ঢাকা আইনজীবী সমিতি নির্বাচনে যে কারণে একচেটিয়া জয় বিএনপিপন্থিদের
ঢাকা আইনজীবী সমিতির (ঢাকা বার) ২০২৬-২০২৭ কার্যনির্বাহী কমিটির নির্বাচনে একচেটিয়া জয় পেয়েছে বিএনপিপন্থিদের আইনজীবীদের বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ঐক্য প্যানেল বা নীল প্যানেল। সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ ২৩টি পদের প্রতিটিতেই বিপুল ভোটে জয় পেয়ে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করতে যাচ্ছে তারা।
নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত কোনো প্যানেল অংশ নেয়নি। আওয়ামীপন্থি আইনজীবীদের দাবি, তাদের অংশগ্রহণের সুযোগই দেওয়া হয়নি। নির্বাচন করতে না পারায় তাদের সমর্থকেরা ভোটও দেননি এবারের নির্বাচনে।
নির্বাচনে নীল প্যানেলের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সমর্থিত আইনজীবী ঐক্য পরিষদ বা‘সবুজ প্যানেল’। নির্বাচনে গুরুতর জালিয়াতি, ইঞ্জিনিয়ারিং ও কারচুপির অভিযোগ তুলেছে এনসিপি সমর্থিত ন্যাশনাল ল’ইয়ার্স অ্যালায়েন্স। তবে নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা প্রধান নির্বাচন কমিশনার সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
আরও পড়ুন
সব পদে জয় পেলো বিএনপিপন্থি নীল প্যানেল
বিএনপি প্যানেলের বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ লইয়ার্স অ্যালায়েন্সের
ঢাকা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে ভোট পড়েছে ৩৪ শতাংশ
ঢাকা বার নির্বাচন: ভোট কম পড়ার যে কারণ জানালেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার
দুই দশকের বেশি সময় একসঙ্গে নির্বাচন করা বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীপন্থি আইনজীবীরা এবার আলাদা প্যানেলে একে অপরের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। বিএনপির সঙ্গে নির্বাচনে ছিল তাদের জোটসঙ্গী গণঅধিকার পরিষদ। আর জামায়াতের সঙ্গে ছিল তাদের জোটসঙ্গী এনসিপি।
বিএনপিপন্থিদের ‘ক্লিন সুইপ’
শুক্রবার (১ মে) দিবাগত রাতে ঢাকা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করা হয়। ঘোষিত ফলাফলে দেখা যায়, ২৩টি পদের প্রতিটিতেই নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছেন বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা। নির্বাচন বিশ্লেষকদের ভাষায়, এটি একটি ‘ক্লিন সুইপ’ বা সম্পূর্ণ একচেটিয়া বিজয়।
‘ক্লিন সুইপ’ বলার কারণ, প্রতিদ্বন্দ্বী সবুজ প্যানেল (জামায়াত-এনসিপি সমর্থিত) একটি পদেও জয়ী হতে পারেনি। সব পদে উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছে নীল প্যানেল। এতে বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠতাই অর্জন করেননি, পুরো কার্যনির্বাহী কমিটির নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করেছেন।
আইনজীবীরা বলছেন, পুরো কমিটিতে বিরোধী প্যানেলের একজন প্রার্থীও জয় না পাওয়ায় এই ফলাফলকে ‘ক্লিন সুইপ’ হিসেবে চিহ্নিত করার মূল কারণ, যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষ সম্পূর্ণভাবে ভোটের ম্যান্ডেট হারিয়েছে।
