নির্বাচন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে?
“আমার সংগঠন নির্বাচন পর্যবেক্ষণের কাজ করে ১৫ বছর ধরে। এমন অবস্থা দেখিনি কখনো। আগে যারা জাল ভোট দিত, সহিংসতা করতো, প্রভাব খাটাতো, তারা অন্তত: পর্যবেক্ষকদের দেখলে গা ঢাকা দিতো। এখন আর সে অবস্থা নেই। চোখের সামনে সবকিছু করতে থাকে। এমন কি সাথে ছিলেন একজন নির্বাচন কর্মকর্তা, তাকেও তারা পাত্তা দিচ্ছিলনা ”। এই কথাগুলো একটি টেলিভিশন টকশোতে বলেছেন নির্বাচন পর্যবেক্ষক ও ব্রতীর নির্বাহী পরিচালক শারমিন মোর্শেদ।
ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের দুটি ধাপ শেষ হলো। দুটিই ছিল রক্তাক্ত, সহিংস। ভোট জাল, কেন্দ্র দখলের পাশাপাশি চলেছে সহিংসত সংঘর্ষ। শারমিন মোর্শেদ যেমন বলেছেন, তেমন রিপোর্ট করেছে গণমাধ্যমগুলোও। তাহলে প্রশ্ন উঠছে তবে কী বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থাই অকেজো হয়ে পড়ছে? উপজেলা, পৌরসভার পর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন, কোনোটিই স্বস্তি দেয় না। প্রায় প্রতিটি কেন্দ্র ছিল ভোটারে পরিপূর্ণ। কিন্তু শুধু এই একটি বৈশিষ্ট্য দিয়ে আর বলা যাচ্ছে না যে নির্বাচন অবাধ হয়েছে। মানুষ আসছে ভোট দিতে, কিন্তু সহিংসতার মধ্যে পড়ছে, অবাধ জাল ভোট হচ্ছে, এই চিত্র বলে দিচ্ছে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে মানুষের ভোটাধিকার প্রত্যাখ্যাত হচ্ছে।
পৌরসভার সময় যা দেখা গেলো, এবারও তাই দেখা যাচ্ছে। অনেকেই নির্বাচনের এই পরিস্থিতিতে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, বিএনপির আমলে এর চেয়ে ভালো কিছু হয়নি। কথা সত্য। কিন্তু কথা হলো ক্ষমতায় থেকে বিএনপির এমনসব কার্যক্রমের ফলাফল কী হয়েছে? সেই অগণতান্ত্রিক আচরণ কী কখনো উদাহরণ হতে পারে? ফলাফল নিয়ে কথা বলার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। প্রায় সব পদই শাসক দল আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা দখলে নিয়েছেন। বাকিটা পেয়েছেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরা। সামান্য কিছু পেয়েছেন বিএনপি প্রার্থীরা।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, বিতর্কিত নির্বাচনের দায় কমিশন নেবে না। দায় নেবে প্রশাসন ও আইনশৃংখলা বাহিনী। কিন্তু একথা বলার কী কোনো সুযোগ আছে? প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশনকেই একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও সুস্থ নির্বাচনের দায়িত্ব দিয়েছে সংবিধান। এবং এর প্রধান হিসেবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার দায়িত্ব এড়াতে পারেন না। বিষয়টা দাঁড়িয়েছে এমন যে, এখন প্রশাসন তার স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলেছে, আর নির্বাচন কমিশন তার সাংবিধানিক দায়িত্ব এড়িয়ে চলছে। একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের চিন্তাও যেন তারা হারিয়ে ফেলেছে। এই অবস্থা আমাদের জন্য অশনি সংকেত।
মানুষ নির্বাচন নিয়ে আস্থা হারিয়ে ফেলছে। এ আস্থা ফিরিয়ে আনার দিকে সরকার ও কমিশনকে নজর দিতে হবে। নিকট অতীতে এই সরকারের অধীনেই সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনগুলো সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে, তাহলে এখন কেন হচ্ছে না? নির্বাচনী ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আগেই এই উত্তর খোঁজার জন্য তৎপর হবে সরকার ও কমিশন এটা মানুষ আশা করে। মনে রাখতে হবে, নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে সমাজে বড় ধরনের ক্ষত সৃষ্টি হবে, সমাজের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বিনষ্ট হবে।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচন ছিল ব্যতিক্রম ঘটনা। বিএনপিসহ অনেকদল নির্বাচনে অংশ নেয়নি। কিন্তু ইউনিয়ন পরিষদের মতো তৃণমুলের স্থানীয় সরকার নির্বাচন, যেটি হচ্ছে আবার দলীয় প্রতীকে, বিএনপি’র অংশগ্রহণে, সেই নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হচ্ছেন বহুজন। এ ঘটনা রীতিমতো নজিরবিহীন। ইউপি নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হওয়ার নজির নেই। স্পষ্টই বোঝা যায় ভয়ভীতি দেখিয়ে অনেক স্থানেই অনেককে মনোনয়ন জমা দিতে দেয়া হয়নি।
এটি ভয়ংকর অবস্থার ইঙ্গিত দেয়। সুস্থ মানুষকে ভাবতে বলে, তবে কী বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। সময় আছে এখনো। দেরি হলে এটি আদৌও পুনরুদ্ধার করা যাবে কি না তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
দুই ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে যা হয়েছে তা নির্বাচনের নামে প্রহসন। জনগণ ও ভোটারদের অশ্রদ্ধার সাথে দেখার মহড়া। এভাবে চলতে থাকলে রাজনীতিবিদ, বিজয়ী প্রার্থী ও প্রশাসনের উপর মানুষ আস্থা হারাবে। রাজনৈতিক দলতো কেবল কিছু মানুষের সংগঠন নয়, প্রতিষ্ঠানও। তাই তার টিকে থাকার স্বার্থেও আজ প্রয়োজন সুষ্ঠু নির্বাচনের।
ইউপি নির্বাচন এখন পর্যন্ত যা হয়েছে তা চলতে থাকলে আগামী দিনে আরো সহিংসতা বাড়বে। অন্য নির্বাচনেও এর প্রভাব পড়বে। স্থানীয় প্রশাসন ইসিকে সহযোগিতা করছে না বলে যে অভিয়োগ উঠেছে তা ভয়াবহ। আইনে নির্বাচন কমিশনের অগাধ ক্ষমতা দেয়া আছে। ইসি হাত গুটিয়ে বসে আছে। প্রশ্ন উঠে যে আইন বা ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনকে দেয়া হয়েছে তা কেন প্রয়োগ করেনি কমিশন? সরকারকেও ঠিক করতে হবে তারা চায় কিনা সুষ্ঠু নির্বাচন হোক।
নির্বাচনী ব্যবস্থাপনার এই অসুস্থ ধারা একবার বেগবান হলে তাকে থামাবে কে? মানুষ এখন ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। একসময় সমাজে নেতিবাচক কর্মকাণ্ড হলে সংগঠিতভাবে তা প্রতিরোধ করা হতো। এখন সেই অবস্থা নেই বরং নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে ভোটের প্রতি মানুষ আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে, ভোটদান থেকে পিছু হটবে সাধারণ মানুষ। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে পড়লে একসময় সবাই তার ফল ভোগ করবে। 
এইচআর/এমএস