লেখার ক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো করতে চাই না: রুমা মোদক

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ
সালাহ উদ্দিন মাহমুদ সালাহ উদ্দিন মাহমুদ , লেখক ও সাংবাদিক
প্রকাশিত: ০২:১২ পিএম, ১৯ ডিসেম্বর ২০২১

রুমা মোদক একাধারে কবি, কথাশিল্পী ও নাট্যকর্মী। লেখালেখি শুরু হয়েছিল কবিতা দিয়ে। পরিচিতি পেয়েছেন মঞ্চনাটকে। ২০০০ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নির্বিশঙ্ক অভিলাষ’। ধীরে ধীরে মনোনিবেশ করেন মঞ্চনাটকে। কমলাবতীর পালা, বিভাজন, জ্যোতি সংহিতা তার সফল মঞ্চনাটক। পাশাপাশি অভিনয়ও করেন। একই সঙ্গে ছোটগল্পও লিখছেন। মঞ্চনাটকে অবদানের জন্য একাধিক পুরস্কার পেয়েছেন।

১৯৭০ সালের ৭ মে হবিগঞ্জে জন্ম নেওয়া রুমা মোদক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। তার প্রকাশিত বইসমূহ—‘নির্বিশঙ্ক অভিলাষ’, ‘ব্যবচ্ছেদের গল্পগুলি’, ‘প্রসঙ্গটি বিব্রতকর’, ‘গোল’, ‘মুক্তিযুদ্ধের তিনটি নাটক’, ‘অন্তর্গত’ উল্লেখযোগ্য। সম্প্রতি তিনি কথাসাহিত্যে ‘চিন্তাসূত্র সাহিত্য পুরস্কার’ লাভ করেছেন। তার পুরস্কারপ্রাপ্তি ও লেখালেখি সম্পর্কে কথা বলেছেন জাগো নিউজের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কথাশিল্পী ও সাংবাদিক সালাহ উদ্দিন মাহমুদ

জাগো নিউজ: সম্প্রতি কথাসাহিত্যে ‘চিন্তাসূত্র সাহিত্য পুরস্কার’ পেলেন, এ প্রাপ্তির অনুভূতি জানতে চাই—
রুমা মোদক: কথাসাহিত্যে এটাই আমার প্রথম কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পুরস্কার। এর আগেও গল্প লিখে একাধিক পুরস্কার পেয়েছি। তখন এই যে আপনারা কথাসাহিত্যিক অভিধায় ডাকছেন, আমার সে পরিচয় ছিল না। মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি ইউনিলিভার ‘ফেয়ার অ্যান্ড লাভলী’ প্রমোট করার জন্য একবার ভালোবাসার গল্প নামে প্রতিযোগিতায় গল্প আহ্বান করলো। পঞ্চাশজন গল্পকারের একজন হিসেবে পুরস্কার পাওয়ার জন্য দেশের প্রায় সব কয়টি পত্রিকায় আমার নাম ঘোষণা করলো। গল্পগুলো খুব সম্ভব সাপ্তাহিক ২০০০ প্রকাশ করলো। হুমায়ূন আহমেদ বিচারক হিসেবে কয়েকপাতা সমালোচনামূলক ভূমিকা লিখলেন। সবই হলো। কিন্তু পুরস্কার আমার হাতে পৌঁছালো না। কেন তা আজও জানি না।

তারপর অবশ্য আরও দুয়েকবার এরকম বিচ্ছিন্ন একটা-দুটো গল্পের জন্য পুরস্কার পেয়েছি। নামে পরিচিত না হলেও আর্থিক প্রাপ্তি হিসেবে বেশ ছিল। এরকম একটি পুরস্কারের টাকা আমার সন্তানদের জন্মের সি সেকশনের সময় কাজে লেগেছিল। বৈশাখী টিভির সেরা গল্পকারের পুরস্কার পেয়েছিলাম যে গল্পটি লিখে, সাহিত্যিক অমর মিত্র সে গল্পকে খুবই দুর্বল গল্প হিসেবে আমার পাণ্ডুলিপি থেকে বাদ দেওয়ার জন্য পরামর্শ দিয়েছিলেন। আসলে ধান ভানতে এতো শিবের গীত গাওয়ার কারণ, আমাদের সাহিত্য পুরস্কার গুলোর প্রায় সব কয়টি পক্ষপাতিত্বমূলক হয়ে উঠেছে। কিন্তু এ পুরস্কার ব্যাপারটি আসলে আপেক্ষিক।

