উম্মে মাহবুবা ইমার গল্প: জীবনের লক্ষ্যের খোঁজে

সাহিত্য ডেস্ক
সাহিত্য ডেস্ক সাহিত্য ডেস্ক
প্রকাশিত: ১২:৩৩ পিএম, ০৭ এপ্রিল ২০২৬
ফাইল ছবি

মেহরাজ সুদর্শন আর মেধাবী ছেলে। একটু অন্যরকম। চোখে সব সময় চঞ্চলতা খেলা করে। যেন পৃথিবীর সব রহস্য এক নিমেষে জেনে ফেলেছে। অথচ কাউকে কিছু বলছে না। তার শেখার ভঙ্গিটা অদ্ভুত। যে কোনো কঠিন কাজ একবার দেখিয়ে দিলেই হলো। দ্বিতীয়বার আর বলতে হয় না। তার এই অসাধারণতা ও তীক্ষ্ণতার জন্য ভবিষ্যৎ নিয়ে বাড়িতে রীতিমতো কুরুক্ষেত্র লেগেই থাকে।

মেহরাজদের পরিবারটি বেশ বড়। সবাই খুব কাছাকাছি থাকে। মেহরাজের বাবা-মায়ের বাসা আর নানার বাসা একই ভবনের চারতলা আর তিনতলায়। নীলা আক্তারের চাকরির সুবিধার কথা চিন্তা করেই দুইতলাজুড়ে তাদের যৌথ পরিবারের বসবাস। একই ছাদের নিচে এতগুলো মানুষের আদর আর শাসনের মাঝেই মেহরাজ বেড়ে উঠছে। তাই তাকে নিয়ে সবার প্রত্যাশা আকাশচুম্বী।

মেহরাজের বাবা জহির সাহেব হিসেবি মানুষ। তিনি ঠিক করে রেখেছেন তার ছেলে বড় হয়ে ইঞ্জিনিয়ার হবে। হাতে ম্যাপ নিয়ে সব বড় বড় প্রজেক্ট সামলাবে। তার মা নীলা আক্তার স্বপ্নবিলাসী মানুষ। তিনি একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়ান। তার ইচ্ছা ছেলে হবে হাইকোর্টের সবচেয়ে মেধাবী আর সুদর্শন জজ। কালো গাউন পরে এজলাসে বসে গম্ভীর গলায় রায় দেবে।

অন্যদিকে মেহরাজের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় মামার হিসাবটা একদম পরিষ্কার। তিনি চান, মেহরাজ বড় হয়ে বিদেশে যাবে। তুখোড় এক গবেষক হবে। বিদেশের নামকরা কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়ে জ্ঞান বিতরণ করবে। মেহরাজ মনে মনে সবার কথা শোনে কিন্তু কিছু বলে না। মাঝে মাঝে খুব মন খারাপ হয়, বড় হয়ে কী হতে চায়? সেটা এখনো ঠিকভাবে বুঝতে পারছে না। সবাই বলে, ‘তুমি এটা হও, তুমি ওটা হও।’ কিন্তু মেহরাজ এখনো নিজের উত্তর খুঁজে পাচ্ছে না।

একদিন খুব মন খারাপ করে ছোট খালার ঘরে গেল। ছোট খালা তাকে জিজ্ঞেস করলো, ‘কী হয়েছে মেহেরাজ? তোর মন খারাপ কেন?’
মেহরাজ ধীরে বললো, ‘আমার জীবনে কী হওয়া উচিত। তা ভেতরে ভেতরে আমাকে বিভ্রান্ত করে দিচ্ছে।’

মেহরাজের একমাত্র আশ্রয় তার ছোট খালা, নিশাত। নিশাত খালার ঘরভর্তি বই। তিনি মাঝে মধ্যেই মেহরাজকে নিয়ে বারান্দায় বসেন। বিভিন্ন গল্পের বই পড়ে শোনান। সেদিন বিকেলে ছোট খালা তাকে একটা গল্প বলেন। গল্পটির নাম ‘এক চা-পাতার গল্প’।

চা-পাতা ভাবলো, সারাজীবন তো বাগানের রোদে আর বৃষ্টিতে অন্যের নির্দেশে বড় হলাম। এবার নিজের জীবনের শেষ সিদ্ধান্তটা নিজেই নেবো। সে ঠিক করল, এমন কিছু হবে; যা তাকে পূর্ণতা দেবে। যেই ভাবা সেই কাজ। চা-পাতা বেরিয়ে পড়লো অজানার উদ্দেশ্যে।

পথে যেতে যেতে অনেকের সাথে দেখা হলো। সবাই তাকে অনেক বুদ্ধি দিলো। একজন বললো, ‘তুমি বরং দামি কোনো রেস্তোরাঁয় গিয়ে আইস-টি হয়ে যাও। সুন্দর কাচের গ্লাসে বরফ আর পুদিনা পাতার সাথে তোমাকে দেখতে রাজকীয় লাগবে! লোকে চড়া দামে তোমাকে কিনবে।’
আরেকজন বাধা দিয়ে বললো, ‘না, না, তোমার উচিত গ্রিন-টি হওয়া। স্বাস্থ্য সচেতন মানুষের কাছে তোমার কদর হবে অনেক। সবাই তোমাকে সমীহ করবে।’

