পলাতক দুই আসামির রায় ট্রাইব্যুনালে অপেক্ষমাণ

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৪:৪৫ পিএম, ১৬ আগস্ট ২০১৮

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি মো. লিয়াকত আলীসহ দুই জনের রায় যে কোনো দিন ঘোষণা করা হবে বলে (সিএভি) অপেক্ষমাণ রেখেছেন ট্রাইব্যুনাল।

মামলায় আসামি ও রাষ্ট্র পক্ষের যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে বৃহস্পতিবার (১৬ আগস্ট) ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. শাহিনুর ইসলামের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মামলায় রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন।

ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন প্রসিকিউটর রানা দাশগুপ্ত ও রেজিয়া সুলতানা চমন এবং আসামিদের পক্ষে ছিলেন রাষ্ট্র নিয়োজিত আইনজীবী গাজী এমএইচ তামিম।

মামলার অপর আসামি হলেন কিশোরগঞ্জের আমিনুল ইসলাম।

আসামিদের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের সময় অপহরণ, নির্যাতন, লুট, হত্যা, গণহত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের সাত ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। লিয়াকত আলী একাত্তরে মুসলিম লীগের কর্মী ছিলেন। আমিনুল ইসলাম ওরফে রজব ছিলেন ছাত্র সংঘের সদস্য।

রেজিয়া সুলতানা চমন বলেন, ২০১৬ সালের ১ নভেম্বর তাদের অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে বিচার শুরু করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। আইনজীবীদের প্রারম্ভিক বক্তব্য উপস্থাপনের মাধ্যমে ওই বছরের ৪ ডিসেম্বর শুরু হয় সাক্ষ্যগ্রহণ।

লিয়াকত আলী ২০০৩ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। ২০১০ সালে সভাপতি থাকা অবস্থায় মানবতাবিরোধী অপরধের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়।

ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা ২০১৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দেয়। সেখানে বলা হয়, মুক্তিযুদ্ধের সময় পাশাপাশি তিন থানা হবিগঞ্জ জেলার লাখাই, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর ও কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামে ব্যাপক নির্যাতন চালায় আসামিরা।

২০১৬ সালের ১৮ মে সন্দেহভাজন দুই জনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল। তাদের গ্রেফতার করা সম্ভব না হওয়ায় গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়। শেষ পর্যন্ত তাদের পলাতক দেখিয়েই বিচার চালিয়ে যায় আদালত।

প্রসিকিউটর চমন বলেন, দুই বছর আগে আসামি লিয়াকত আলী ও আমিনুল ইসলামের বিচার শুরু হয়। আজ প্রসিকিউশন ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রেখেছেন। এখন যে কোনো দিন রায় ঘোষণা করবেন ট্রাইব্যুনাল।

আসামিদের বিরুদ্ধে সাত অভিযোগ

প্রথম অভিযোগ: ১৯৭১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকার সদস্যদের নিয়ে লাখাই থানার কৃষ্ণপুর গ্রামে গণহত্যা, লুটপাট। ওইদিন কৃষ্ণপুর গ্রামে নিপেন রায়ের বাড়িতে রাধিকা মোহন রায় ও সুনীল শর্মাসহ ৪৩ হিন্দুকে গুলি করে হত্যা।

দ্বিতীয় অভিযোগ: লাখাই থানার চণ্ডিপুর গ্রামে গণহত্যা ও লুটপাট।

তৃতীয় অভিযোগ: লাখাই থানার গদাইনগর গ্রামে গণহত্যা ও লুটপাট।

চতুর্থ অভিযোগ: অষ্টগ্রাম থানার সদানগর গ্রামে শ্মশানঘাটে হত্যা।

পঞ্চম অভিযোগ: নাসিরনগর থানার ফান্দাউক গ্রামের বাচ্চু মিয়াকে অপহরণ এবং রঙ্গু মিয়াকে অপহরণ ও হত্যা।

ষষ্ঠ অভিযোগ: অষ্টগ্রাম থানার সাবিয়ানগর গ্রামে চৌধুরী বাড়িতে হামলা চালিয়ে হত্যা।

সপ্তম অভিযোগ: সাবিয়ানগর গ্রামে খাঁ বাড়িতে হত্যাকাণ্ড।

তদন্ত সংস্থার তথ্য মতে, একাত্তরে লিয়াকত ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজের ছাত্র ছিলেন। মুসলিম লীগের সদস্য হিসেবে ফান্দাউক ইউনিয়নে রাজাকার বাহিনীর দায়িত্বে ছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের পর পালিয়ে ছিলেন। পরে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে লাখাই থানা কমিটির সভাপতি হন।

অন্যদিকে, কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম থানার আলীনগর গ্রামের রজব আলী ১৯৭০ সালে ভৈরব হাজী হাসমত আলী কলেজে একাদশ শ্রেণিতে পড়ার সময় ইসলামী ছাত্র সংঘের কলেজ শাখার সভাপতি হন। মুক্তিযুদ্ধের সময় ভৈরবে পাকিস্তানি সেনা ক্যাম্পে তিনি অস্ত্র প্রশিক্ষণ নেন এবং আল বদর বাহিনী গঠন করেন।

রজব যুদ্ধ চলাকালে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে আটক হয়েছিলেন। ১৯৭২ সালে বিরুদ্ধে দালাল আইনে করা মামলায় তার যাবজ্জীবন সাজা হয়। পরে দালাল আইন বাতিলের সময় ১৯৮১ সালে রজব ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পান। ‘আমি আল বদর বলছি’ নামে একটি বইও তিনি প্রকাশ করেন।

ওই বইয়ে রজবের মানবতাবিরোধী অপরাধ সংক্রান্ত অভিযোগের আত্মস্বীকৃতি রয়েছে বলে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়।

এফএইচ/এএইচ/পিআর

আপনার মতামত লিখুন :