চিন্তাসূত্র প্রথমবারের মতো এ কথাসাহিত্য পুরস্কারের জন্য আমাকে নির্বাচিত করেছে। বিষয়টি আমার জন্য কিছুটা অপ্রত্যাশিত। বাংলাদেশের অধিকাংশ সাহিত্য পুরস্কার গত কয়েকবছর ধরে নানা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ফলে পুরস্কারপ্রাপ্তি গৌরবের চেয়ে বিব্রতকর হয়ে দাঁড়ায়। পুরস্কারপ্রাপ্তির পর আনন্দ প্রকাশের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে পুরস্কারটি কতটা নিরপেক্ষ তার প্রমাণ হাজির করা। পুরস্কার বা পদক যিনি বা যাঁরা দেন, তাঁরা মূলত এর মাধ্যমে লেখকদের সম্মান জানান। তাঁরা নিশ্চয়ই পাঠকও বটে। লেখক হিসেবে তাঁদের মূল্যায়নকে অসম্মান করার হিম্মত আমার নেই। তাই পুরস্কারকে লেখক জীবনের অমূল্য অর্জন বলে মনে করি। চিন্তাসূত্র এবার প্রথমবারের মতো পুরস্কার দিচ্ছে। কাজেই সেটা কতটা পক্ষপাতিত্বহীন কিংবা গোষ্ঠীবদ্ধতার ঊর্ধ্বে কিংবা নিরপেক্ষ তা ভবিষ্যৎ বলবে।

জাগো নিউজ: সমসাময়িক কথাসাহিত্য নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কেমন? পাঠক হিসেবে কোনো ঘাটতি কি চোখে পড়ে?
রুমা মোদক: অনেক কাজ হচ্ছে। অনেকেই লিখছেন, লেখার চেষ্টা করছেন। নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা কিন্তু স্বতন্ত্র স্বর পাচ্ছি খুব কম। পাঠক হিসেবে এটা আমার অবজার্ভেশন।

জাগো নিউজ: একজন লেখক হিসেবে বাংলা কথাসাহিত্য নিয়ে আপনার প্রত্যাশা ও প্রচেষ্টা সম্পর্কে কিছু বলুন—
রুমা মোদক: প্রত্যাশা তো অনেক। আমরা এই গ্রহের একটা ট্রানজিট পিরিয়ডের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। প্রযুক্তি এক বিশাল নিয়ামক হয়ে উঠেছে দৈনন্দিন জীবনের। বদলে গেছে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মেরুকরণ। এর মাঝে বৈশ্বিক মহামারিতে কোটি কোটি প্রাণহানি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে গেছে, এই শ্রেষ্ঠত্বের বড়াইয়ের ফাঁক-ফোকরগুলো। মানুষে মানুষে আকাশ পাতাল ফারাকের পৃথিবীতে সাহিত্যের কাছে প্রত্যাশা অনেক। লেখক হিসেবে প্রচেষ্টাও কিছু আছে। কতটা কী পারবো জানি না।

জাগো নিউজ: আপনি মঞ্চনাটকও লিখছেন। মঞ্চে কাজও করছেন। বিজয়ের পঞ্চাশ বছরে মঞ্চনাটকের অগ্রগতি সম্পর্কে কী বলবেন?
রুমা মোদক: মঞ্চে কাজ করছি প্রায় ২৫ বছর। আমাদের মঞ্চে প্রচুর কাজ হচ্ছে। প্রচুর মেধাবী ছেলেমেয়েরা কাজ করছেন। নানা নিরীক্ষা হচ্ছে। শিকড় সংলগ্ন কাজ হচ্ছে। দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে হচ্ছে। শিল্পমানের সাথে আপোসহীন কাজ হচ্ছে। ব্যক্তি অভিজ্ঞতায় এসব আসলে শ্লাঘা করেই বলতে পারি। কিন্তু প্রশ্নটা হচ্ছে, তা কি মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে? সময়টা তো বদলে গেছে। হাতে হাতে স্মার্টফোন, চ্যানেল ঘোরালে ১০০টি চ্যানেল। পৃষ্ঠপোষকতা এবং রুচির খরায় আমাদের যাত্রার মতো সমৃদ্ধ শিল্প ধ্বংস হয়ে গেছে।

এখনো যারা মঞ্চে কাজ করছেন, তাদের জন্য রাষ্ট্র কী করেছে? দায়িত্ববান মানুষেরা কী করেছে? তারা তো যুগের পর যুগ ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়িয়ে যাচ্ছেন। আপনি আমি তো ১০০ টাকায় টিকিট কিনে তাদের মাসের পর মাস চর্চা, রিহার্সাল পরিশ্রমটারও মূল্য দিতে চাইছি না। বরং না দেখেই সিদ্ধান্ত দিচ্ছি, মঞ্চে ভালো কাজ হচ্ছে না। মঞ্চে দর্শক নেই, এর দায় মঞ্চকর্মীদের দেওয়ার আগে অন্যদের একটু নিজের মুখোমুখি হওয়া উচিত। পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে মঞ্চও যদি মুখ থুবড়ে পড়ে অবাক হবো না। আর যদি প্রশ্ন করেন, মঞ্চে পৃষ্ঠপোষকতা করা দরকার কেন? তবে তো আরেকটি নিবন্ধ লিখতে বসতে হবে।