ঢাকা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে জেতার পর সভাপতি মো. আনোয়ার জাহিদ ভূঁইয়া ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আবুল কালাম খানকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানানো হয়, ছবি: সংগৃহীত
কে কত ভোট পেয়েছেন
নীল প্যানেলের প্রার্থীরা প্রতিটি পদেই বিপুল সংখ্যক ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করেছেন, যা নির্বাচনে তাদের একচেটিয়া আধিপত্যকে স্পষ্ট করে। নীল প্যানেলের বিজয়ী প্রার্থীদের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ছিলেন জামায়াত-এনসিপি সমর্থিত সবুজ প্যানেলের আইনজীবীরা।
নির্বাচনে সভাপতি পদে নীল প্যানেলের মো. আনোয়ার জাহিদ ভূঁইয়া ৪ হাজার ৪৬৮ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সবুজ প্যানেলের এস এম কামাল উদ্দিন পেয়েছেন ২ হাজার ১৭৯ ভোট। স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. ইউনূস আলী বিশ্বাস পেয়েছেন ১৪৬ ভোট।
সাধারণ সম্পাদক পদে নীল প্যানেলের মোহাম্মদ আবুল কালাম খান ৪ হাজার ৪৯ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন, যেখানে সবুজ প্যানেলের মো. আবু বক্কর সিদ্দিক পেয়েছেন ১ হাজার ৬৬১ ভোট। এই পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. শহিদুল্লাহ ৪২৪ ভোট ও বলাই চন্দ্র দেব ৩৫৫ ভোট পেয়েছেন।
সিনিয়র সহ-সভাপতি পদে নীল প্যানেলের মো. রেজাউল করিম চৌধুরী ৪ হাজার ৫০৮ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সবুজ প্যানেলের মো. শহিদুল ইসলাম পেয়েছেন ২ হাজার ৫৪ ভোট।
আরও পড়ুন
ঢাকা বার নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ, সুপ্রিম কোর্টে বিক্ষোভ
আদালত বর্জন করে আজও বিএনপি-জামায়াতপন্থি আইনজীবীদের বিক্ষোভ
আ’লীগের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার চেয়ে জাতিসংঘে আইনজীবীদের আবেদন
‘ফ্যাসিস্টের সহযোগী’ বলে হয়রানি, প্রধানমন্ত্রীকে ইউরোপীয় সংগঠনের চিঠি
সহ-সভাপতি পদে নীল প্যানেলের মো. আবুল কালাম আজাদ ৪ হাজার ৪৩৩ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন, তার প্রতিদ্বন্দ্বী সবুজ প্যানেলের মো. লুৎফর রহমান আজাদ পেয়েছেন ২ হাজার ১১৩ ভোট।
কোষাধ্যক্ষ পদে নীল প্যানেলের মোহাম্মদ আনিসুজ্জামান (আনিস) ৩ হাজার ৯৪৫ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সবুজ প্যানেলের মো. আজমত হোসেন পেয়েছেন ২ হাজার ৫০৫ ভোট। স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. রফিকুল ইসলাম পেয়েছেন ২১১ ভোট।
সিনিয়র সহ-সাধারণ সম্পাদক পদে নীল প্যানেলের মো. এলতুতমিশ সওদাগর (অ্যানি) ৪ হাজার ৩৫৫ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন, যেখানে তার প্রতিদ্বন্দ্বী সবুজ প্যানেলের মো. শাহীন আক্তার পেয়েছেন ২ হাজার ২২৪ ভোট।
সহ-সাধারণ সম্পাদক পদে নীল প্যানেলের মো. মাহাদী হাসান জুয়েল ৩ হাজার ৬৯৯ ভোট পেয়ে জয়লাভ করেছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সবুজ প্যানেলের মো. মেহেদী হাসান ভূঁইয়া পেয়েছেন ২ হাজার ২৮৬ ভোট। এই পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী দেওয়ান আবুল হোসেন পেয়েছেন ৬২৫ ভোট।

