সবাই বিসিএস ক্যাডার হওয়ার স্বপ্ন দেখে

জাগো নিউজ ডেস্ক
জাগো নিউজ ডেস্ক জাগো নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত: ০১:০৬ পিএম, ২৩ মে ২০১৯

রাশেদা রওনক খান একাধারে শিক্ষক, সমাজ বিশ্লেষক, গবেষক ও কলাম লেখক। বাবা মোহাম্মদ আনিসুল হক খান, মা প্রফেসর জোহরা আনিস। ২ আগস্ট কুমিল্লায় জন্মগ্রহণ করেন। শিক্ষাগ্রহণ করেছেন কুমিল্লা ফয়জুন্নেসা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। শিক্ষকতা করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগে। বর্তমানে অবস্থান করছেন যুক্তরাজ্যে। সম্প্রতি জাগো নিউজের সঙ্গে তার ক্যারিয়ার ও সফলতা নিয়ে কথা হয়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাংবাদিক জাহিদ হাসান—

আপনার শৈশব ও কৈশোর কেমন কেটেছে?
রাশেদা রওনক খান: দুরন্ত শৈশব পার করেছি। কুমিল্লা যে বাসায় বড় হয়েছি; সেটা সরকারি বাসা। বাসায় আমাদের নিজস্ব বিশাল মাঠ ও একটি পুকুর ছিল। মাঠে খেলতাম সারাদিনই, পুকুরে গোসল করতাম। তিন ভাই-বোনের মাঝে সবার ছোট, তাই বাসার সবার আদর বেশি পেতাম। আমাদের দাদা বাড়ি ও নানা বাড়ির লোকজন খুব বেড়াতে আসতেন। আমাদের একটি গোয়াল ঘর ছিল, সেখানে গরু পালা হতো। দুজন সাহায্যকারী ছিলেন, যারা আমাদের গরু দেখাশোনা করতেন। তাদের সাথে এবং আমাদের বাসায় আরও যারা সাহায্যকারী ছিলেন; সেইসব খালাদের সাথে খেলতাম। মা-বাবা দুজনই চাকরিজীবী ছিলেন বলে মূলত বাসার সাহায্যকারীরাই ছিল আমার মূল খেলার সঙ্গী। সেইসব খালাদের ছেলে-মেয়েরা এখনো আমাদের বাসায় আসেন, যোগাযোগ রাখেন। আশ্চর্য সেসব বন্ধন, রক্তের নয়, কিন্তু আত্মার সম্পর্ক তাদের সাথে, এখনো আমি কুমিল্লা গেলে দেখা করতে আসে। আমার নানু ছিলেন আমার প্রধান শিক্ষক, তিনিও একসময় শিক্ষকতা করতেন। তাই তাঁর কড়া শাসন ও আদরের মাঝেই বেড়ে ওঠা আমার শৈশব!

পড়াশোনায় কোন প্রতিবন্ধকতা ছিল কি?
রাশেদা রওনক খান: না, পড়ালেখায় কোন প্রতিবন্ধকতা ছিল না। মেয়ে হিসেবে আমি অসম্ভব ডানপিটে ছিলাম, সাইকেল চালিয়ে স্কুলে যেতাম, পড়তে যেতাম শিক্ষকদের বাসায়। রাস্তায় অন্য কারো কোন সমস্যা দেখলে সাইকেল থামিয়ে সাহায্য করতে এগিয়ে যেতাম। আসলে ছোটবেলা হতে মা শিখিয়েছে, অন্যকে সাহায্য করবে সুযোগ পেলে। তাই অন্যের সহায় নেওয়ার চেয়ে বরাবরই আমার আগ্রহ থাকতো অন্যকে সাহায্য করার প্রতি। ফলে কোন প্রতিবন্ধকতাকেই বাধা মনে হয়নি জীবনে।

rasheda-in

শিক্ষকতা পেশায় ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন কখন থেকে?
রাশেদা রওনক খান: আমার নানা-নানু দুজনেই ছিলেন শিক্ষক। পরবর্তীতে বাবা সরকারি চাকরিজীবী হলেও মা ছিলেন সরকারি কলেজের অধ্যাপক। আমার খালা, চাচিরাও ছিলেন শিক্ষকতায়। ফলে মোটামুটি শিক্ষক পরিবারে জন্ম বলে হয়তো নিজের অজান্তেই সবসময় শিক্ষক হতেই চেয়েছি। ঠিক কখন থেকে তা মনে নেই, কিন্তু শিক্ষকতা আমার ভালো লাগার একটি পেশা ছিল ছোটবেলা থেকেই।

