কলোনিয়াল ভালোবাসা

সাহিত্য ডেস্ক সাহিত্য ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৩:০৮ পিএম, ৩১ আগস্ট ২০২১

খান মুহাম্মদ রুমেল

অনেক অনেক বছর পর নিউমার্কেটের কাছে হঠাৎ দেখা সাইফুলের সঙ্গে। সন্ধ্যা হয় হয় সময়ে নিউমার্কেট ওভারব্রিজের নিচের দাঁড়িয়ে রিকশা খুঁজছি। সন্ধ্যার এই সময়টাতে সবার খুব তাড়া থাকে। রিকশা পাওয়া একেবারেই মুশকিল। কিন্তু আজ রাস্তা অনেকটাই ফাঁকা। তবে কোনো রিকশাই সেগুনবাগিচার দিকে যেতে চাইছে না। হুশ হুশ করে আমার সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছে একটার পর একটা ফাঁকা রিকশা। প্রায় চেঁচিয়ে ডেকেও সাড়া মিলছে না কারো কাছ থেকে। এমন সময় দেখি সাইফুল! প্রথমে চিনতেই পরিনি। কিন্তু ও আমাকে ঠিকই চিনেছে। এরপর কতো গল্প। দুজনের বাবার চাকরির সুবাদে আমরা একই কলোনিতে থাকতাম—পাশাপাশি বিল্ডিংয়ে। সাইফুলের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর অনেক কথা হয়—পুরোনো দিনের। ফেলে আসা সময়ের। রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়েই অনেকক্ষণ গল্প হয় আমাদের। এক সময় কাজের তাড়া আছে বলে যেতে চায় সাইফুল। আমিও আর আটকাই না। অনেক দিন পর ফেলে আসা দিনের একজনের সঙ্গে কথা হয়ে ভালো লাগে আমার! কিন্তু সাইফুল চলে যাওয়ার পর খেয়াল হয়, এতো কথা বললাম দুজন অথচ ফোন নম্বরটাই নেওয়া হলো না তার! সাইফুলের সঙ্গে কথা শেষ করে বাসায় ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হয়ে যায় অনেকটা। বাসার নিচে এসে রিকশা থেকে নামার সময় দেখি বৃষ্টি পড়ছে দুয়েক ফোটা। তড়িঘড়ি বাসায় ঢুকে গোসল সেরে বারান্দায় দাঁড়াতেই দেখি বৃষ্টি নেমেছে ঝুম। বেতের মোড়াটায় বসি আলগোছে। বনি এসে এক কাপ চা হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে, ‘ভাত দিতে দেরি হবে। চুলায় গ্যাস ছিল না সকাল থেকে। মাত্র রান্না চড়িয়েছি।’ বলেই চলে যায় হন্তদন্ত হয়ে। ভাত পুড়ছে চুলায়! বসে বসে বৃষ্টি দেখি আমি। মনে পড়ে সন্ধ্যায় সাইফুলের সঙ্গে দেখা হওয়ার কথা। মনে পড়ে কলোনির সেই সব দিনের কথা।

