরিকের একজন মনে করেন, গত এপ্রিলে হোয়াইট হাউজ করেসপন্ডেন্টস ডিনারে ঘটে যাওয়া গুলির ঘটনাটি পরিকল্পিতভাবে সাজানো হয়েছিল।
জরিপে রাজনৈতিক বিভাজনের বিষয়টিও স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। সেখানে দেখা যায়, ডেমোক্র্যাট সমর্থকদের মধ্যে প্রায় প্রতি তিনজনের একজন বিশ্বাস করেন ঘটনাটি সাজানো ছিল। বিপরীতে রিপাবলিকানদের মধ্যে এই হার ছিল প্রায় প্রতি আটজনের একজন।
অনলাইন সংবাদমাধ্যমগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান নিউজগার্ড সোমবার (১১ মে) এই জরিপ প্রকাশ করে।
জরিপে আরও দেখা যায়, ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে এই ঘটনাকে সাজানো মনে করার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি।
কী হয়েছিল ওই ঘটনায়
গত সপ্তাহে ওয়াশিংটন ডিসির একটি ফেডারেল গ্র্যান্ড জুরি অভিযুক্ত বন্দুকধারী কোল টোমাস অ্যালেনের বিরুদ্ধে চারটি গুরুতর অপরাধের অভিযোগ গঠন করে। এর মধ্যে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগও রয়েছে।
ওয়াশিংটনের ওয়াশিংটন হিলটন হোটেলে ঘটে যাওয়া ওই ঘটনার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ষড়যন্ত্রতত্ত্ব ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে দাবি করা হয়, ট্রাম্প প্রশাসন জনসমর্থন আদায় ও রিপাবলিকান পার্টির পক্ষে সহানুভূতি তৈরির জন্য ঘটনাটি সাজিয়েছিল। একই সঙ্গে হোয়াইট হাউজে পরিকল্পিত নতুন বলরুম প্রকল্পের সমর্থন তৈরির উদ্দেশ্যও ছিল বলে দাবি করা হয়।
জরিপে যা উঠে এসেছে
নিউজগার্ডের জরিপে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের ২৪ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক মনে করেন ওয়াশিংটন হিলটনের ঘটনাটি ভুয়া ছিল। অন্যদিকে, ৪৫ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, তারা ঘটনাটিকে বাস্তব বলে মনে করেন। আরও ৩২ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা এ বিষয়ে নিশ্চিত নন।
১ হাজার মার্কিন প্রাপ্তবয়স্ককে নিয়ে জরিপটি পরিচালনা করে ইউগভ। জরিপের সময়কাল ছিল ২৮ এপ্রিল থেকে ৪ মে পর্যন্ত।
নিউজগার্ডের সম্পাদক সোফিয়া রুবিনসন বলেন, মানুষ এখন সরকার ও গণমাধ্যম- দুটোকেই সন্দেহ করে। এটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। তার মতে, এই ফলাফল যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের মধ্যে সরকার ও সংবাদমাধ্যম নিয়ে বাড়তে থাকা অবিশ্বাসের প্রতিফলন।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক বর্ণালির সব দিকের মানুষই এখন এই প্রশাসন ও গণমাধ্যম- উভয়ের প্রতিই অবিশ্বাসী হয়ে উঠছে। তবে একই সঙ্গে মানুষ অনলাইনে পাওয়া যাচাইবিহীন তথ্যকে সহজে বিশ্বাস করে ফেলছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
হোয়াইট হাউজের প্রতিক্রিয়া
হোয়াইট হাউজ এসব ‘ষড়যন্ত্রতত্ত্ব’ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। প্রতিষ্ঠানটির মুখপাত্র ডেভিস ইংল এক বিবৃতিতে ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেন, যে কেউ মনে করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজের হত্যাচেষ্টার নাটক সাজিয়েছেন, সে সম্পূর্ণ বোকা।
‘ট্রাম্পের রাজনীতি যেন রিয়েলিটি শো’
