প্রশ্ন করেই ধূমপান থামাচ্ছেন খাদেমুল
ঢাকার আদালতপাড়া—যেখানে প্রতিদিন মামলার ব্যস্ততা, আইনজীবীদের তর্ক আর বিচারপ্রার্থীদের ভিড়ে মুখর থাকে পরিবেশ। সেই চেনা দৃশ্যের মাঝেই এক ভিন্ন উদ্যোগ চোখে পড়ছে। এক ব্যক্তি শুধু একটি প্রশ্ন করেই থামিয়ে দিচ্ছেন প্রকাশ্যে ধূমপান—‘এখানে ধূমপান করা কি ঠিক?’
সম্প্রতি মহানগর দায়রা জজ আদালতের মিতালী ক্যান্টিনে দুপুরের খাবার শেষে বের হচ্ছিলেন ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের স্টোনোগ্রাফার মো. খাদেমুল ইসলাম। ঠিক তখনই আদালত চত্বরে কয়েকজন যুবককে প্রকাশ্যে ধূমপান করতে দেখে থেমে যান তিনি। মুঠোফোনের ক্যামেরা চালু করে সরাসরি প্রশ্ন ছুড়ে দেন—‘এখানে ধূমপান করা কি ঠিক?’
প্রশ্ন শুনে অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন ধূমপায়ীরা। কেউ উত্তর না দিয়ে সরে যান, কেউবা সঙ্গে সঙ্গে সিগারেট ফেলে দেন। মুহূর্তেই শেষ হয়ে যায় ধূমপান।
আরও পড়ুন
সিগারেটের দাম বাড়ায় ৩৭ শতাংশ তরুণ ধূমপায়ী ধূমপান কমিয়েছেন
ধূমপানের প্রবণতা কমেছে গণপরিবহনে: গবেষণা
‘ধূমপানমুক্ত বাংলাদেশ চাই’ আন্দোলনের এসআই শফিক পুরস্কৃত
জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় তামাকজাত দ্রব্যে কর বাড়ানোর প্রস্তাব
একই চিত্র দেখা যায় কাছাকাছি ‘ন্যায়কুঞ্জ’ বিশ্রামাগারের সামনে। বিচারপ্রার্থীদের জন্য তৈরি ওই স্থানে বসে ধূমপান করছিলেন এক মধ্যবয়স্ক ব্যক্তি। তাকেও একইভাবে প্রশ্ন করেন খাদেমুল ইসলাম। তিনি নিজের ভুল স্বীকার করে সিগারেট ফেলে দেন। এরপর সংক্ষেপে তাকে ধূমপানের ক্ষতিকর দিক বোঝান তিনি।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত জাগো নিউজের এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে খাদেমুল ইসলাম জানান, এটি কোনো একদিনের কাজ নয়। ২০২৩ সাল থেকে তিনি ঢাকার আদালত চত্বরে এককভাবে ধূমপানবিরোধী সচেতনতা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।
কথা বলার সময়ও আদালতের বিভিন্ন ফটকের সামনে কয়েকজনকে ধূমপান থেকে বিরত থাকতে বলেন তিনি। এমনকি আদালত এলাকায় ঢুকে পড়া এক হকারকেও নির্ধারিত এলাকার বাইরে থাকতে অনুরোধ করেন।

হকারকে নির্ধারিত এলাকার বাইরে থাকতে বলেন খাদেমুল ইসলাম, ছবি: জাগো নিউজ
এ সময় আশপাশে থাকা আইনজীবী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কেউ কেউ এগিয়ে এসে তার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন এবং তার উদ্যোগের প্রশংসা করেন।
খাদেমুল ইসলামের মতে, সিগারেট ও বিড়ির নিকোটিন অত্যন্ত ক্ষতিকর, যা মানুষের শরীরে মারাত্মক প্রভাব ফেলে। তার দাবি, দেশে প্রতি বছর ধূমপানজনিত কারণে এক লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। এই ক্ষতি কমাতেই তিনি মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা করছেন।
তিনি ‘ধূমপানমুক্ত ও পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ চাই’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তুলেছেন, যার প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যানও তিনি। ব্যক্তিগত উদ্যোগেই আদালত, আশপাশের সড়ক এবং জনসমাগমস্থলে মানুষকে ধূমপান থেকে বিরত থাকতে বলেন।