গ্রন্থাগার সম্পাদক পদে নীল প্যানেলের খন্দকার মাকসুদুল হাসান (সবুজ) ৪ হাজার ৩২০ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন, বিপরীতে নীল প্যানেলের মো. শাহাদাত হোসাইন পেয়েছেন ২২৫৫ ভোট।
সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে নীল প্যানেলের মারজিয়া হীরা ৩ হাজার ৮৭৯ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সবুজ প্যানেলের বিলকিস আক্তার পেয়েছেন ২ হাজার ২৪৯ ভোট। স্বতন্ত্র প্রার্থী ওলিদা বেগম পেয়েছেন ৫৯৭ ভোট।
অফিস সম্পাদক পদে নীল প্যানেলের মো. আফজাল হোসেন মৃধা ৩ হাজার ৯৪০ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন, তার প্রতিদ্বন্দ্বী সবুজ প্যানেলের আব্দুর রাজ্জাক পেয়েছেন ২ হাজার ১৭৬ ভোট। স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. জাকির হোসেন পেয়েছেন ৫৭৮ ভোট।
আরও পড়ুন
আইনজীবীদের নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারে ‘৪ ম্যাজিক ফ্যাক্টর’
ঢাকা আইনজীবী সমিতির ভোটগ্রহণ শুরু
ঢাকা আইনজীবী সমিতি নির্বাচনের প্রথম দিনে ভোট ১৩.২৭ শতাংশ
ঢাকা বার নির্বাচনে দ্বিতীয় দিনের ভোট চলছে, বাকি ৮৬.৭৩ শতাংশ ভোট
ক্রীড়া সম্পাদক পদে নীল প্যানেলের মো. সোহেল খান ৪ হাজার ৪৫০ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন, যেখানে তার প্রতিদ্বন্দ্বী সবুজ প্যানেলের মো. বাবুল আক্তার বাবু পেয়েছেন ২ হাজার ৫১০ ভোট।
সমাজকল্যাণ সম্পাদক পদে নীল প্যানেলের এ. এস. এম ফিরোজ ৪ হাজার ১৪৪ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সবুজ প্যানেলের শাহজাহান মোল্লা পেয়েছেন ২ হাজার ৫৩৩ ভোট।
তথ্য ও যোগাযোগ সম্পাদক পদে নীল প্যানেলের শফিকুল ইসলাম শফিক ৪ হাজার ৫৯৭ ভোট পেয়ে জয়লাভ করেছেন, যেখানে সবুজ প্যানেলের মুস্তাফিজুর রহমান মাসুদ পেয়েছেন ২ হাজার ৭৯ ভোট।
ঢাকা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে জয়ী নীল প্যানেলের সদস্য প্রার্থীরা, ছবি: সংগৃহীত
সদস্য পদেও নীল প্যানেলের নিরঙ্কুশ জয়
সদস্য পদেও নীল প্যানেলের প্রার্থীরা আধিপত্য বজায় রেখেছেন। সর্বোচ্চ ৪ হাজার ৪২৩ ভোট পেয়ে প্রথম হয়েছেন ফারজানা ইয়াসমিন। এছাড়া নির্বাচিতদের মধ্যে রয়েছেন— নীল প্যানেলের মো. নজরুল ইসলাম (মামুন) ৪ হাজার ৩০৩ ভোট, মো. আদনান রহমান ৪ হাজার ২৭৫ ভোট, সৈয়দ সারোয়ার আলম (নিশান) ৪ হাজার ৯ ভোট, মামুন মিয়া ৩ হাজার ৯৫১ ভোট, মো. নিজাম উদ্দিন ৩ হাজার ৮৯৪ ভোট, মো. সানাউল ৩ হাজার ৮৮৪ ভোট, মুজাহিদুল ইসলাম (সায়েম) ৩ হাজার ৭৪০ ভোট, এ. এইচ. এম রেজওয়ানুল সাঈদ (রোমিও) ৩ হাজার ৫০৪ ভোট ও শেখ শওকত হোসেন ৩ হাজার ৪১১ ভোট।
অন্যদিকে, পরাজিত প্রার্থীদের মধ্যে মো. জহিরুল ইসলাম ২ হাজার ৬৩৫ ভোট, মো. কাইয়ুম হোসেন নয়ন ২ হাজার ৪২৭ ভোট, বেলাল হোসেন ২ হাজার ৩৭২ ভোট, দিলরুবা আক্তার (সুবর্ণা) ২ হাজার ৩০৯ ভোট, মো. শাহ আলম ১,৯৫৮ ভোট, কাওসার আহমেদ ১ হাজার ৯৫৪ ভোট, মো. মহসিন (রেজা) ১ হাজার ৯৩৪ ভোট, মো. ওমর ফারুক ১ হাজার ৯১৭ ভোট, মোশাররফ হোসাইন ১ হাজার ৮৬৯ ভোট, মো. ইউনুস ১ হাজার ৮২৯ ভোট এবং মৌসুমী বেগম (ঢাকাইয়া) ১ হাজার ১২২ ভোট পেয়েছেন।
