আলোচনার বাইরে যেসব টিকা, বাড়ছে অজানা ঝুঁকি
বাংলাদেশে টিকার কথা উঠলেই কয়েকটি পরিচিত রোগের নাম ঘুরে ফিরে আসে। অথচ এর বাইরে এমন অনেক টিকা রয়েছে, যেগুলো সময়মতো নিলে মারাত্মক সংক্রামক রোগ থেকেও সুরক্ষা পাওয়া সম্ভব।
দুঃখজনক হলেও সত্য, এসব টিকার অনেকগুলোই এখনো সরকারি কর্মসূচির বাইরে কিংবা জনসচেতনতার অভাবে আড়ালেই রয়ে গেছে। ফলে অজান্তেই বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি আর প্রতিরোধযোগ্য রোগও হয়ে উঠছে নীরব হুমকি।
আলোচনার বাইরে থাকা গুরুত্বপূর্ণ টিকা
বাংলাদেশে কলেরা, ইনফ্লুয়েঞ্জা, হেপাটাইটিস এ, মেনিনজাইটিস, মাম্পস এবং জলবসন্ত এ ধরনের রোগের সংক্রমণ নিয়মিতই দেখা যায়। তবে এসব রোগের বিরুদ্ধে কার্যকর টিকা থাকা সত্ত্বেও সেগুলো এখনো জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হয়নি।

অন্যদিকে, রোটাভাইরাস, হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস, জাপানি এনসেফেলাইটিস এবং টাইফয়েড এই চারটি গুরুত্বপূর্ণ রোগের টিকা চালুর পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তব অগ্রগতি এখনো সীমিত। ফলে সাধারণ মানুষ অনেক সময় জানতেই পারেন না যে এসব টিকা বাজারে পাওয়া যায়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়মতো টিকা গ্রহণ করলে এসব রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা যেমন কমে, তেমনি আক্রান্ত হলেও জটিলতা অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
পরিকল্পনা আছে, তবে বাস্তবায়ন ধীর
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় নতুন কয়েকটি টিকা যুক্ত করার প্রক্রিয়া চলমান। এর মধ্যে রয়েছে-
- ডায়রিয়া প্রতিরোধে রোটাভাইরাস টিকা
- জরায়ুমুখ ক্যানসার প্রতিরোধে এইচপিভি টিকা
- মস্তিষ্কের প্রদাহজনিত রোগ ঠেকাতে জাপানি এনসেফেলাইটিস টিকা
- পানিবাহিত রোগ প্রতিরোধে টাইফয়েড কনজুগেট টিকা
এইচপিভি টিকা নিয়ে ২০১৬ সালে একটি পাইলট প্রকল্পে প্রায় ৩০ হাজার কিশোরীকে টিকা দেওয়া হয়েছিল। তবে সফলভাবে শেষ হলেও এটি এখনো জাতীয় পর্যায়ে বিস্তৃত হয়নি, যদিও গ্যাভি ইতোমধ্যে অনুমোদন দিয়েছে। অন্য টিকাগুলোর ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট সময়সীমা এখনো স্পষ্ট নয়। বিশেষ করে রোটাভাইরাস সংক্রমণ বাড়লেও সংশ্লিষ্ট টিকা চালুতে ধীরগতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
আরও পড়ুন:
সরবরাহ সংকট ও জনসচেতনতার অভাব
অনেক অভিভাবক সন্তানদের জন্য এসব টিকা নিতে চাইলেও বাজারে সরবরাহের ঘাটতি বা তথ্যের অভাবে তা সম্ভব হচ্ছে না। কোথায় পাওয়া যায়, কত খরচ এসব বিষয়েও স্পষ্ট ধারণা নেই অনেকের। জলাতঙ্ক প্রতিরোধে সরকারি কর্মসূচি থাকলেও বাস্তবে সব জায়গায় টিকা পাওয়া যায় না। প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক মানুষ কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত হলেও বিনামূল্যে টিকার প্রাপ্যতা নির্ভর করে সরবরাহের ওপর। ফলে অনেককে বাধ্য হয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে উচ্চমূল্যে টিকা নিতে হয়।
রোগভিত্তিক ঝুঁকি ও টিকার গুরুত্ব
- কলেরা সাধারণত নিরাপদ পানির অভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং মৌসুমি প্রাদুর্ভাবে দ্রুত বৃদ্ধি পায়। টিকা থাকলে এ রোগ নিয়ন্ত্রণ অনেক সহজ হয়।
- মেনিনজাইটিস অত্যন্ত দ্রুতগতির এবং প্রাণঘাতী একটি রোগ, যেখানে লক্ষণ দেখা দেওয়ার পর চিকিৎসার সুযোগ খুব সীমিত। শিশু ও কিশোরদের মধ্যে এর ঝুঁকি বেশি।
- ইনফ্লুয়েঞ্জা বিশেষ করে শ্বাসতন্ত্রের রোগীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। নিয়মিত টিকা গ্রহণে জটিলতা কমানো সম্ভব।
- হেপাটাইটিস এ লিভারের সংক্রমণ ঘটায়, অনেক সময় উপসর্গ ছাড়াই ছড়িয়ে পড়ে। অন্যদিকে মাম্পস ও জলবসন্ত শিশুদের মধ্যে অত্যন্ত সংক্রামক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব টিকা অন্তত ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল বা গোষ্ঠীর জন্য সরকারি ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করা হলে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা অনেক শক্তিশালী হবে।
বর্তমানে সরকারি বিনামূল্যের টিকা
বাংলাদেশে টিকাদান কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৭৯ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায়। শুরুতে ছয়টি রোগের টিকা দেওয়া হলেও এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০টিতে। বর্তমানে নবজাতক, শিশু এবং প্রজননক্ষম নারীরা এই কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। ধাপে ধাপে যুক্ত হয়েছে-
- হেপাটাইটিস বি
- পেন্টাভ্যালেন্ট (একাধিক রোগ প্রতিরোধী)
- হাম-রুবেলা টিকা
- নিউমোকক্কাল ভ্যাকসিন
টিকাদানের ফলে বাংলাদেশ পোলিওমুক্ত দেশের স্বীকৃতি পেয়েছে, যা জনস্বাস্থ্যের বড় অর্জন।
কোন টিকা কখন
- শিশুর জন্মের পরপরই বিসিজি টিকা দেওয়া হয়। এরপর ৬, ১০ ও ১৪ সপ্তাহে পোলিও, পেন্টাভ্যালেন্ট ও নিউমোকক্কাল টিকার ডোজ দেওয়া হয়।
- ৯ থেকে ১৫ মাস বয়সে হাম-রুবেলা টিকা দেওয়া হয়। অন্যদিকে ১৫-৪৯ বছর বয়সী নারীদের ধনুষ্টংকার প্রতিরোধে টিডি টিকার পাঁচ ডোজ নিতে বলা হয়।
- এছাড়া ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের ভিটামিন এ ক্যাপসুল দেওয়া হয়।
সামনে কী করা জরুরি
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল নির্দিষ্ট কিছু রোগ নয়; বরং সামগ্রিকভাবে টিকাদান ব্যবস্থাকে বিস্তৃত করা প্রয়োজন। নতুন টিকা অন্তর্ভুক্তি, পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং ব্যাপক প্রচারণার মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করাই এখন সময়ের দাবি। সঠিক সময়ে টিকা গ্রহণ শুধু ব্যক্তিগত সুরক্ষা নয়; বরং সামগ্রিক জনস্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অন্যতম কার্যকর উপায় এই বার্তাটি আরও জোরালোভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
তথ্যসূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ
জেএস/