আরও পড়ুন
ধূমপান যেভাবে নষ্ট করে আপনার হার্ট
ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার নিয়ন্ত্রণসহ সংসদে ৮ বিল পাস
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে সিগারেট বিক্রি করলে ৫০০০ টাকা জরিমানা
ঢাবির হলে ধূমপানে জরিমানা, মাদক সেবনে বহিষ্কার
আইনগত বিষয়টিও সামনে আনেন খাদেমুল ইসলাম। তিনি বলেন, ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫-এর সংশোধিত বিধান অনুযায়ী জনসমক্ষে ধূমপান করলে সর্বোচ্চ দুই হাজার টাকা জরিমানা করা যায়। বর্তমানে কোনো প্রতিষ্ঠানে ‘স্মোকিং জোন’ রাখার সুযোগও নেই।
খাদেমুল ইসলাম এর আগে ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের নাজির হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তখনও আদালত চত্বর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে কাজ করেছিলেন বলে জানান তিনি। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনায় থাকা বিভিন্ন স্থান পরিষ্কার করে সৌন্দর্যবর্ধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল তার নেতৃত্বে। পরে দায়িত্ব থেকে সরে গেলেও থেমে নেই তার কার্যক্রম।
তবে এই পথ সহজ ছিল না। ধূমপানবিরোধী কার্যক্রম চালাতে গিয়ে বাধা এমনকি হামলার মুখেও পড়েছেন বলে জানান খাদেমুল ইসলাম। তবুও তিনি এটিকে ‘মানবকল্যাণের যুদ্ধ’ হিসেবে দেখেন এবং থেমে যাননি।

‘ধূমপানমুক্ত ও পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ চাই’ সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান খাদেমুল ইসলাম, ছবি: জাগো নিউজ
মুঠোফোনে ধারণ করা ভিডিও নিয়মিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করেন তিনি। এতে অনেকেই ধূমপানের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে জানতে পারছেন এবং সচেতন হচ্ছেন। পাশাপাশি, এমন উদ্যোগের কারণে অনেকে প্রকাশ্যে ধূমপান করা থেকে বিরত থাকছেন বলে জানান তিনি।
খাদেমুল ইসলাম মনে করেন, সরকার, বিচার বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসন সমন্বিতভাবে উদ্যোগ নিলে ধূমপানমুক্ত আদালত চত্বর গড়ে তোলা সম্ভব। তার মতে, সচেতনতা ও আইনের কার্যকর প্রয়োগই পারে এই লক্ষ্য অর্জন করতে।
খাদেমুলের প্রশংসায় আইনজীবীরা
খাদেমুল ইসলামের ধূমপানবিরোধী কার্যক্রম প্রসঙ্গে ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের আইনজীবী মাহিয়া বিনতে মাহবুব বলেন, ‘এই ছোট ছোট উদ্যোগ হয়তো বড় কোনো আন্দোলন নয়, কিন্তু প্রতিদিনের আচরণে পরিবর্তন আনার চেষ্টা, যা ধীরে ধীরে বড় সামাজিক পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করতে পারে।’
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মাহবুবুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘খাদেমুল ইসলাম আদালত প্রাঙ্গণ পরিচ্ছন্ন রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। হকারমুক্ত করা, মাদকবিরোধী অবস্থান—এসব কারণে তিনি প্রশংসিত। যদিও কিছু ক্ষেত্রে বিরোধিতারও মুখে পড়তে হয়েছে তাকে।’