সব মিলিয়ে, প্রতিটি পদে বড় ব্যবধানে জয়লাভ করে এবারের ঢাকা আইনজীবী সমিতি নির্বাচনে একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে বিএনপিপন্থি নীল প্যানেল।
ঢাকা আইনজীবী সমিতি নির্বাচনে ভোটারের অপেক্ষায় প্রার্থীদের সমর্থকেরা, ছবি: জাগো নিউজ
ভোট দেওয়ার হার মাত্র ৩৪ শতাংশ
দুইদিনব্যাপী নির্বাচনে ভোট নেওয়া হয় গত ২৯ ও ৩০ এপ্রিল। প্রথম দিন ২৯ এপ্রিল ২ হাজার ৭৫৯ জন ভোট দেন, দ্বিতীয় দিন ৩০ এপ্রিল ভোট দেন ৪ হাজার ৩১০ জন। ফলে দুই দিনে মোট ৭ হাজার ৬৯ জন তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। ভোট দেওয়ার হার প্রায় ৩৪ শতাংশ। ২০ হাজার ৭৮৫ জন ভোটারের মধ্যে ১৩ হাজার ৭১৬ জনই ভোট দেননি।
গত আটটি নির্বাচনের তুলনায় এটি অন্যতম সর্বনিম্ন ভোটার উপস্থিতি বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। ২০১৮-১৯ সালের নির্বাচনে সর্বোচ্চ ৬২ শতাংশ ভোট পড়েছিল। পরবর্তী বছরগুলোতে তা ধারাবাহিকভাবে কমে ২০২৪-২৫ সালে ৪৬ শতাংশে নেমে আসে। এবার তা আরও কমেছে।
গত কয়েক বছরের নির্বাচনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ সালে ২১ হাজার ২০৮ ভোটারের মধ্যে ৯ হাজার ৬৯০ জন বা ৪৬ শতাংশ ভোট দেন। ২০২৩-২৪ সালে ভোটার ছিল ১৯ হাজার ৬১৮ জন, ভোট দেন ৯ হাজার ২৪৩ জন বা ৪৭ শতাংশ। ২০২২-২৩ সালে ৫৭ শতাংশ, ২০২১-২২ সালে ৪৯ শতাংশ, ২০২০-২১ সালে ৫১ শতাংশ এবং ২০১৯-২০ সালে ৫২ শতাংশ ভোট পড়ে।
ঢাকা আইনজীবী সমিতি নির্বাচনে গত ২৯ ও ৩০ এপ্রিল ভোট দেন আইনজীবীরা, ছবি: জাগো নিউজ
‘ভোটে কোনো উৎসাহ-উদ্দীপনা ছিল না’
বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের কেন্দ্রীয় সদস্য শাহীন মোর্শেদ ভোটার উপস্থিতি নিয়ে সমালোচনা করে শনিবার সকালে জাগো নিউজকে বলেন, ‘অতীতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ভোট প্রায় সমান ছিল। সেই হিসাবে আমাদের সমর্থক প্রায় অর্ধেক ভোটার। কিন্তু এই নির্বাচনে আমাদের অংশগ্রহণের সুযোগই দেওয়া হয়নি। ফলে ভোটার উপস্থিতি নেমে এসেছে মাত্র ৩৪ শতাংশে। এর মধ্য দিয়েই প্রমাণ হয়, ভোটে কোনো উৎসাহ-উদ্দীপনা ছিল না। দেশের ইতিহাসে ৫৪ বছর পর আওয়ামী লীগকে ছাড়া এভাবে নেতৃত্ব নির্বাচন করা হলো। যে দল দেশ স্বাধীন করেছে, আইনজীবী সমিতি প্রতিষ্ঠা করেছে, তাদের বাইরে রেখে নির্বাচন আয়োজন করা আইনপরিপন্থি।’
অ্যাডভোকেট শাহীন মোর্শেদ বলেন, যারা বহুদলীয় গণতন্ত্রের কথা বলে, তাদের সময়েই দেশের বৃহৎ একটি রাজনৈতিক ধারার সমর্থক আইনজীবীদের বাইরে রেখে নির্বাচন সম্পন্ন হলো। অথচ আওয়ামী লীগের ১৭ বছরের সময়কালে সবাই নির্বাচনে অংশ নিতে পেরেছে এবং নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পেরেছে। কিন্তু এখন যারা বহুদলীয় গণতন্ত্রের কথা বলছে, তারা গণতন্ত্রকে খাঁচায় বন্দি রেখে পুরো প্যানেল দিয়ে জয়লাভ করেছে। এর ফলে প্রকৃত গণতন্ত্র, আইন ও বিচারব্যবস্থা দেশের মানুষের সামনে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
