কিডনি সুরক্ষায় এখনই দরকার সমন্বিত উদ্যোগ

লাইফস্টাইল ডেস্ক
লাইফস্টাইল ডেস্ক লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশিত: ১২:৩৪ পিএম, ১২ মার্চ ২০২৬
ছবি: ডা. মো. সাঈদ হোসেন

প্রতি বছর মার্চ মাসের দ্বিতীয় বৃহস্পতিবার বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব কিডনি দিবস। ২০০৬ সাল থেকে এই দিবসটি পালিত হয়ে আসছে, যার মূল লক্ষ্য মানুষের মধ্যে কিডনি রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং কিডনি সুস্থ রাখার গুরুত্ব তুলে ধরা। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য বিষয় ‘সুস্থ কিডনি সকলের তরে, কিডনি যত্নে বাঁচাও ধরণীরে’ যা কেবল ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যের নয়, পরিবেশ ও জলবায়ুর সঙ্গেও কিডনির সম্পর্ককে স্মরণ করিয়ে দেয় ।

কেন বিশ্ব কিডনি দিবস পালন করা হয়?

কিডনি মানবদেহের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। এটি রক্ত পরিশোধন, শরীরের পানি ও লবণের ভারসাম্য রক্ষা, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ এবং বিভিন্ন হরমোন উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু দুঃখ-জনকভাবে কিডনি রোগ অনেক সময় নীরবে (৭০% ক্ষেত্রে) অগ্রসর হয় এবং প্রাথমিক পর্যায়ে তেমন কোনো উপসর্গ দেখা যায় না। বিশ্বব্যাপী লক্ষ লক্ষ মানুষ দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে (ক্রনিক কিডনি ডিজিস) আক্রান্ত হলেও তাদের অনেকেই তা জানেন না। তাই কিডনি রোগের প্রাথমিক শনাক্তকরণ, প্রতিরোধ ও সচেতনতা বৃদ্ধির জন্যই বিশ্ব কিডনি দিবস পালন করা হয় ।

বিশ্বব্যাপী কিডনি রোগের চিত্র

বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ৮৫ কোটিরও বেশি মানুষ কোনো না কোনো ধরনের কিডনি রোগে আক্রান্ত বলে ধারণা করা হয়। দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ এখন বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হয়েছে। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা এবং অনিয়ন্ত্রিত ওষুধ ব্যবহারের কারণে এই রোগ দ্রুত বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে ২০৪০ সালের মধ্যে কিডনি রোগ বিশ্বে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে উঠতে পারে ।

কিডনি সুস্থ রাখার উপায়

  • নিয়মিত পর্যাপ্ত পানি পান করা
  • ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা
  • অতিরিক্ত লবণ ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খাওয়া
  • নিয়মিত ব্যায়াম করা এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা
  • ধূমপান ও অতিরিক্ত মদ্যপান পরিহার করা
  • চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ব্যথানাশক বা অন্য ওষুধ দীর্ঘদিন ব্যবহার না করা
  • ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের (৬০ বছরের বেশী বয়সী, স্থূলকায় রোগী, ডায়াবেটিস বা উচ্চ চাপের রোগী, হার্টের রোগী, যাদের পারিবারিক কিডনি রোগ আছে, কম ওজনের বাচ্চা) নিয়মিত রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষা করা ।

জলবায়ু পরিবর্তন ও কিডনির উপর প্রভাব

জলবায়ু পরিবর্তন এখন শুধু পরিবেশের সমস্যা নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের জন্যও বড় হুমকি। অতিরিক্ত তাপমাত্রা, পানির স্বল্পতা এবং দূষণ কিডনির উপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে গরম আবহাওয়ায় দীর্ঘ সময় কাজ করা শ্রমিকদের মধ্যে ডিহাইড্রেশন ও হিট স্ট্রেস থেকে কিডনি ক্ষতির ঝুঁকি বাড়ে। দূষিত পানি ও পরিবেশগত বিষাক্ত পদার্থও কিডনি রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। করে। ত তাই পরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ু সচেতনতা কিডনি সুরক্ষার সঙ্গেও সরাসরি সরাসরি সম্পর্কিত।