তরুণ আইনজীবী সায়েম হোসেন বলেন, ‘আদালত একটা সংবেদনশীল জায়গা। এখানে সবাই ন্যায়ের আশায় আসেন। সেখানে প্রকাশ্যে ধূমপান সত্যিই বেমানান। উনার এই উদ্যোগ দেখে মনে হয়েছে, কাউকে না কাউকে তো শুরু করতেই হবে।’

ঢাকার আদালত চত্বরে ধূমপান নিয়ে সচেতন করছেন খাদেমুল ইসলাম, ছবি: জাগো নিউজ
আদালতের বেঞ্চ সহকারী আরিফুল ইসলাম বলেন, শুরুর দিকে অনেকে বিষয়টা হালকাভাবে নিয়েছিল। কিন্তু এখন যখনই উনাকে দেখি, সবাই একটু সতর্ক হয়ে যায়। এটা ধীরে ধীরে অভ্যাসে পরিণত হচ্ছে।’
বিচারপ্রার্থীরা যা বললেন
আদালতে আসা বিচারপ্রার্থী মো. রফিকুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি নিজে ধূমপান করি না, কিন্তু পাশে বসে অন্য কেউ করলে কষ্ট লাগে। তিনি (খাদেমুল ইসলাম) যখন প্রশ্ন করলেন, তখন বুঝলাম, আসলে আমরা অনেক সময় অন্যের অসুবিধার কথা ভাবি না। তার এইভাবে সরাসরি বলা দরকার ছিল।’
জেসমিন আরা নামের একজন বিচারপ্রার্থী বলেন, ‘আমরা অনেক সময় প্রতিবাদ করতে পারি না। কিন্তু উনি যেভাবে সামনে এসে বলেন, এতে আমাদেরও সাহস বাড়ে। অন্তত মনে হয়, এই জায়গাটা একটু হলেও নিরাপদ হচ্ছে। এসব ছোট ছোট হস্তক্ষেপ, সরাসরি প্রশ্ন আর ব্যক্তিগত উদ্যোগ, সব মিলিয়ে আদালতপাড়ায় ধীরে ধীরে গড়ে উঠবে এক নতুন সংস্কৃতি, যেখানে ধূমপানকে আর স্বাভাবিক হিসেবে দেখা হবে না। নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে সচেতনভাবে।’

ধূমপান নিয়ে সচেতন করছেন খাদেমুল ইসলাম, ছবি: জাগো নিউজ
সহকর্মীর মুখে পরিবর্তনের গল্প
খাদেমুল ইসলামের এক সহকর্মী নাম না প্রকাশ করার শর্তে জাগো নিউজকে জানান, তিনি আগে নিয়মিত ধূমপান করতেন। কিন্তু খাদেমুল ইসলামের সচেতনতামূলক কথাবার্তা এবং সরাসরি প্রশ্ন তাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে।
তিনি বলেন, ‘প্রথম দিকে উনার (খাদেমুল ইসলাম) কথা শুনে একটু অস্বস্তি লাগত। মনে হতো, এটা তো আমার ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু পরে বুঝলাম, আসলে এটা শুধু আমার না। আমার পরিবারের, সহকর্মীদের, আশপাশের সবার বিষয়। উনার কাছ থেকেই বারবার শুনেছি ধূমপানের ক্ষতি নিয়ে। একসময় নিজেই সিদ্ধান্ত নিই, আর না। দুই বছর ধরে ধূমপান করি না। নিজের জন্য, পরিবারের জন্য এবং অন্যদের ভালোর জন্য ধূমপান ছাড়ার সিদ্ধান্তটা নিয়েছি।’
খাদেমুল ইসলাম নিজেও বলেন, তার এই একক উদ্যোগে ইতোমধ্যে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। তিনি বলেন, ‘প্রতিদিনই অনেক মানুষ আমাকে কথা দেন, আর ধূমপান করবেন না। আমি বিশ্বাস করি, তারা সেই কথা রাখছেন। আমার পরিচিত অনেক সহকর্মী ও আইনজীবী আছেন, যাদের আগে নিয়মিত ধূমপান করতে দেখতাম, এখন তারা আর ধূমপায়ী নন। এটা আমার জন্য সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।’
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘এটা কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযান না, কিন্তু প্রভাবটা অনেক গভীর। একজন মানুষ একা দাঁড়িয়ে যে কাজটা করছেন, সেটা অনেক সময় বড় বড় প্রচারণার চেয়েও কার্যকর হয়। কারণ এখানে সরাসরি জবাবদিহিতা তৈরি হচ্ছে।’
এমডিএএ/এমএমএআর/ এমএফএ