আফ্রিকান চলচ্চিত্র উৎসব
পাউরুটি দিয়ে তৈরি স্কার্ট-গির্জার আদলে গাউন পরে হাজির তারকারা
নাইজেরিয়ার লাগোসে অনুষ্ঠিত ১২তম আফ্রিকা ম্যাজিক ভিউয়ার্স চয়েস অ্যাওয়ার্ডস (এএমভিসিএ) এবারও পরিণত হলো ফ্যাশনের এক অবিশ্বাস্য প্রদর্শনীতে। তবে এবারের আসরে সবচেয়ে বেশি আলোচনা কুড়িয়েছে ৫০০টিরও বেশি পাউরুটি দিয়ে তৈরি স্কার্ট ও জার্মানির ঐতিহাসিক ক্যাথেড্রালের আদলে বানানো বিশাল গাউন।
নাইজেরিয়ার ইকো হোটেল অ্যান্ড সুইটসে আয়োজিত এই অনুষ্ঠান মূলত আফ্রিকার চলচ্চিত্র, টেলিভিশন ও ডিজিটাল কনটেন্ট জগতের সাফল্য উদযাপনের জন্য। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি হয়ে উঠেছে মহাদেশটির সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক ও ফ্যাশন প্রদর্শনীগুলোর একটি। এখানে তারকারা শুধু পুরস্কারের জন্য নন, ‘সেরা পোশাক’ জয়ের প্রতিযোগিতাতেও নামেন।
এবারের রেড কার্পেটে সেই প্রতিযোগিতা যেন নতুন মাত্রা পায়। বিশাল আকৃতির গাউন, ভাস্কর্যধর্মী পোশাক, নাটকীয় ট্রেইল আর রূপালি ঝলকে পুরো আয়োজন পরিণত হয় এক ফ্যাশন থিয়েটারে।
অনেক তারকাকে দেখা যায় আলাদা সহকারী দল নিয়ে হাজির হতে। কেউ পোশাকের লম্বা অংশ ধরে রেখেছেন, কেউ আবার মানুষের ভিড় ঠেলে পথ করে দিচ্ছেন। ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে গিয়ে অনেকেরই স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলাও কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে সবার নজর কেড়ে নেন নাইজেরিয়ার রিয়েলিটি টিভি তারকা কুইন মার্সি আতাং। তিনি হাজির হন এমন এক পোশাকে, যা দেখে অনেকেই প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারেননি। কারণ তার গাউনটি তৈরি করা হয়েছে ৫০০টিরও বেশি পাউরুটি দিয়ে।
শুধু পোশাকই নয়, তার সঙ্গে ছিলেন দুই নারী সহকারী, যাদের হাতে ছিল পাউরুটিভর্তি ট্রে। আরও কয়েকজন সহকারী মিলে বিশাল পোশাকটি সামলাচ্ছিলেন। পুরো দৃশ্যটি যেন রেড কার্পেট নয়, কোনো অভিনব বেকারির প্রদর্শনী।
পোশাকটির ভার ও আকার এতটাই বেশি ছিল যে আতাংকে ধীরে ধীরে এগোতে দেখা যায়। এক পর্যায়ে তাকে প্রায় থেমে থেমে হাঁটতে হয়।
বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, পুরো বিষয়টি ছিল তার ব্যবসার প্রচারণার অংশ। আতাংয়ের একটি পাউরুটি তৈরির ব্যবসা রয়েছে, আর সেটিকেই তিনি বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে চেয়েছেন।
তিনি বলেন, আমার ব্যবসার প্রচারণা করার জন্য এএমভিসিএর চেয়ে ভালো জায়গা আর কোথায় হতে পারে?
পোশাকটি ডিজাইন করেছেন নাইজেরিয়ার আলোচিত ডিজাইনার টইন লাওয়ান। ‘তিয়ানাহ’স এম্পায়ার’-এর এই প্রতিষ্ঠাতা ইনস্টাগ্রামে লিখেছেন, তিনি এখন এমন একটি নতুন ট্রেন্ড শুরু করছেন, যেখানে সবাই নিজের ব্যবসাকেই পোশাক হিসেবে তুলে ধরবে।
মুহূর্তের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায় এই পোশাক। কেউ একে ‘সৃজনশীলতার বিস্ফোরণ’ বলেছেন, কেউ আবার মন্তব্য করেছেন- এটাই নিজের ব্যবসাকে মাথায় করে বহন করার প্রকৃত উদাহরণ।
তবে সমালোচনাও কম হয়নি। অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, এত খাবার পোশাক তৈরিতে ব্যবহার করা কি অপচয় নয়?
যদিও সেই অভিযোগ সরাসরি উড়িয়ে দেন কুইন মার্সি আতাং। তার দাবি, এটি নিছক প্রদর্শনী নয়, বরং পরিকল্পিত ব্র্যান্ডিং।
গির্জা সেজে হাজির নানা আকুয়া আদ্দো
যখন সবাই মার্সি আতাংযের পাউরুটির পোশাক নিয়ে ব্যস্ত, তখন আরেক দিক থেকে রেড কার্পেটে হাজির হন ঘানার ফ্যাশন তারকা নানা আকুয়া আদ্দো। আর তাকে দেখেই থমকে যান অনেকে। কারণ তিনি যেন মানুষ নন, হাঁটতে থাকা একটি গির্জা।
জার্মানির বিখ্যাত কোলোন ক্যাথেড্রাল থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তৈরি করা হয়েছিল তার রুপালি রঙের বিশাল পোশাকটি। পোশাকে ছিল হাতে আঁকা জানালার নকশা, ক্যাথেড্রালের মতো উঁচু কাঠামো ও চারপাশে ছড়িয়ে থাকা স্থাপত্যশৈলীর ছাপ।
পোশাকটির বিভিন্ন অংশ বহনে তার টিমের সদস্যদেরও সাহায্য করতে দেখা যায়। কারণ সেটি ছিল এতটাই বড় ও ভারী যে একা সামলানো প্রায় অসম্ভব।
তার ডিজাইনার আবাসওম্যান বিবিসিকে জানান, এই পোশাক তৈরির কাজ শুরু হয়েছিল ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে। কয়েক মাস ধরে চলা সেই কাজ শেষ হয় অনুষ্ঠান শুরুর মাত্র দুই দিন আগে।
ডিজাইনারের ভাষায়, কোলোন ক্যাথেড্রালের মহিমা ও নির্মাণশৈলী থেকেই এই পোশাকের ধারণা নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে একই সঙ্গে জাঁকজমক ও কারুশিল্পের সৌন্দর্য তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
এবারের এএমভিসিএ তাই শুধু পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ৫০০ পাউরুটির পোশাক থেকে শুরু করে গির্জার আদলে তৈরি গাউন- সব মিলিয়ে এটি হয়ে উঠেছে এমন এক রাত, যা আফ্রিকার ফ্যাশন ইতিহাসে দীর্ঘদিন আলোচনায় থাকবে।
সূত্র: বিবিসি
এসএএইচ