আমাদের কলোনিতে বৃষ্টি নামতো ফিনফিনে জোছনার মতো। বৃষ্টিজলে গাছের পাতাগুলো কাঁপতো তিরতির। গাঢ় সবুজ রঙের পাতাগুলো থেকে যেন পিছলে পিছলে পড়তো তেল। কত সন্ধ্যারাতে বৃষ্টিতে ভিজে ঘরে ফেরার পথে দেখেছি সাবিহা আপা দাঁড়িয়ে আছেন বারান্দায়, বিষণ্ন—আকাশের দিকে চোখ তুলে। মাথার উপর জ্বলছে ষাট পাওয়ারের একটি হলুদ আলোর বাল্ব। খুব মুডি ছিলেন সাবিহা আপা। পাত্তা দিতেন না কলোনির কাউকে। আপার চলনে বলনে মনে হতো ভুল করে জন্মেছেন এই কলোনিতে। তার থাকার কথা ছিল কোনো রাজপ্রাসাদে। তার বদলে তাকে নির্বাসন দেওয়া হয়েছে মোকাব্বের কাকার আড়াই কামরার বাসায়। আপা কি বৃষ্টি ভালোবাসতেন? আজ এত বছর পর জিজ্ঞেস করার উপায় নেই। কারণ তেইশ বছর আগের এক শীতের সকালে আমরা কলোনি ছেড়েছি বেদনাভরা চোখে। তারও বছর চারেক আগে চলে গেছেন সাবিহা আপারা। মোকাব্বের কাকার চাকরির মেয়াদ শেষের সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়ে হয়ে গেছে ষাট পাওয়ারের বাল্বের হলুদ আলো মেখে সাবিহা আপার বৃষ্টি দেখার মেয়াদও। এখন হয়তো সাবিহা আপা বৃষ্টি দেখেন অন্য কোনো বারান্দায় দাঁড়িয়ে। আচ্ছা, আপার চোখ দুটো এখনো কি বিষণ্ন থাকে আগের মতোই? জানতে ইচ্ছা করে খুব। সাবিহা আপার ভাই সাইফুল আর আমি পড়তাম একই ক্লাসে। দু’জন দুই স্কুলে। পরে দুই কলেজে। অথচ আমরা ছিলাম সতীর্থ। আর ছিল তিথি। আমাদের সমবয়সী। তিথি তিনবার এসএসসি ফেল করে পড়াশোনায় আমাদের ছোট হয়ে যায়। সেই সঙ্গে বয়সেও যেন। এমনিতে আমাদের সঙ্গে আগের মতোই বন্ধুত্ব ছিল। কিন্তু তিনবার ফেল করার পর চতুর্থবারে পাস করে নতুন কলেজে যারা তার নতুন বন্ধু হয়, তারা সামনে থাকলেই তিথি আমাদের ছোট হয়ে যেত। তৈলাক্ত বাঁশ বেয়ে বানরের উপরে ওঠা, নিচে নামার মতোই কলোনির পাস-ফেল পরিবেশে আমি একবারে পাস করেছিলাম বলেই ভালো ছাত্র হিসেবে কিঞ্চিৎ সুনাম ছিল আমার! অথচ আমি ছিলাম একেবারেই গাধা ছাত্র।

কলোনিতে সবার মধ্যমণি ছিলেন তপু ভাই। বুয়েটে পড়তেন বলেই সবার সমীহ ছিল তার প্রতি। আমার সঙ্গে কখনো খুব বেশি কথা হতো না। হয়তো আসতে-যেতে দেখা হলে টুকটাক কথা হতো। তবে তিথির সঙ্গে খুব খাতির ছিল তপু ভাইয়ের। তিথির কাছেই তপু ভাইয়ের বুয়েটের গল্প শুনতাম আমি। আর মনে মনে ভাবতাম, একদিন আমিও পড়বো বুয়েটে। সাইফুলের ছিল সবার সঙ্গে ভাব। রাইসুল কাকার মেয়ে সাথী ও বীথি—আমাদের তিন-চার বছরের ছোট। তাদের সঙ্গে যেমন খাতির আবার তিথির সঙ্গেও একই রকম খাতির। বুয়েটপড়ুয়া তপু ভাই, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া রবিন ভাই কিংবা দুইবার ইন্টারমিডিয়েটে ডাব্বা মারা হাবুল ভাইয়ের সঙ্গেও একই রকম খাতির সাইফুলের। শুধু শীতের দিনের বিকেলগুলোয় ব্যাডমিন্টন খেলার মাঠে কিছুটা কদর ছিল আমার। কারণ ব্যাডমিন্টনটা খুব ভালো খেলতাম আমি। কলোনিতে থাকার সময় প্রতিদিনই কতো গল্প জমতো আমাদের জীবনে। রাইসুল কাকার বাসায় প্রায়ই ঝগড়া হতো চাচির সঙ্গে। সেসব খবর আমি পেতাম তিথির কাছে। ঝগড়ার দিনগুলোয় খুব গুটিয়ে থাকতো, খুব মনমরা হয়ে থাকতো সাথী-বীথি। আবার দুয়েকদিন পরই সব ঠিকঠাক। হঠাৎ বলা নেই, কওয়া নেই—একদিন শুনতে পাই সাইফুল তিথিকে ভালোবাসে। তাদের মধ্যে না কি গভীর প্রেম। সেদিনের সেই বিকেলে তিথিদের চারতলার বারান্দায় ঝুলতে থাকা একটি মাটির ঘণ্টা দেখিয়ে সাইফুল আমাকে বলে, এটি গত পরশু তিথিকে গিফট করেছে সে। পরশু তারা ঘুরতে গিয়েছিল চন্দ্রিমা উদ্যানে। শুনে কেমন যেন একটা অনুভূতি হয়েছিল আমার। ঠিক খারাপ লাগা নয়, কেমন একটা ফাঁকা ফাঁকা অনুভূতি।

