নারী-শিশু নির্যাতন মামলায় সাজার হার ৩ শতাংশ, খালাস ৭০

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৩:৪৯ পিএম, ০২ মে ২০২৬
নারী ও শিশু নির্যাতন বিষয়ক প্রায় ৭০ শতাংশ মামলার আসামিরা খালাস পাচ্ছেন/ প্রতীকী ছবি

দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বিচারপ্রাপ্তির চিত্র উদ্বেগজনক। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, এসব মামলায় সাজার হার মাত্র ৩ শতাংশ, বিপরীতে প্রায় ৭০ শতাংশ মামলায় আসামিরা খালাস পাচ্ছেন।

বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, দুর্বল তদন্ত এবং সাক্ষী সুরক্ষার অভাবকে এ পরিস্থিতির প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও ব্র্যাকের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পদ্ধতিগত প্রতিবন্ধকতা এবং তা নিরসনের উপায়’ শীর্ষক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে।

শনিবার (২ মে) রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে আয়োজিত এক পরামর্শ সভায় গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়।

গবেষণাটি দেশের ৩২ জেলার ৪৬টি ট্রাইব্যুনালে ২০২৫ সালে জানুয়ারি থেকে জুন সময়কালে নিষ্পত্তি হওয়া ৪ হাজার ৪০টি মামলার নথি বিশ্লেষণের ভিত্তিতে করা হয়েছে।

এতে মামলার সময়সীমা, মুলতবি, সাক্ষ্য-অভিযুক্তের তথ্য, ফরেনসিক ও মেডিকেল প্রতিবেদন, দণ্ড ও খালাসের ধরনসহ বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করা হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ আইনে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির বাধ্যবাধকতা থাকলেও বাস্তবে বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতায় জর্জরিত।

একটি মামলা নিষ্পত্তি হতে গড়ে সময় লাগছে প্রায় ৩ বছর ৭ মাস, অর্থাৎ এক হাজার ৩৭০ দিন। এ সময়ের মধ্যে প্রতিটি মামলায় গড়ে ২২ বার করে তারিখ পড়ছে, যা বিচার বিলম্বের একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে।

মামলার ফলাফল বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, এসব মামলায় সাজার হার অত্যন্ত কম, মাত্র ৩ শতাংশ। বিপরীতে প্রায় ৭০ শতাংশ মামলায় আসামিরা খালাস পাচ্ছেন। এছাড়া প্রায় ১০ শতাংশ মামলা আপসের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হচ্ছে, যা বিচারপ্রক্রিয়ার কার্যকারিতা ও ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার প্রাপ্তি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।

আরও পড়ুন
নিম্ন আদালত মনিটরিংয়ে পুনর্গঠিত কমিটিতে হাইকোর্টের ১৩ বিচারপতি 
‘ফ্যাসিস্টের সহযোগী’ বলে হয়রানি, প্রধানমন্ত্রীকে ইউরোপীয় সংগঠনের চিঠি 

গবেষণায় বিচার বিলম্বের পেছনে কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- অভিযোগকারী ও সাক্ষীর অনুপস্থিতি, ঘনঘন সময় প্রার্থনা, তদন্তে বিলম্ব, দুর্বল প্রমাণ ব্যবস্থা, ফরেনসিক ও ডিএনএ রিপোর্ট পেতে দেরি এবং সাক্ষী সুরক্ষার অভাব।

এছাড়া তদন্তের নিম্নমান, নিষিদ্ধ পদ্ধতির ব্যবহার (যেমন টু-ফিঙ্গার টেস্ট), সামাজিক চাপের কারণে আপস বা মামলা থেকে সরে দাঁড়ানো, আইনি অধিকার সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং অভিযুক্তদের প্রভাবও বিচারপ্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে বলে উল্লেখ করা হয়।

পরামর্শ সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, এখানে আলোচনায় বিভিন্ন সমস্যা উঠে এসেছে, পরিসংখ্যান এসেছে, বাস্তব চিত্র এসেছে। এসবের মূল কথা হলো, আমাদের সক্ষমতা, বিশেষ করে রাষ্ট্রের বিচার বিভাগ ও আইন প্রশাসনের সক্ষমতা।

মন্ত্রী বলেন, আমি দীর্ঘদিন আইনজীবী ছিলাম, অ্যাটর্নি জেনারেল ছিলাম, বর্তমানে আইনমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। আমার অভিজ্ঞতায় মনে হয়েছে, রাষ্ট্রের প্রধান তিনটি অঙ্গের মধ্যে বিচার বিভাগ সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত। জাতীয় বাজেটের দিকে তাকালে এটি স্পষ্ট হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, পুরো বিচার বিভাগের জন্য বরাদ্দ যেখানে প্রায় ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা, সেখানে শুধু বিটিভির জন্য বরাদ্দ প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। যুব উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দও এর চেয়ে বেশি। অথচ একটি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ বিচার বিভাগ এই সীমিত বরাদ্দে পরিচালিত হচ্ছে- বিচারকদের বেতন, প্রশাসনিক খরচ, অবকাঠামো, সবকিছু মিলিয়ে এটি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং।

আসাদুজ্জামান আরও বলেন, আমি চাই বিচার বিভাগের বাজেট আরও বৃদ্ধি পাক। কিন্তু বাজেট আলোচনায় নানান স্তরের প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অনেক সময় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় জটিলতা দেখা দেয়। এই কাঠামোগত সমস্যাগুলো আমাদের সমাধান করতে হবে।

তিনি বলেন, বিচার বিভাগে বিচারক নিয়োগ, পদোন্নতি এবং কাঠামোগত ভারসাম্য নিয়েও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। নিম্ন আদালত থেকে শুরু করে উচ্চ আদালত পর্যন্ত জনবল কাঠামোতে কিছু অসামঞ্জস্য দেখা যায়। দ্রুত নিয়োগ প্রক্রিয়া চালু করা এবং জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করা প্রয়োজন। বর্তমান প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের নিয়োগ প্রক্রিয়া অনেক স্বচ্ছতা ও দক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত হয়েছে, যা প্রশংসনীয়। একইভাবে বার কাউন্সিলের পরীক্ষাও যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়েছে। যদিও সেখানে কিছু বিতর্ক ছিল, তবে প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি। 

সভায় বিশেষ অতিথি ছিলেন মন্ত্রণালয়ের সচিব লিয়াকত আলী মোল্লা এবং আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মঞ্জুরুল হোসেন। সভাপতিত্ব করেন ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ। গবেষণা উপস্থাপন করেন সাবেক জেলা ও দায়রা জজ উম্মে কুলসুম। স্বাগত বক্তব্য দেন ব্র্যাকের সামাজিক ক্ষমতায়ন ও আইনি সুরক্ষা এবং জেন্ডার জাস্টিস অ্যান্ড ডাইভারসিটি কর্মসূচির সহযোগী পরিচালক শাশ্বতী বিপ্লব। অনুষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিচার বিভাগ, মানবাধিকার সংগঠন এবং উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

এফএইচ/কেএসআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।