‘এই পরিস্থিতির মাধ্যমে স্পষ্ট হয়, বর্তমান সরকার এসব মূল্যবোধে বিশ্বাস করে না।’ যোগ করেন শাহীন মোর্শেদ।

অনিয়মের অভিযোগ
ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পরপরই নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে ভিন্নমত দেখা যায়। জামায়াতপন্থি আইনজীবীরা ভোটে জালিয়াতি ও অনিয়মের অভিযোগ তোলেন। তবে নির্বাচন কমিশন এবং বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য বলে দাবি করেন।
এনসিপি-সমর্থিত সংগঠন ন্যাশনাল ল’ইয়ার্স অ্যালায়েন্স ঢাকা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে বিএনপি-সমর্থিত নীল প্যানেলের বিরুদ্ধে গুরুতর জালিয়াতি, ইঞ্জিনিয়ারিং ও কারচুপির অভিযোগ তুলেছে।
সংগঠনটির দাবি, নির্বাচন কমিশন গঠন থেকে শুরু করে ভোটগ্রহণ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াই পূর্বপরিকল্পিত অনিয়ম ও পক্ষপাতিত্বের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে এবং নীল প্যানেলের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে ছিল।
নির্বাচনে ভোট গ্রহণের পর তা কমপিউটারে গণনা করা হয়, ছবি: জাগো নিউজ
তাদের অভিযোগ অনুযায়ী, ভোটগ্রহণের সময় জাল ভোট প্রদান, বুথের ভেতরে ব্যালটে জোরপূর্বক সিল মারা, বিরোধী প্যানেলের এজেন্টদের বের করে দেওয়া, যাচাই-বাছাই ছাড়া ব্যালট বিতরণ এবং আগেই ভোট দিয়ে ফেলার মতো একাধিক অনিয়ম ঘটেছে। এসব ঘটনাকে তারা বিচ্ছিন্ন নয়, সুপরিকল্পিত ভোট কারচুপি হিসেবে অভিহিত করেছে।
সংগঠনটি আরও দাবি করে, এটি অতীতের ফ্যাসিবাদী শাসনামলের নির্বাচনি অনিয়মের পুনরাবৃত্তি। তাদের মতে, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে এ ধরনের নির্বাচন শহীদদের প্রত্যাশার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা।
সংগঠনটির মুখ্য সংগঠক ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সাকিল আহমাদ বলেন, অনিয়মে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে এবং ভবিষ্যতে একটি নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে আইনজীবী সমাজের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য বজায় থাকে।
ঢাকা আইনজীবী সমিতির নবনির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আবুল কালাম খান, ছবি: সংগৃহীত
অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার জয়ীদের
ঢাকা আইনজীবী সমিতির নবনির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আবুল কালাম খান জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের জয়ের মূল কারণ হচ্ছে, আমাদের প্যানেল শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জাতীয়তাবাদী আদর্শে বিশ্বাস করে। আমরা স্বাধীনতা, ভাষা আন্দোলন ও জুলাই আন্দোলনের চেতনা ধারণ করি। এ কারণে আইনজীবীরা আমাদের প্রতি আস্থা রেখেছেন। অন্যদিকে, আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের স্বাধীনতা যুদ্ধসহ বিভিন্ন সময়ের ভূমিকা সাধারণ মানুষ ইতিবাচকভাবে নেয়নি।’
