গরমে স্যালাইন খাওয়া কি স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী?

লাইফস্টাইল ডেস্ক
লাইফস্টাইল ডেস্ক লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৮:০৯ এএম, ০৮ এপ্রিল ২০২৬
প্রতীকী ছবি, এআই দিয়ে বানানো

গরমের সময় আমাদের শরীরের ওপর চাপ বেড়ে যায় বহুগুণে। প্রচণ্ড তাপমাত্রা, ঘাম, ক্লান্তি সব মিলিয়ে শরীর দ্রুত পানি ও প্রয়োজনীয় লবণ হারায়। এই পরিস্থিতিতে অনেকেই স্যালাইন বা ওআরএস (ওরাল রিহাইড্রেশন সলিউশন) পান করার অভ্যাস গড়ে তোলেন।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে-গরমে স্যালাইন খাওয়া কি সত্যিই উপকারী, নাকি এটি অপ্রয়োজনীয় অভ্যাস? এই বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত জানাটা জরুরি, কারণ ভুল ধারণা থেকে অনেকেই প্রতিদিন স্যালাইন খেয়ে ফেলেন, যা সব সময় উপকারের বদলে ক্ষতিও করতে পারে।

স্যালাইন কী এবং কেন ব্যবহার করা হয়?

স্যালাইন মূলত পানি, লবণ ও গ্লুকোজের একটি নির্দিষ্ট অনুপাতে তৈরি দ্রবণ, যা শরীরের পানিশূন্যতা দূর করতে ব্যবহৃত হয়। এটি বিশেষভাবে কার্যকর যখন শরীর অতিরিক্ত পানি ও ইলেক্ট্রোলাইট হারায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, ডায়রিয়া, বমি বা তীব্র পানিশূন্যতার ক্ষেত্রে ওআরএস জীবন রক্ষাকারী একটি উপায়।

গরমে শরীরে কী ঘটে?

গরমে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে ঘাম ঝরে। এই ঘামের সঙ্গে শুধু পানি নয়, সোডিয়াম, পটাশিয়ামসহ গুরুত্বপূর্ণ খনিজও বের হয়ে যায়। ফলে শরীরে দেখা দিতে পারে দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, ক্লান্তি, অতিরিক্ত তৃষ্ণা, এমনকি মারাত্মক ক্ষেত্রে পানিশূন্যতা। এই পরিস্থিতিতে সঠিকভাবে পানি ও ইলেক্ট্রোলাইট পূরণ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

গরমে স্যালাইন খাওয়া কি উপকারী?

হ্যাঁ, তবে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে। স্যালাইন খাওয়ার উপকারিতা মূলত তখনই পাওয়া যায়, যখন শরীর সত্যিই পানিশূন্যতায় ভুগছে। যেমন-

  • অতিরিক্ত ঘাম হলে: যারা রোদে কাজ করেন (যেমন-শ্রমিক, রিকশাচালক বা ক্রীড়াবিদ) তাদের শরীর থেকে প্রচুর পানি ও লবণ বের হয়ে যায়। এই অবস্থায় স্যালাইন উপকারী হতে পারে।
  • হিটস্ট্রোক বা হিট এক্সহসশন হলে: গরমে দীর্ঘ সময় থাকার ফলে শরীরের ভারসাম্য নষ্ট হলে স্যালাইন দ্রুত শক্তি ফেরাতে সাহায্য করে।
  • ডায়রিয়া বা বমি হলে: এগুলোতে শরীর দ্রুত পানিশূন্য হয়ে পড়ে। স্যালাইন তখন অত্যন্ত কার্যকর।

প্রতিদিন স্যালাইন খাওয়া কি ভালো?

না, একদমই নয়। অনেকে মনে করেন, গরম পড়লেই প্রতিদিন এক গ্লাস স্যালাইন খাওয়া ভালো। এটি একটি ভুল ধারণা।

অতিরিক্ত স্যালাইন খাওয়ার ক্ষতি

  • শরীরে অতিরিক্ত লবণ জমে যেতে পারে
  • কিডনির ওপর চাপ পড়ে
  • উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ে
  • শরীরের স্বাভাবিক ইলেক্ট্রোলাইট ভারসাম্য নষ্ট হয়

বিশেষ করে যাদের উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি সমস্যা বা হার্টের রোগ আছে, তাদের জন্য নিয়মিত স্যালাইন খাওয়া বিপজ্জনক হতে পারে।

আরও পড়ুন: 

তাহলে গরমে কী খাওয়া উচিত?

  • স্যালাইনের পরিবর্তে বা পাশাপাশি কিছু স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। পর্যাপ্ত পানি পান করা। প্রতিদিন ২.৫-৩ লিটার পানি পান করা উচিত (ব্যক্তি ও কাজের ধরন অনুযায়ী কমবেশি হতে পারে)।
  • পানি সমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা। যেমন- তরমুজ, শসা, কমলা, ডাবের পানি। ডাবের পানি প্রাকৃতিকভাবে ইলেক্ট্রোলাইট সমৃদ্ধ, যা স্যালাইনের একটি ভালো বিকল্প।
  • হালকা লবণযুক্ত খাবার। অতিরিক্ত নয়, বরং স্বাভাবিক খাবারে সামান্য লবণ শরীরের চাহিদা পূরণ করে।
  • ঘরে তৈরি শরবত। লেবু, পানি, সামান্য লবণ ও চিনি মিশিয়ে তৈরি শরবত প্রাকৃতিক স্যালাইনের মতো কাজ করতে পারে।

কখন স্যালাইন খাওয়া উচিত?

  • অতিরিক্ত দুর্বল লাগা
  • মাথা ঘোরা
  • খুব বেশি ঘাম হওয়া
  • প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া
  • মুখ শুকিয়ে যাওয়া

তবে লক্ষণ গুরুতর হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে সতর্কতা

শিশু ও বয়স্কদের শরীর দ্রুত পানিশূন্য হয়ে পড়ে। তাই শিশুদের ক্ষেত্রে ডায়রিয়া বা বমি হলে দ্রুত স্যালাইন দিন, বয়স্কদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত স্যালাইন এড়িয়ে চলুন, ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া নিয়মিত স্যালাইন না খাওয়াই ভালো।

একটি গুরুত্বপূর্ণ ভুল ধারণা

অনেকে ভাবেন, সফট ড্রিংক বা এনার্জি ড্রিংক স্যালাইনের বিকল্প। এটি সম্পূর্ণ ভুল। সফট ড্রিংকে চিনি বেশি থাকে, এতে প্রয়োজনীয় ইলেক্ট্রোলাইটের সঠিক ভারসাম্য নেই; বরং এটি ডিহাইড্রেশন আরও বাড়াতে পারে।

গরমে স্যালাইন খাওয়া উপকারী, তবে সেটি নির্ভর করে আপনার শারীরিক অবস্থার ওপর। এটি কোনো দৈনন্দিন পানীয় নয়, বরং একটি চিকিৎসামূলক দ্রবণ। অতিরিক্ত ঘাম, ডায়রিয়া বা পানিশূন্যতার ক্ষেত্রে স্যালাইন জীবন রক্ষাকারী হতে পারে। কিন্তু সুস্থ অবস্থায় প্রতিদিন স্যালাইন খাওয়ার অভ্যাস শরীরের জন্য ক্ষতিকর। তাই সচেতন থাকুন, প্রয়োজন বুঝে স্যালাইন খান আর নিয়মিত পানি ও প্রাকৃতিক খাবারের মাধ্যমে শরীরকে সুস্থ রাখুন।

তথ্যসূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ভেরি ওয়েল হেলথ

জেএস/

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।