কেউ পরামর্শ দিলো, এলাচ-দারুচিনি দিয়ে মসলা চা হতে। কেউ আবার বললো ভিনদেশি দামি ‘আর্ল গ্রে’ বা ‘উলোং’ হতে। যখন সে জানালো এত চাকচিক্য তার পছন্দ নয়; তখন একজন পাশ থেকে ফিসফিস করে বললো, ‘তাহলে তুমি বাবল-টি হয়ে যাও। বেশ আধুনিক আর রঙিন জীবন হবে তোমার।’

চা-পাতা দেখলো, যেখানেই সে যাচ্ছে; সবাই তাকে অন্য কিছুর সাথে মিশিয়ে তার রূপ বদলে দিতে চাইছে। কেউ তাকে দুধ-চিনির সাগরে ডোবাতে চায়, কেউ আবার ফল বা মসলার আড়ালে তার আসল স্বাদকে ঢেকে দিতে চায়। এভাবে তো নিজের অস্তিত্বই হারিয়ে যাবে।

ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত চা-পাতা একদিন এক স্টেশনের কোণে গিয়ে বসলো। সেখানে দেখলো, হাড়কাঁপানো শীতে বৃদ্ধ কুলি বসে কাঁপছে। লোকটার সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে চোখেমুখে রাজ্যের ক্লান্তি। ঠিক তখনই এক লোক পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। বৃদ্ধ কুলি কাতর স্বরে তাকে ডাকলো, ‘বাবা, এককাপ লিকার চা হবে? শরীরটা বড় ম্যাজম্যাজ করছে, একটু কড়া লাল চা হলে চনমনে লাগতো।’
সাথে সাথেই তার মাথার ভেতরে দপ করে আলো জ্বলে উঠলো। সে ঠিক করে ফেলেছে, সে কী হতে চায়।

সে বুঝলো, দামি কাচের গ্লাস বা এলাচ-কেসরের সুগন্ধে তার পরিচয় নেই। সে হতে চায় সেই কড়া লিকারের লাল চা। যেখানে কোনো দুধ-চিনি বা কৃত্রিম সুগন্ধির আড়ালে নিজেকে লুকাতে হবে না। সে স্রেফ গরম জলে নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে নিজের রং আর ঘ্রাণে উজ্জ্বল হয়ে উঠবে।

যতই লোকে তাকে আইস-টি বা বাবল-টি হতে বলুক, সেগুলোতে তার নাম বদলে যায়। কিন্তু এই এককাপ কড়া লাল চায়ে সে শুধুই ‘চা’। সে চায় ওই ক্লান্ত মানুষটির আরাম হতে।

নিশাত খালা গল্প শেষ করে মেহরাজের দিকে তাকিয়ে রহস্যময় হাসলো। বললো, ‘বুঝেছিস কিছু মেহরাজ? জীবনে বড় হওয়া মানে শুধু অর্থ বা পদবি পাওয়া নয়; বরং নিজের ব্যক্তিত্ব না হারিয়ে মানুষের সত্যিকারের প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ানোই জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন।’

দিন কয়েক পরের কথা। স্কুল থেকে ফেরার পথে মেহরাজ দেখলো অদ্ভুত করুণ দৃশ্য। রাস্তার ধারের জরাজীর্ণ কুঁড়েঘরের সামনে মা তার কোলের শিশুকে নিয়ে আর্তনাদ করছে। শিশুটির শরীর জ্বরে কাঠ হয়ে গেছে, চোখ দুটো উল্টে আসছে। কিন্তু আশপাশে কোনো ডাক্তার নেই। শহর থেকে কোনো দামি ডাক্তার এই কাদা-জলের গ্রামে আসতে চায় না। গ্রামের মানুষের পকেটে সেই জোর নেই যে, তারা শহরে গিয়ে বড় কোনো ডাক্তার দেখাবে।

মেহরাজের বুকের ভেতরটা হুট করে কেমন যেন হু হু করে উঠলো। নিশাত খালার বলা চা-পাতার সেই গল্পটা তার মাথার ভেতর তপ্ত লিকারের মতো টগবগ করে ফুটতে লাগলো।

সেদিন বিকেলে বাড়ি ফিরে মেহরাজ খুব নিচু গলায় বাবাকে বললো, ‘বাবা, আমি ইঞ্জিনিয়ার হবো না।’
জহির সাহেব চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে বললো, ‘তাহলে কি জজ হবি? তোর মায়ের কথায় সায় দিলি?’
মেহরাজ মাথা নেড়ে বললো, ‘না, আমি জজও হবো না। আমি হতে চাই ডাক্তার। যে ডাক্তারকে খুঁজে পেতে গ্রামের মানুষকে শহরের পিচঢালা পথে ঘুরতে হবে না। আমি চাই একজন ‘মানুষের ডাক্তার’ হতে, যে শুধু মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েই সুখী হবে।’

নীলা আক্তার আর জহির সাহেব একে অপরের দিকে তাকালেন। বাড়ির ভেতরটা হঠাৎ নিঝুম হয়ে গেল। মেহরাজ এককাপ চা হাতে নিয়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো। বাইরে তখন অঝোর বৃষ্টি। সেই বৃষ্টির শব্দে সে যেন নিজের ভেতরটা আরও পরিষ্কার শুনতে পেলো।

সে বুঝে গেছে, জীবনে নিজের অর্জনটাই শেষ কথা নয়; বরং তার উপস্থিতিতে অন্যের জীবনে কতটা শূন্যতা কমলো বা কতটা পূর্ণতা এলো সেটাই বিবেচ্য।

এসইউ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।