তিনি বলেন, ‘ভোট সুষ্ঠুভাবেই হয়েছে। তারা যে অভিযোগ আনছে, তার কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। আপনারা ভোটের ব্যবধান দেখলেই বুঝতে পারবেন। আমাদের অনেক প্রার্থী দ্বিগুণ ভোটে বিজয়ী হয়েছেন।’
ভোটার উপস্থিতি কম হওয়ার বিষয়ে আবুল কালাম খান বলেন, ‘আমরা মনে করি বৈরী আবহাওয়াই এর প্রধান কারণ। টানা দুই দিনের খারাপ আবহাওয়ার কারণে অনেক আইনজীবী ভোটকেন্দ্রে আসতে পারেননি। পাশাপাশি, এই কারণে অনেক নতুন সদস্য ও ভোটারও ভোট দিতে পারেননি।’
বিএনপিপন্থি প্যানেলের সমর্থক ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ নজরুল ইসলাম বলেন, ‘অতীতে ভোট কারচুপির মাধ্যমে ফলাফল প্রভাবিত করা হয়েছে। এবার একটি অংশ ভোট বর্জন করায় ভোটার উপস্থিতি কিছুটা কমেছে, তবে নির্বাচন তুলনামূলকভাবে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হয়েছে।’
প্রধান নির্বাচন কমিশনার অ্যাডভোকেট মো. বোরহান উদ্দিন, ছবি: জাগো নিউজ
যা বললেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার
নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি তুলনামূলক কম হওয়ায় এর পেছনে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও বৈরী আবহাওয়াকে দায়ী করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার অ্যাডভোকেট মো. বোরহান উদ্দিন।
তার মতে, দীর্ঘ সময় নির্বাচন না হওয়ায় আইনজীবীদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এবারের নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে এবং ভোটারদের আস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়েছে।
শুক্রবার ভোট গণনা শুরুর আগে নির্বাচন কমিশনারের কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বোরহান উদ্দিন বলেন, অতীতের তুলনায় ভোট খুব কম হয়নি, তবে আরও বেশি অংশগ্রহণের সুযোগ ছিল। আইনজীবীদের মধ্যে মতভেদও এতে প্রভাব ফেলেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি জানান, একটি বড় রাজনৈতিক গ্রুপের শীর্ষ নেতৃত্ব ও সক্রিয় কর্মীরা ভোটদানে অংশ না নেওয়ায় মোট ভোটের হার কমেছে। পাশাপাশি টানা বৃষ্টিপাতের কারণে প্রথম দিনে উপস্থিতি কম থাকলেও দ্বিতীয় দিনে আবহাওয়া কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ায় ভোটার উপস্থিতি বেড়েছে।
নির্বাচনের সার্বিক পরিবেশ নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে বোরহান উদ্দিন দাবি করেন, সব প্রতিকূলতার মধ্যেও নির্বাচন ছিল শান্তিপূর্ণ, অংশগ্রহণমূলক এবং নিরপেক্ষ। এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জমা পড়েনি বলেও জানান তিনি।
ন্যাশনাল ল’ইয়ার্স অ্যালায়েন্সের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেন, পরাজয়ের আশঙ্কা থেকেই একটি পক্ষ ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলছে। তার ভাষায়, ‘খেলায় হারার আগে অনেকেই মাঠের দোষ দেয়’ এমন প্রবণতাই এখানে দেখা যাচ্ছে।
তিনি অভিযোগ করেন, যারা ভোট বর্জন করেছে তারাই মূলত বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালাচ্ছে এবং ব্যালটে অপ্রাসঙ্গিক চিত্র আঁকার মতো আচরণও করেছে, যা পেশাদারিত্বের সঙ্গে যায় না।
এমডিএএ/এমএমএআর