rasheda-in

ক্যারিয়ার যাত্রার গল্প শুনতে চাই, জীবনের চ্যালেঞ্জগুলো শুনতে চাই—
রাশেদা রওনক খান: ক্যারিয়ার নিয়ে খুব ভেবেছি তা বলবো না। পড়ালেখা করতে ভালো লাগতো, করতাম। ছোটবেলা থেকে খুব বেশি ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবতাম বলে মনে হয় না। আমার যে দুরন্ত শৈশব-কৈশোর, সেখানে ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবার সময় কোথায়? খেলাধুলা, সাইকেল নিয়ে বেড়ানো শহরজুড়ে, ব্যাডমিন্টন খেলা, ভাইয়ার সাথে ক্রিকেট খেলা এসব নিয়ে দিন পার হতো। মূলত এইচএসসি পাস করার পর যেহেতু আমার ভাই ডাক্তার, বাবা-মাসহ সবাই আশা করেছিলেন আমি মেডিকেলে পড়বো, কিন্তু আমি নৃবিজ্ঞান নিয়েই পড়তে চাই বলে দৃঢ়ভাবে জানিয়ে দিলাম। আমার একমাত্র বোন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাণীবিদ্যায় পড়তো, তাই তার সাথে থাকতে পারবো, এ চিন্তা করে জাহাঙ্গীরনগরে নৃবিজ্ঞানে একটা বিষয়েই পরীক্ষা দেই এবং সেখানেই ভর্তি হই। বিষয়টি যে আমি পড়বো তা মনস্থির করি, যখন আমার বোন এ বিষয়ের একটি বই তার বান্ধবীর কাছ থেকে এনে পড়তে দেয়। বইটি পড়ার পর আমার মনে হয়েছে, জগতের আর কোন বিষয় আমার এতো ভালো লাগেনি, এই নৃবিজ্ঞান আমার যতটা ভালো লেগেছে। সেদিনই সিদ্ধান্ত নেই যে, আমি নৃবিজ্ঞানেই পড়বো। বাবার আমার উপর অনেক আশা ছিল যে, আমি ডাক্তার হলে রোগীরা আমার সাথে কথা বললেই রোগ ভালো হয়ে যাবে, এই টাইপ। উনি অনেক কষ্ট পান আমার এ সিদ্ধান্তে। অনেকদিন ঠিকমতো আমার সাথে কথা বলেননি এ দুঃখে। একবছর পর যখন আমার ফার্স্ট ইয়ারের ফলাফল বের হয় এবং আমি ফার্স্ট ক্লাস নম্বরের চেয়ে অনেক বেশি পেয়ে উন্নীত হই। তখন তিনি বুঝতে পারেন যে, মেয়ে যা পড়তে চায়, তা-ই পড়লে ভালো কিছু করবে। পরবর্তীতে প্রতি বর্ষে প্রতি পরীক্ষায় আমি ফার্স্ট হতাম আর সবার আগে বাবাকে জানাতে চাইতাম। কারণ আমি জানি, আমি ডাক্তারি বিদ্যা না পড়ায় তিনি কতটা কষ্ট পেয়েছেন। আমার মা বরাবরই আমি যা করতাম বা যে সিদ্ধান্ত নিতাম তার প্রতি আস্থা রাখতেন। তাই তাঁর বেশি কষ্ট হয়নি, তবে তিনি একটা কথাই বলেছিলেন, আমি চাই তুমি ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়ে শিক্ষক হবে। আমি তাই করার চেষ্টা করেছি সবসময়।

rasheda-in

শিক্ষকতায় যারা আসতে চান, তাদের উদ্দেশে পরামর্শ কী?
রাশেদা রওনক খান: যারা শিক্ষক হতে চান, তাদের প্রতি একটাই পরামর্শ- তাদের নিজের বিষয়টিকে (সাবজেক্ট) ভালোবাসতে হবে। একধরনের আত্মিক সম্পর্ক তৈরি করতে হবে, সাধনা করতে হবে। এখন যেটা হয়, ক্লাসের সবাই বিসিএসমুখী। ভালো শিক্ষক হবার চেয়ে বিসিএস ক্যাডার হওয়ার স্বপ্ন দেখে। আমাদের সময় কিন্তু ক্লাসে ৪-৫ জন থাকতো, যারা কেবল শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখতো। একজন শিক্ষক হওয়া আমার কাছে সাধনার বিষয়, কেবল একটি পেশা নয়।