জাগো নিউজ: যেসব কথাশিল্পী আপনাকে আলোড়িত করেন, লিখতে অনুপ্রাণিত করেন; তাদের সম্পর্কে জানতে চাই—
রুমা মোদক: সৈয়দ ওয়ালী উল্লাহ, মানিক, তারাশঙ্কর, বিভূতিভূষণ, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, আবুল বাশার, হাসান আজিজুল হক, শওকত আলী—নানাজনের দ্বারা নানাসময় প্রভাবিত হয়েছি। কিন্তু লিখতে গিয়ে নিজের স্বতন্ত্র স্বর তৈরি করার ক্ষেত্রে সদা সতর্ক থেকেছি।

জাগো নিউজ: সমকালীন কথাশিল্পীরা কি কথাসাহিত্যে কোনো পরিবর্তন আনতে পেরেছেন? নাকি পুরোনো পথেই হাঁটছেন?
রুমা মোদক: অনেকে চেষ্টা করছেন। অনেক লিখছেন। নানা শৈলী ও বিষয়ের অভিনবত্বে লিখছেন। পুরোনো পথে হাঁটছেন কথাটা একশত ভাগ ঠিক নয়। হয়তো সেভাবে স্বতন্ত্র স্বর তৈরি হয়ে ওঠেনি। কিন্তু হবে বলেই আশা করি।

জাগো নিউজ: এ পর্যন্ত আপনার বেশ কয়েকটি বই আমরা পেয়েছি। আগামী বইমেলায় পাঠকের জন্য নতুন কোনো উপহার থাকছে কি?
রুমা মোদক: লেখার ক্ষেত্রে আমি তাড়াহুড়ো করতে চাই না মোটেই। এই মুহূর্তে একটি বড় কাজ করছি। দেখা যাক কী হয়।

জাগো নিউজ: নবীন লেখকদের জন্য আপনার পরামর্শ কী হতে পারে? দীর্ঘপথের যাত্রায় আপনার কোন অভিজ্ঞতা তাদের কাজে লাগতে পারে?
রুমা মোদক: না না, কোনো উপদেশ-পরামর্শ নেই। আমার এক বন্ধু আজ বলছিল, আমি তোমাকে পুরস্কার দিলে তো আর সাহিত্যিক নাট্যকার লেখক হিসেবে দেব না। দেব লেগে থাকার জন্য। এটিই মনে হয় বড় কথা। একটি লম্বা দৌড়। শর্টকাট কথা বলে কিছু নেই। আর বিশ্বসাহিত্যের গতিপ্রকৃতি, নিজস্ব ভাষা তৈরি, মানুষকে জানা—এসবও খুব গুরুত্বপূর্ণ।

জাগো নিউজ: সাহিত্যের ওয়েবম্যাগ সম্পর্কে আপনার ধারণা কেমন?
রুমা মোদক: ওয়েবম্যাগ একটি বিরাট ফ্যাক্টর এখন। একসময় যেমন ছিল লিটলম্যাগ। দৈনিকে ছাপা লেখাও অন্তর্জালে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করতে হয়। ক’জন পাঠক পড়লেন সেটা জানা যায়, পাঠকের প্রতিক্রিয়া জানা যায়। এই প্রক্রিয়ার সুবিধা থেকে লেখক কিংবা পাঠক কাউকেই আর বিচ্যুত করা সম্ভব নয়। কাজেই ওয়েবম্যাগকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। লিটলম্যাগ যেমন ছিল একটি ম্যুভমেন্ট। ওয়েবম্যাগ সেরকম ম্যুভমেন্ট তৈরি করতে পারেনি, কিন্তু সম্ভাবনা ছিল উজ্জ্বল। বরং কিছু ভূইফোঁড় ওয়েবম্যাগের জন্ম পুরো প্রক্রিয়াটিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে দিচ্ছে। অথচ প্রযুক্তি আর অন্তর্জালের যুগে ওয়েবম্যাগই হতে যাচ্ছে পাঠকের কাছে পৌঁছানোর এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

জাগো নিউজ: সবশেষে পুরস্কারপ্রাপ্তির জন্য অভিনন্দন ও শুভ কামনা রইল। এ যাত্রা অব্যাহত থাকুক—
রুমা মোদক: আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ। জাগো নিউজের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা।

এসইউ/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]