বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবস

সচেতনতা, প্রতিরোধ ও সুস্থ জীবনের অঙ্গীকার

ডা. মো. সাঈদ হোসেন
ডা. মো. সাঈদ হোসেন ডা. মো. সাঈদ হোসেন , কনসালটেন্ট ও বিভাগীয় প্রধান, মেডিসিন
প্রকাশিত: ০৯:৪৭ এএম, ১৭ মে ২০২৬
প্রতীকী ছবি, এআই দিয়ে বানানো

প্রতি বছর ১৭ মে বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবস। এই দিবসের মূল লক্ষ্য হলো মানুষের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং এ রোগের ঝুঁকি, প্রতিরোধ ও চিকিৎসা সম্পর্কে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়া। বর্তমানে উচ্চ রক্তচাপ পৃথিবীর অন্যতম বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ এই রোগ অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই মানুষের শরীরে ধীরে ধীরে ক্ষতি করতে থাকে এবং একসময় হৃদরোগ, স্ট্রোক, কিডনি বিকল, অন্ধত্ব কিংবা মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে কোটি কোটি মানুষ উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত। উদ্বেগের বিষয় হলো-অনেকেই জানেন না যে তারা এই রোগে আক্রান্ত। আবার অনেকে জেনেও নিয়মিত চিকিৎসা গ্রহণ করেন না। ফলে দিন দিন বাড়ছে হৃদরোগ ও স্ট্রোকের মতো জটিল রোগের ঝুঁকি। বাংলাদেশেও উচ্চ রক্তচাপ এখন একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। শহর থেকে গ্রাম, ধনী থেকে দরিদ্র, সব শ্রেণির মানুষের মধ্যেই এই রোগ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

২০২৬ সালের বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবসের প্রতিপাদ্য হলো, ‘একসাথে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করি: নিয়মিত রক্তচাপ মাপুন, নীরব ঘাতককে পরাজিত করুন!’ -এই প্রতিপাদ্য আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, সচেতনতা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে উচ্চ রক্তচাপের মতো নীরব ঘাতককে নিয়ন্ত্রণ করতে।

উচ্চ রক্তচাপ কী?

মানুষের শরীরে হৃদপিণ্ড রক্ত পাম্প করে ধমনীর মাধ্যমে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে পৌঁছে দেয়। এই প্রবাহের সময় ধমনীর দেয়ালে যে চাপ সৃষ্টি হয়, তাকে রক্তচাপ বলা হয়। রক্তচাপ সাধারণত দুটি সংখ্যায় প্রকাশ করা হয়-সিস্টোলিক ও ডায়াস্টোলিক চাপ। উদাহরণস্বরূপ-১২০/৮০ মিলিমিটার পারদ। প্রথম সংখ্যা হলো হৃদপিণ্ড সংকুচিত হওয়ার সময়ের চাপ এবং দ্বিতীয় সংখ্যা হলো হৃদপিণ্ড শিথিল হওয়ার সময়ের চাপ।

যখন এই চাপ দীর্ঘদিন ধরে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকে, তখন তাকে উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন বলা হয়। সাধারণত ১৪০/৯০ মিলিমিটার পারদ বা তার বেশি রক্তচাপকে উচ্চ রক্তচাপ হিসেবে ধরা হয়। যদিও বর্তমান চিকিৎসা নির্দেশিকায় ১৩০/৮০ মিলিমিটার পারদ-এর বেশি রক্তচাপকেও ঝুঁকিপূর্ণ ধরা হয়।

কেন উচ্চ রক্তচাপকে ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়?

উচ্চ রক্তচাপের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো এটি অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই শরীরের ভেতরে ক্ষতি করতে থাকে। একজন ব্যক্তি হয়তো স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন, কিন্তু তার অজান্তেই রক্তচাপ ধীরে ধীরে হৃদপিণ্ড, মস্তিষ্ক, কিডনি ও রক্তনালিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রথম লক্ষণ হিসেবে দেখা দেয় হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক, যা জীবননাশের কারণ হতে পারে। এই কারণেই উচ্চ রক্তচাপকে ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়। নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা ছাড়া অনেক সময় এই রোগ শনাক্ত করা সম্ভব হয় না।

উচ্চ রক্তচাপের কারণ

উচ্চ রক্তচাপের পেছনে বিভিন্ন কারণ রয়েছে। কিছু কারণ পরিবর্তনযোগ্য, আবার কিছু কারণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। যেমন-

  • অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ: খাবারে অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ রক্তচাপ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ। বর্তমানে ফাস্টফুড, চিপস, আচার, প্রক্রিয়াজাত খাবার ও কোমল পানীয়ের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় মানুষ অজান্তেই অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ করছে।
  • স্থূলতা ও অতিরিক্ত ওজন: শরীরে অতিরিক্ত চর্বি জমলে হৃদপিণ্ডকে বেশি পরিশ্রম করতে হয়, ফলে রক্তচাপ বেড়ে যায়।
  • শারীরিক পরিশ্রমের অভাব: বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে মানুষের শারীরিক কার্যক্রম কমে গেছে। হাঁটাচলা ও ব্যায়ামের অভাবে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ছে।
  • ধূমপান ও মাদকাসক্তি: ধূমপান রক্তনালিকে সংকুচিত করে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। অ্যালকোহল ও মাদকও রক্তচাপ বৃদ্ধির কারণ।
  • মানসিক চাপ: অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ, হতাশা ও কর্মব্যস্ততা রক্তচাপ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে।
  • বংশগত কারণ: পরিবারে কারও উচ্চ রক্তচাপ থাকলে অন্য সদস্যদের মধ্যেও এ রোগ হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।
  • ডায়াবেটিস ও কিডনি রোগ: ডায়াবেটিস ও কিডনি রোগ উচ্চ রক্তচাপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।
  • বয়স বৃদ্ধি: বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রক্তনালির স্থিতিস্থাপকতা কমে যায়, ফলে রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে।