এ সময় একদিন বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার কোচিং শেষে বের হয়ে দেখি রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে তিথি। দোতলার সিঁড়ি থেকে তাকে দেখতে পেয়েই সটকে পড়ার চেষ্টা করি আমি। কিন্তু তিথিটা এমনই গায়ে পড়া স্বভাবের—চিৎকার করে নাম ধরে ডাকতে থাকে আমাকে। অগত্যা তিথির সঙ্গে কথা বলতেই হয়। আমাকে দেখে অকারণেই ছলবল করতে থাকে তিথি। কলেজপড়ুয়া তিথির পরনে কলেজ ইউনিফর্ম। আমার কেমন লজ্জা লজ্জা লাগতে থাকে। কিন্তু ওর সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। কথা বলেই যেতে থাকে।
- কোক খাওয়াবি আমাকে?
- টাকা নেই আমার কাছে!
- তুই এতো কিপটা কেন?
এ কথার পর আত্মসম্মানে যেন কিছুটা আঘাত লাগে আমার। মনে মনে পকেটের অবস্থা চিন্তা করে বলি, চল তোকে বার্গার খাওয়াবো।

সেই সময় ফার্মগেটের আশপাশের দোকানগুলোয় আলু বার্গার বলে এক বস্তু পাওয়া যেত। আট না দশ টাকা করে দাম। সেই বার্গার খেতে খেতে তিথি বলে, ‘চন্দ্রিমা উদ্যানে ঘুরতে যাবি?’ কিছুটা অবাক হলেও সামলে নিয়ে বলি, ‘না, যাবো না। সামনে আমার পরীক্ষা। পড়তে হবে বাসায় গিয়ে!’ আমার উত্তর শুনে বিড়বিড় করে কিছু একটা বলে তিথি। স্পষ্ট বুঝতে পারি না। তবে সেটি যে ভালো কোনো কথা নয়, বরং অবজ্ঞাসূচক কোনো কথা; সেটি বুঝতে অসুবিধা হয় না আমার! এই সময় কোনো ভূমিকা ছাড়াই তিথিকে সরাসরি জিজ্ঞেস করি, ‘তুই না কি সাইফুলকে ভালোবাসিস? তোরা দু’জন চন্দ্রিমা উদ্যানে ঘুরতে গিয়েছিলি!’
- কে বলেছে তোকে?
- যে-ই বলুক, ঘটনা সত্য কি না তাই বল?
- সাইফুল বুঝি এসব বলে বেড়ায় তোকে?
এরপর বাসার উদ্দেশ্যে রিকশা খুঁজছি আমি আর তিথি। এমন সময় কোত্থেতে হাজির হয় লিটন কাকা। তিথির বাবার অফিসের গাড়ির ড্রাইভার।
- এই তিথি, কী করছো এখানে?
- বাসায় যাবো, রিকশা খুঁজছি কাকা।
- চলো চলো, গাড়িতে ওঠো।
আমাকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই লিটন কাকার সঙ্গে গাড়ি করে চলে যায় তিথি। কিছুটা অপমান লাগে আমার। এমন না লিটন কাকা আমাকে চেনেন না! আমাকেও তো নিতে পারতো গাড়িতে! তিথিও একবার বলতে পারল না—চল আমাদের সঙ্গে! মনে মনে ঠিক করি, তিথির সঙ্গে আর কখনো কথাই বলবো না।

