ট্রাইব্যুনালের প্রশ্ন: ক্যাঙারু দেখেছেন কখনো, আসামির জবাব ‘না স্যার’

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯:২১ এএম, ১৩ এপ্রিল ২০২৬
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল

আপনি কি ক্যাঙারু দেখেছেন কখনো? জি না স্যার! আমি ভুল করেছি, ক্ষমা প্রার্থানা করি। আমার মাথা ঠিক ছিল না। ‘১২ হাজার কোটি টাকা খেয়ে সাবেক ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে’- সংক্রান্ত এম এইচ পাটোয়ারী বাবু নামের এক যুবলীগ নেতার ফেসবুক ওয়ালে পোস্ট করা আদালত অবমাননার বিষয়ে এভাবে শুনানি হয়।

এরপর শুনানি শেষে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে আদালত অবমাননার দায়ে তাকে দুই মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একই সঙ্গে তার স্ত্রীকে আদালত অবমাননার অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে যেন এমন কোনো পোস্ট না করা হয় সেজন্যে তাদের সতর্কও করেছেন আদালত।

তবে আদালত প্রথমে যুবলীগ নেতাকে অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনায় এক বছরের কারাদণ্ড অর্থাৎ ১২ মাসের সাজা দিয়েছিলেন। কিন্তু চিফ প্রসিকিউটরের অনুরোধে তার সাজা কমিয়ে তিন মাস করেন। এরপর আবারও চিফ প্রসিকিউটরের অনুরোধে তিন মাস থেকে ১ মাস কমিয়ে ২ মাস করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

রোববার (১২ এপ্রিল) ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচবারিক প্যানেল এই আদেশ দেন। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

আদালতে এদিন রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। অন্যদিকে আসামিপক্ষে উপস্থিত ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের বিএনপিপন্থি আইনজীবী অ্যাডভোকেট মাহাবুবুর রহমান খান। শুনানিতে আসামিপক্ষে অংশ নেন আইনজীবী এমএ হোসেন তালুকদার। প্রসিকিউশনের পক্ষে ছিলেন প্রসিকিউটর মোহাম্মদ মিজানুল ইসলাম, ফারুক আহাম্মদ, সুলতান মাহমুদ, আবদুস সাত্তার পালোয়ান, ব্যারিস্টার তানভির জোহা, শাইখ মাহদী, মঈনুল করিম ও তারেক সিাদ্দকীসহ অন্যরা।

এর আগে দুপুরে পোস্টকারীকে ট্রাইব্যুনালে আনা হয়। বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে শুনানি শুরু হয়। শুনানির প্রথমে তার স্ত্রীর জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়। এরপর এজলাসের কাঠগড়ায় স্ব-শরীরে উপস্থিত এম এইচ পাটোয়ারী বাবুর জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়।

তার পোস্ট করা অংশের বিষয়ে স্ক্রিনশট থেকে আদালতকে পড়ে শোনার জন্যে বলা হয়। প্রথমে পড়তে গড়িমসি করে। তখন আদালত বলেন, আইনজীবীর সহযোগিতা নিয়ে পড়েন। এরপর তিনি ঠিকমতো পড়েন। জবানবন্দিতে আসামি পাটোয়ারী বাবু নিজের ফেসবুক পেজ থেকে দেওয়া বিতর্কিত পোস্টটি পড়ে শোনান।

তিনি বলেন, আমার ফেইসবুক আইডির নাম এইচ, এম পাটোয়ারি বাবু। এই আইডি আমি নিজেই চালাই।

তিনি বলেন, ‘১২ হাজার কোটি টাকা খেয়েছেন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, সিনিয়র অ্যাডভোকেট মোহাম্মমদ শিশির মনির, চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তুজা মজুমদার। এ ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সিসিটিভি ফুটেজ গায়েব করে কম্পিউটারের হার্ডড্রাইভ পরিবর্তন করে এরই মধ্যে অবৈধ ক্যাঙারু কোর্টের অবৈধ প্রসিকিউটর তাজুল পালিয়েছেন! যে কোনো সময় অন্যরাও পালিয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।’

তিনি আরও লেখেন, ‘ভদ্রবেশী এসব জালিয়াতচক্র যদি বিনা বিচারে দেশ থেকে পালিয়ে যান, তার দায়-দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে। সংবিধান অনুযায়ী কেউ আইন ও বিচারের ঊর্ধ্বে নয়।’