বাংলাদেশে কিডনি রোগের বাস্তবতা

বাংলাদেশে কিডনি রোগ দ্রুত বাড়ছে। ধারণা করা হয় দেশে প্রায় দুই কোটির বেশি মানুষ কোনো না কোনো পর্যায়ের কিডনি রোগে আক্রান্ত। ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের বিস্তার, দেরিতে রোগ শনাক্ত হওয়া এবং স্বাস্থ্যসেবা সীমিত হওয়ার কারণে সমস্যাটি আরও জটিল হয়ে উঠছে। দেশে ডায়ালাইসিস ও কিডনি প্রতিস্থাপন সুবিধা তুলনামূলকভাবে সীমিত এবং ব্যয়বহুল হওয়ায় অধিকাংশ রোগীর পক্ষে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

আরও পড়ুন: 

কিডনি চিকিৎসায় বিদ্যমান বাধা

বাংলাদেশসহ অনেক উন্নয়নশীল দেশে কিডনি চিকিৎসায় বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম কিডনি রোগ সম্পর্কে সচেতনতার অভাব। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয়ের সীমাবদ্ধতা। অথচ আমরা যদি প্রতি বৎসর একবার রক্তচাপ/ডায়াবেটিস, প্রস্রাব পরীক্ষা করি তাহলেই প্রাথমিক অবস্থায় কিডনি রোগ ধরা পড়বে।

ডায়ালাইসিস ও প্রতিস্থাপনের উচ্চ ব্যয়: একবার ডায়ালাইসিসে ৪০০ (সরকারি) থেকে ৫০০০ টাকা লাগে, যার ৭৩ শতাংশ রোগীর পকেট থেকে যায়। উন্নত বিশ্বের মতো আমাদের দেশে হেলথ ইনস্যুরেন্স নেই। প্রতিস্থাপন সুবিধা শুধু ঢাকায় আছে।

পর্যাপ্ত নেফ্রোলজিস্ট ও বিশেষায়িত কেন্দ্রের স্বল্পতা: বাংলাদেশে মাত্র ৪০০ জন কিডনি বিশেষজ্ঞ আছেন যারা ২ কোটি কিডনি রোগীর সেবা দান করছেন। ১২০০ মত ডায়ালাইসিস মেশিন আছে যা দ্বারা বৎসরে মাত্র ১০-১৫ হাজার রোগীর ডায়ালাইসিস দেওয়া সম্ভব। অথচ প্রতি বৎসর ২৫-৪৫ হাজার নতুন ডায়ালাইসিস- প্রয়োজন রোগীর সৃষ্টি হচ্ছে, তাই প্রায় ৮০ শতাংশ রোগী চিকিৎসার বাইরে থাকছে।

গ্রামীণ অঞ্চলে চিকিৎসা সুবিধার অপ্রতুলতা: যেমন ধরা যাক চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চলে কোন ডায়ালাইসিস সুবিধা নেই।

কিডনি রোগ অনেকাংশেই প্রতিরোধযোগ্য এবং প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে এর অগ্রগতি ধীর করা সম্ভব। তাই ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র-সবাইকে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। বিশ্ব কিডনি দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে কিডনি সুস্থ রাখা শুধু ব্যক্তিগত দায়িত্ব নয়, এটি একটি সামাজিক ও বৈশ্বিক অঙ্গীকার। সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের মাধ্যমে আমরা কিডনি রোগের বোঝা অনেকটাই কমাতে পারি। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টাই বাস্তবায়িত হতে পারে এবারের প্রতিপাদ্যের মূল বার্তা ‘সুস্থ কিডনি সকলের তরে, কিডনি যত্নে বাঁচাও ধরণীরে।’

লেখক
ডা. মো. সাঈদ হোসেন
কনসালটেন্ট ও বিভাগীয় প্রধান
মেডিসিন বিভাগ
২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল, মুন্সীগঞ্জ

এসইউজে/জেএস/

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।