এর কিছুদিন পরই কলোনি ছাড়ে সাবিহা আপা, সাইফুলরা। মোকাব্বের কাকা অবসরে গিয়েছিলেন আগেই। তারপরও কয়েক মাস সেখানে ছিলেন তারা। এরপর মিরপুরের দিকে না কোথায় যেন ফ্ল্যাট কিনেছেন তারা। সাইফুল, সাবিহা আপাদের বড় মফিদুল ভাই ভালো একটি চাকরি পেয়েছেন। আমাদের কলোনি জীবনে এই প্রথম কাউকে বিদায় দেই আমরা। সাইফুলরা চলে যাওয়ার পরেও বেশ কিছুদিন খালি ছিল তাদের বাসাটা। প্রায়ই দুপুরের খাবার শেষে আমি তাকিয়ে থাকতাম সাইফুলদের বারান্দার দিকে। চাচির খুব যত্নে বেড়ে ওঠা একটা মানিপ্ল্যান্ট দোল খেত সেখানে, দুপুরের অলস বাতাসে। খুব হাহাকার লাগতো সেটি দেখে। নীরব নিথর পড়ে থাকা মানিপ্ল্যান্টটা মনে করিয়ে দিত, একদিন আমরাও ছেড়ে যাবো কলোনির এই বাসা।

সাইফুলরা চলে যাওয়ার কিছুদিন পর হঠাৎ খবর আসে বিয়ে করেছে সাইফুল। উপমাকে। উপমা, সাইফুল আর তিথি দু’জনেরই বন্ধু। একই স্কুলে পড়েছে তারা। অথচ সাবিহা আপা, মফিদুল ভাই কেউই বিয়ে করেননি তখনো। সবাই খুব অবাক হয়েছিলাম। আমরা তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। বিয়ের কথা মাথায়ই আসে না। অথচ সাইফুল কেমন সাহসের কাজ করে ফেলল।

সেই সময় প্রায়ই সন্ধ্যায় আমাদের বাসায় আসতো তিথি। আমার পড়ার ঘরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা দিত। ভুলেও সাইফুলের কথা তুলতাম না আমি। কিন্তু তিথিই মাঝে মাঝে বলতো সাইফুল আর উপমার কথা। প্রথমে সাইফুলকে বাসায়ই থাকতে দেননি মফিদুল ভাই। আর কী কী যেন সব আর মনে নেই এত বছর পর। তখন সকাল থেকে অনেক রাত অবধি ক্যাম্পাসে থাকতাম আমি। কখনো বাসায় এলে তিথি এসে বলতো, সাইফুল এসেছিল আজ কলোনিতে। আমার খোঁজ করেছে। থাকলে দেখা হতো ইত্যাদি নানা কথা।

এক সময় আমরাও ছেড়ে যাই কলোনি। মনে আছে, যে শীতের সকালে কলোনি ছেড়ে ছিলাম আমরা—সেদিন হাত ধরে আমার সঙ্গে অনেক দূর হেঁটে এসেছিল তিথি। তিথির মা—যিনি আমাকে খুব একটা পছন্দ করতেন না, তাকেও সেদিন দেখেছিলাম মমতা ভরা চোখে তাকিয়ে ছিলেন আমার দিকে। তিথির চোখে জল দেখে কান্না পাচ্ছিল আমারও খুব। এরপর সময়ের স্রোতে ব্যস্ততা বেড়েছে সবারই। অনেক দূরে দূরে সরে গেছে সবাই। একদিন অফিসে যাওয়ার পথে দেখা হয়েছিল তিথির সঙ্গে—অনেক বছর আগে। খুব জোরাজুরি করেছিল সে বাসায় যাওয়ার জন্য। কাজের ব্যস্ততায় যাওয়া হয়নি আর।

রান্না শেষ! খেতে এসো—ভেতর থেকে ডাকছে বনি। উঠতে গিয়ে পায়ের ধাক্কা লেগে পড়ে যায় চায়ের কাপটা। সাদা টাইলসের ফ্লোরে ছড়িয়ে পড়ে অনেকখানি চা। এলোমেলো নকশা এঁকে ছড়িয়ে পড়ে শীতল তরল চা। তাকিয়ে দেখি ছড়িয়ে পড়া চায়ের ওপর চকচক করছে জোছনা। আকাশের দিকে তাকাই। মেঘ কেটে গিয়ে ফকফকে জোছনা উঠেছে। অনেক বছর আগে এমন জোছনা রাতে খুব লোডশেডিং হতো আমাদের কলোনিতে। তখন ছাদে গিয়ে ছোটাছুটি চিৎকার, হইচই করতো কলোনির ছেলে-মেয়েরা। আর আমি নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকতাম ঘরের জানালায়!

এসইউ/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]