তখন ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান আসামির কাছে জানতে চান আপনি কি ক্যাঙারু দেখেছেন কখনো? জি  না স্যার ! আমি ভুল করেছি। ক্ষমা প্রার্থানা করি। আমার মাথা ঠিক ছিল না। এ পর্যায়ে চিফ প্রসিকিউটর আদালতকে বলেন, অস্ট্রেলিয়া নিয়ে তাকে ক্যাঙারু দেখাতে হবে।

এরপর তাকে জিজ্ঞাসা করা হয় আপনি তো শুধু সচেতন নাগরিক না, একজন সচেতন রাজনীতিবিদও। হতাশায় আমি এমন করেছি।

আপনি যদি পরিবার ও সন্তান নিয়ে চিন্তিত হন তা হলে আদালত নিয়ে এমন পোস্ট করতেন না। কেন করলেন। কেউ কি বলছে নাকি নিজ ইচ্ছা করেছেন। জি স্যার আমি অন্যের পোস্ট শেয়ার করেছি।

এসময় তিনি ক্ষমা প্রার্থনা করেন আদালতে। 

পোস্টটি পড়ার পর ট্রাইব্যুনাল বলেন, আপনি ১২ হাজার কোটি টাকা কথায় লিখতে পারবেন? তাকে খাতা কলম দেওয়া হয় লেখার জন্য। সে কথায় লিখতে চাইলে আদালত বলেন অঙ্কে সংখ্যায় লিখেন। পরে তিনি লিখতে পারেননি। এরপর ১২ হাজার লিখতে বললে, ১ লাখ ২০ হাজার লিখেন। এটা নিয়ে আদালতে হাসা-হাসি হয়।

আসামির জবানবন্দি শেষে এ মামলার বিশেষ তদন্ত কর্মকর্তা ও প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহার বক্তব্য শোনে ট্রাইব্যুনাল। তিনি জানান, আদালতের আদেশ অনুযায়ী ৭ এপ্রিল তারা মিরপুরের শেওড়াপাড়ায় (শেনপাড়া) বাবুর বাসায় অভিযান চালান। তবে, সেখানে তাকে না পেয়ে তার স্ত্রীর কাছ থেকে মোবাইল ফোনটি জব্দ করা হয়। ডিবি ও মিরপুর মডেল থানা পুলিশের সহযোগিতায় পরিচালিত এই অভিযানের ধারাবাহিকতায় ৮ এপ্রিল বাবুর স্ত্রী ইসমাত জেরিনকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছিল। তখন তিনি চার দিনের মধ্যে তার স্বামীকে আদালতে উপস্থিত করার অঙ্গীকার করেছিলেন।

প্রসিকিউটর জোহা আরও জানান, জব্দ করা মোবাইল ফোনটি বর্তমানে ডিবি হেফাজতে রয়েছে, তবে তার ফেসবুক আইডিটি এখনও সক্রিয়।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, দেশের ৬৪ জেলার আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা-কর্মীরা সাইবার স্কোয়াড নামে একটি গোপন গ্রুপ পরিচালনা করেন, যার অন্যতম সক্রিয় সদস্য ছিলেন দণ্ডিত বাবু। এই গ্রুপের মূল কাজই হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিত্তিহীন, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যমূলক অপপ্রচার চালানো।

এসময় আসামি দাবি করেন, অন্য একটি আইডি থেকে লেখাটি কপি করে তিনি নিজের অ্যাকাউন্টে শেয়ার করেছিলেন। ভবিষ্যতে এ ধরনের উসকানিমূলক পোস্ট বা বক্তব্য দেবেন না বলে অঙ্গীকার করে তিনি ট্রাইব্যুনালের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেন।

এসময় যাচাই করলে দেখা যায় তিনি কপি করে পোস্ট করেননি। নিজের আইডিতে ৪ এপ্রিল পোস্ট করেছেন। যেখান থেকে কপি করার কথা বলেছেন তা একদিন পর ৪ এপ্রিল পোস্ট করা হয়।

তখন ট্রাইব্যুনাল বলে, আপনি এখনো মিথ্যা বলছেন। এরপর রায় ঘোষণা করে ট্রাইব্যুনাল।

এফএইচ/এমআইএইচএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।