উচ্চ রক্তচাপের লক্ষণ

উচ্চ রক্তচাপ অনেক সময় লক্ষণবিহীন হলেও কিছু ক্ষেত্রে নিচের উপসর্গ দেখা দিতে পারে। যেমন- মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা, বুক ধড়ফড় করা, শ্বাসকষ্ট, ঝাপসা দেখা, অতিরিক্ত ক্লান্তি, নাক দিয়ে রক্ত পড়া, ঘুমের সমস্যা। তবে এসব লক্ষণ না থাকলেও একজন ব্যক্তি উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হতে পারেন। তাই নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করা জরুরি।

উচ্চ রক্তচাপের জটিলতা

উচ্চ রক্তচাপ দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণে না থাকলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। যেমন-

  • হৃদরোগ ও হার্ট অ্যাটাক: অতিরিক্ত রক্তচাপ হৃদপিণ্ডের উপর চাপ সৃষ্টি করে। ফলে হার্ট অ্যাটাক ও হৃদযন্ত্র বিকলের ঝুঁকি বাড়ে।
  • স্ট্রোক: উচ্চ রক্তচাপ মস্তিষ্কের রক্তনালি ফেটে যাওয়া বা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণ হতে পারে, যা স্ট্রোক সৃষ্টি করে।
  • কিডনি বিকল: কিডনির সূক্ষ্ম রক্তনালিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলে কিডনি অকার্যকর হয়ে যেতে পারে।
  • চোখের ক্ষতি: চোখের রক্তনালিতে ক্ষতি হলে দৃষ্টিশক্তি কমে যেতে পারে কিংবা অন্ধত্ব হতে পারে।
  • স্মৃতিশক্তি হ্রাস: দীর্ঘদিন উচ্চ রক্তচাপ থাকলে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা কমে যেতে পারে।

বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপের পরিস্থিতি

বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপের রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। শহরাঞ্চলে ফাস্টফুড, অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন ও মানসিক চাপের কারণে তরুণদের মধ্যেও হাইপারটেনশন বৃদ্ধি পাচ্ছে। গ্রামাঞ্চলেও এখন এই রোগ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে অনেক মানুষ জানেনই না যে তারা উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত। আবার যারা জানেন, তাদের অনেকেই নিয়মিত ওষুধ খান না বা চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলেন না। ফলে জটিলতা বেড়ে যায়।

আরও পড়ুন: 

বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবসের গুরুত্ব

বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবস মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই দিবসে বিভিন্ন হাসপাতাল, স্বাস্থ্য সংস্থা, মেডিকেল কলেজ ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান নানা কর্মসূচি পালন করে থাকে। যেমন- ফ্রি রক্তচাপ পরীক্ষা, সচেতনতামূলক সেমিনার, র‌্যালি ও আলোচনা সভা, স্বাস্থ্য শিক্ষা কার্যক্রম, গণমাধ্যমে প্রচারণা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্যাম্পেইন- এসব কার্যক্রম মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়াতে সাহায্য করে।

উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধের উপায়

  • নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা
  • লবণ কম খাওয়া
  • স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস
  • নিয়মিত ব্যায়াম
  • ধূমপান পরিহার
  • ওজন নিয়ন্ত্রণ
  • মানসিক চাপ কমানো
  • পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা

চিকিৎসায় সচেতনতার গুরুত্ব

উচ্চ রক্তচাপ ধরা পড়লে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ওষুধ সেবন করতে হবে। অনেকেই কিছুদিন ওষুধ খেয়ে রক্তচাপ স্বাভাবিক হলে ওষুধ বন্ধ করে দেন, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কখনো ওষুধ বন্ধ করা উচিত নয়।

তরুণদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ

একসময় ধারণা করা হতো উচ্চ রক্তচাপ শুধু বয়স্কদের রোগ। কিন্তু বর্তমানে তরুণদের মধ্যেও এই রোগ দ্রুত বাড়ছে। রাত জাগা, জাঙ্কফুড, মানসিক চাপ, অনলাইন নির্ভর জীবনযাপন ও শারীরিক পরিশ্রমের অভাব এর প্রধান কারণ। তাই ছোটবেলা থেকেই স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।

পরিবার ও সমাজের ভূমিকা

পরিবার থেকেই স্বাস্থ্য সচেতনতা শুরু হওয়া উচিত। পরিবারের সদস্যদের স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া, নিয়মিত হাঁটা ও রক্তচাপ পরীক্ষা করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। সমাজের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, স্কুল, কলেজ ও কর্মক্ষেত্রেও সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করা উচিত।

গণমাধ্যমের ভূমিকা

টেলিভিশন, রেডিও, পত্রিকা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম উচ্চ রক্তচাপ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। নিয়মিত স্বাস্থ্যবিষয়ক অনুষ্ঠান ও প্রচারণা মানুষের মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম।

চিকিৎসকদের ভূমিকা

চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তারা রোগীদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ওষুধ সেবন ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনে উৎসাহিত করেন।

বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবসের অঙ্গীকার

বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবস আমাদের শুধু একটি দিবসের কথা মনে করিয়ে দেয় না; বরং এটি আমাদের সুস্থ জীবনের জন্য দায়িত্বশীল হতে শেখায়। সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা গ্রহণের মাধ্যমে আমরা উচ্চ রক্তচাপকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারি।

জেএস/

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।