মিডিয়া ম্যানিপুলেশন নিয়ে গবেষণাকারী ও বোস্টন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জোয়ান ডোনোভান বলেন, এই ফলাফল ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সিতে ‘শো-ম্যানশিপ’ বা নাটকীয় উপস্থাপনার প্রভাবকে তুলে ধরে। ঘটনাটি সাজানো ছিল- এমন ধারণা অনেকের কাছে হলিউড সিনেমার মতো মনে হয়।
তার ভাষায়, পুরো সরকারি কাঠামো এখন যেন একটি রিয়েলিটি টিভি শোতে পরিণত হয়েছে।
ট্রাম্পকে ঘিরে আগের হত্যাচেষ্টা
২০২৪ সালেও ট্রাম্পকে লক্ষ্য করে আরও দুটি হত্যাচেষ্টার ঘটনা ঘটে। এর একটি হয়েছিল পেনসিলভানিয়ার বাটলার শহরে একটি নির্বাচনী সমাবেশে। অন্যটি হয়েছিল ফ্লোরিডার ওয়েস্ট পাম বিচে ট্রাম্প ইন্টারন্যাশনাল গলফ ক্লাবে।
এই তিনটি বন্দুক হামলার কোনো ঘটনাই সাজানো ছিল- এমন দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবুও অনেক মার্কিনি এসব ঘটনায় সন্দেহ পোষণ করছেন।
বাটলারের হত্যাচেষ্টার ঘটনায় ২৪ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, তারা মনে করেন ঘটনাটি সাজানো ছিল। ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ৪২ শতাংশ এ বিশ্বাস পোষণ করেন, যেখানে রিপাবলিকানদের মধ্যে এ হার মাত্র ৭ শতাংশ।
অন্যদিকে, গলফ ক্লাবের ঘটনায় ১৬ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, সেটিও সাজানো ছিল বলে তারা মনে করেন। এক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে এই হার ২৬ শতাংশ, রিপাবলিকানদের মধ্যে ৭ শতাংশ।
সব মিলিয়ে ডেমোক্র্যাট উত্তরদাতাদের ২১ শতাংশ বলেছেন, তারা বিশ্বাস করেন তিনটি ঘটনাই সাজানো ছিল। স্বতন্ত্র রাজনৈতিক মতাদর্শের উত্তরদাতাদের মধ্যে এ হার ১১ শতাংশ এবং রিপাবলিকানদের মধ্যে মাত্র ৩ শতাংশ।
‘ষড়যন্ত্রতত্ত্ব এখন বাড়ছে’
অধ্যাপক জোয়ান ডোনোভান বলেন, ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে এই ধরনের সন্দেহ বেশি দেখা যাওয়ায় তিনি বিস্মিত নন।
তার মতে, বামপন্থি অনেক মানুষের মধ্যেও এখন ষড়যন্ত্রমূলক চিন্তাভাবনা বাড়ছে। কারণ মানুষ আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে খুব অনিশ্চয়তায় ভুগছে।
অনলাইন চরমপন্থা পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ওপেন মেজার্সের জ্যেষ্ঠ গবেষক জ্যারেড হোল্ট বলেন, এই পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে- যুক্তরাষ্ট্রে ষড়যন্ত্রতত্ত্বভিত্তিক চিন্তাভাবনা ক্রমেই সাধারণ হয়ে উঠছে।
তিনি বলেন, এই জরিপের ফল আমাকে খুব একটা অবাক করেনি। তবে এটি অবশ্যই হতাশাজনক।
তার ভাষায়, ষড়যন্ত্রতত্ত্ব এখন আমাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভেতরে ঢুকে গেছে। এমনকি, এটি জনসংখ্যার একটি ক্রমবর্ধমান অংশের কাছে স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ায় পরিণত হচ্ছে।
কেন মানুষ ষড়যন্ত্রতত্ত্বে বিশ্বাস করে?
জোয়ান ডোনোভান বলেন, জটিল কোনো ঘটনা বোঝার চেষ্টা করতে গিয়ে মানুষ অনেক সময় স্বাভাবিকভাবেই ষড়যন্ত্রতত্ত্বে বিশ্বাস করে ফেলে।
তিনি বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে, যখন সরকার বা প্রতিষ্ঠানগুলো সত্য গোপন করে, নিয়মকানুন নিয়ে খেলা করে বা সবার ক্ষেত্রে একই আইন প্রয়োগ করে না, তখন মানুষের জন্য এই বিশ্বাস করা সহজ হয়ে যায় যে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ষড়যন্ত্র হচ্ছে।
তার মতে, তখন মানুষ এই বাস্তবতাকে মেনে নিতে চায় না যে পুরো ব্যবস্থাটিই ভেতর থেকে পচে গেছে।
সূত্র: ওয়াশিংটন পোস্ট
এসএএইচ