দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণুর কবিতা

বিপন্ন মানবতার প্রলম্বিত ছায়া ও অন্যান্য

সাহিত্য ডেস্ক
সাহিত্য ডেস্ক সাহিত্য ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৫:২৬ পিএম, ০৯ ডিসেম্বর ২০২৩

এক.
বিপন্ন মানবতার প্রলম্বিত ছায়া
দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু

বেদনার দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আসা
সেই আয়নাল কুর্দির কথা কি সভ্যতা-মানবতা মনে রেখেছে
যে বালিতে মুখ গুঁজে সমুদ্রতীরে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিল?

‘আমার সন্তানেরা ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর শিশু।
ওরা প্রতিদিন আমার ঘুম ভাঙাত
খেলা করত আমার সঙ্গে
এর চেয়ে সুন্দর মুহূর্ত আর কী হতে পারে?
এ সবকিছুই হারিয়ে গেছে।’
সিরীয় শিশু আয়নালের বাবা আবদুল্লাহ কুর্দির
শোকার্ত ওই উচ্চারণও কি
কথিত মানবিক বিশ্ব মনে রেখেছে?

তুরস্কের সৈকতে লাল শার্ট, হাফ প্যান্ট পরা
নিথর আয়নাল কিছু বিবেককে প্রচণ্ড নাড়া দিয়েছিল
অভিবাসী-সংকট নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত ইউরোপের নির্লিপ্ত নেতাদের
শেষ পর্যন্ত ঘুম ভাঙালেও এরই মধ্যে
আয়নালের অনুজ গালিব আর তার মা রেহানাসহ
গৃহযুদ্ধকবলিত সিরিয়ার প্রায় আড়াই হাজার মানুষের প্রাণ
ভূমধ্যসাগরে চিরতরে ডুবে গিয়েছিল!

তুর্কি আলোকচিত্র সাংবাদিক নিলুফার দেমি বলেছিলেন,
‘যখন বুঝতে পারলাম ছেলেটাকে বাঁচানোর কোনো উপায়ই নেই
মনে হলো ওর ছবি তুলি; বেদনাদায়ক ঘটনাটা দেখুক সবাই
আশা করি, এ ছবি যে ধাক্কা দিয়েছে
তা চলমান সংকট সমাধানে সহায়ক হবে।’

বালু দিয়ে আয়নালের ভাস্কর্য বানিয়ে এর মর্মস্পর্শিতার
প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন ভারতীয় শিল্পী সুদর্শন পট্টনায়েক।
ভাস্কর্যের পাশে তিনি লিখেছিলেন,
‘ভেসে যাওয়া মানবতা... লজ্জা লজ্জা লজ্জা’।

আলোকচিত্র সাংবাদিক দেমি, ভাস্কর পট্টনায়েক
তোমাদের সেই বেদনাকাতর আবেদন
মেরুকরণের বিশ্বে ভূরাজনীতির সমীকরণের বৃত্ত ভেদ করে না
গাজায় চরম মানবিক বিপর্যয়েও পরাশক্তির ভোঁতা বিবেক জাগে না
ইসরায়েলের জিঘাংসায় হাজার হাজার শিশু জন্মসনদের আগেই
মৃত্যুসনদ নিয়ে ফের প্রশ্ন রেখেছে, এই কি সভ্যতার উৎকর্ষ আলো!

যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই- শান্তিপ্রিয়দের এ চিৎকার কে শোনে
রাশিয়া-ইউক্রেন, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ও বিশ্বের কত দেশেই
বিপন্ন-বিপর্যস্ত মানবতার ছায়া প্রলম্বিত ছায়া!

দুই.
খণ্ডিত পাণ্ডুলিপি

তোমরা টাকা জমাতে চাও? জমাও।
আমি মানুষ জমাতে চাই, মানুষ।

তোমরা খ্যাতি কুড়াতে চাও? কুড়াও।
আমি ফলবান বৃক্ষের মতো নত মানুষের পদস্পর্শ চাই।

তোমরা দীর্ঘায়ু হতে চাও? হও।
আমি উৎকৃষ্ট শিল্পের জন্য বেদনাই চাই।

তোমরা সুখের কথা আড়ম্বর করে বলতে চাও? বলো।
আমি দুঃখের চাষবাসই করে যেতে চাই।

তোমরা ক্ষমতার দণ্ডধারী হতে চাও? হও।
আমি জীবনের উঠোনে জীবন বিলিয়ে প্রাণের উর্বরতা চাই।

তোমরা স্বপ্নের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে চাও? ওঠো।
আমি আত্মায় আত্মায় ডুবে যেতে চাই বলেই শিখিনি সাঁতার।

তোমরা কি জানো গাছের মগডালে কিংবা ক্ষমতার চূড়ায় উঠলেও
নিচে কিন্তু নামতেই হবে কোনো এক বেলায়।

তিন.
তুমি যেও না

যেও না, বারণ করছি; যেও না
স্থির জানি, গেলেই তুমি হারিয়ে যাবে।

তোমার নিয়তি হতে পারে না নিরুদ্দেশযাত্রা
তুমি সাগরের ক্ষুব্ধ তরঙ্গে আছড়ে পড়া ঢেউ
তুমি মিছিলে মিছিলে বজ্রমুষ্টির স্মারক
তোমাকে এভাবে প্রস্থান মানায় না, কখনও না
তুমি কালের যোগ্য উত্তরাধিকার।

লোডশেডিংয়ে অসহায় ল্যাম্পপোস্টের মাথা ছুঁইয়ে
অন্ধকার তাড়িয়ে তুমিই দেখাও আলো
আমাদের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় জানুক
তাদের সরবরাহ বিদ্যুৎ না পেলেও আমরা আলোহীন নই
বহুমাত্রিক বিশ্লেষণে ও বহুরৈখিক বিবেচনায়
তোমাকে প্রয়োজন, খুব প্রয়োজন।

রাষ্ট্র-সমাজ শব্দ দুটি উচ্চারণমাত্র তুমি আরও বেশি
অপরিহার্য হয়ে ওঠো
মনে পড়ে বিদ্রোহ-বিপ্লবের স্বপ্নধ্যানে
তোমাকে স্তবের মতো উচ্চারণ করি
যেও না, বারণ করছি; যেও না
স্থির জানি, তুমি গেলেই অঙ্গীকারগুলো হারিয়ে যাবে।

তুমি প্রাত্যহিক জীবনের খুব জরুরি অনুষঙ্গ
তুমি তাবৎ নির্মাণের রূপকার, অনিন্দ্যসুন্দর
তুমি ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রের অববাহিকায় চরিত্রায়ণ
এত ক্লেদের মাঝেও তুমি দহনবেলার উচ্চারণ
তুমি হৃদয়ের গভীরে অন্তর্গত বোধ ও সৌন্দর্য
তুমি স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি ও নিঃসংশয়
পর্যবেক্ষণ তীক্ষ্ণ, সূক্ষ্ম, তোমার প্রকাশ অনবদ্য।

যেও না, বারণ করছি; যেও না
তুমি চলে গেলে রূপগত পরিচর্যার পরিচয়
মিশে যাবে ধুলোয়।

এইচআর/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।