কারো কাছ থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছেন কি?
রাশেদা রওনক খান: সবচেয়ে বেশি অনুপ্রেরণা পেয়েছি আমার বোন, যিনি শাহ্জালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, তার কাছ থেকে। যেহেতু জাহাঙ্গীরনগরে একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় তার সাথেই আমি থাকতাম হলে। তিনিই আমাকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রেরণা জোগাতেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার জন্য। শিক্ষক মা তো আছেনই, ওনার অনুপ্রেরণা বলে শেষ করা যাবে না। আমার বাবার এই ডাক্তার না হওয়ার যে দুঃখ তিনি পেয়েছিলেন, সেটাকেও আমি অনুপ্রেরণা হিসেবেই দেখি। হয়তো তার দুঃখ মোচন করার একটা চ্যালেঞ্জ কাজ করতো আমার ভেতরে। আমার একমাত্র ভাই ড. আরিফ মোর্শেদ খান ছিলেন কুমিল্লার বিখ্যাত ছাত্র, ফার্স্ট স্ট্যান্ড করা। তার ছোট বোন হিসেবে ভালো কিছু করার একটি সামাজিক-পারিবারিক চাপও এখন বুঝি অনুপ্রেরণা হিসেবেই কাজ করেছে। আর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষকরা আমার অনেক বড় অনুপ্রেরণা ছিলেন, মূলত তাদের দেখেই শিক্ষক হওয়ার স্বপ্নটা বাস্তবে রূপ দেই।

rasheda-in

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
রাশেদা রওনক খান: আমি খুব ছকে আঁকা জীবনে বিশ্বাসী নই। জীবন একটাই, তাই আমার কাছে জীবনে চলার পথে যখন যেভাবে পথ বেঁকে যাবে, সেভাবেই হেটে যাবো, এ ধরনের বিশ্বাস কাজ করে। আপাতত পিএইচডি শেষ করা। এরপর ভবিষ্যৎ কী হবে, তা না হয় সময় আর ভাগ্যের উপরই ছেড়ে দিলাম, যা সবসময়ই আমি করি। কিছু স্বপ্ন আছে, কিন্তু সেগুলো গ্রামকে ঘিরে, নিজের গ্রাম ও শ্বশুরবাড়িকে ঘিরে। যদি করতে পারি, তখন জানাবো। আপাতত স্বপ্নগুলো নিজের কাছেই থাকুক!

ক্যারিয়ারের পাশাপাশি অন্যান্য অর্জন সম্পর্কে জানতে চাই—
রাশেদা রওনক খান: শিক্ষকতার পাশাপাশি আরও কিছু কাজ আমি করি। সেটি আসলে ছোটবেলা থেকে করতাম বলে এখনো করা হয়। ছোটবেলায় আমার মা স্কুলের পাশাপাশি শিশু একাডেমিসহ নানা সংগঠনের সাথে আমাদের তিন ভাই-বোনকেই যুক্ত করে দিতেন। তিনি নিজেও এখনো অর্ধশত সংগঠনের সাথে যুক্ত। তাই সংগঠন করতে ভালোবাসি, পাশাপাশি টেলিভিশনে একসময় টক শো উপস্থাপনা করতাম। চ্যানেল আইতে করা আমার ‘ফার্স্ট মিনিস্টার’ অনুষ্ঠানটি বেশ আলোচিত ছিল। এছাড়াও ‘ফার্স্ট ভোটার’ অনুষ্ঠানটিও ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে সাড়া জাগিয়েছিল। পরবর্তীতে ‘কোথায় দাঁড়িয়ে আমরা’ অনুষ্ঠানটি করি। আমি একটি অনুষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে চালিয়ে যেতে পছন্দ করি না, তাতে দর্শক হয়তো দেখেন কিন্তু একগুয়েমি লাগে এবং বিরক্তও হন। তাছাড়া আমি সবসময় নতুন ভাবনাকে স্বাগত জানাই। এক ভাবনায় আটকে থাকা মানে আমার কাছে চিন্তা-ভাবনায় নতুনত্বের অভাব মনে হয়। তবে শিক্ষকতা ক্যারিয়ারের জন্য কখনোই টিভি অনুষ্ঠানকে খুব বেশি প্রাধান্য দিতে পারিনি, এটা আমার একটা দুঃখই বলা যায়। কিছু সংগঠনের সাথে জড়িত, এছাড়া সময় পেলে টক শোগুলোতে অংশ নেই। ক্যারিয়ারের বাইরে এসবে যুক্ত থাকলেও আমি জারিয়ার মা—এটাই যেন আমার সবচেয়ে বড় অর্জন! সমাজ, সংসার, কর্মজীবন—সব কিছুকে সামলে কাজ করে এগিয়ে যাওয়াটা এ মুহূর্তে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবারই সবচেয়ে বড় অর্জন!

এসইউ/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]