মায়াবতী : পর্ব ০৬

মোহিত কামাল মোহিত কামাল , কথাসাহিত্যিক, মনোচিকিৎসক
প্রকাশিত: ০৪:১৬ পিএম, ২৬ এপ্রিল ২০২১

কথাসাহিত্যিক মোহিত কামালের মায়াবতী বাংলা সাহিত্যে দ্বিতীয় মনোবৈজ্ঞানিক উপন্যাস। সাহিত্যের শব্দবিন্যাসে তিনি ব্যবহার করেছেন মনস্তত্ত্ব, সমাজের আড়ালের চিত্র। মা প্রত্যক্ষ করেছেন, মেয়েরা নানাভাবে উৎপীড়ন ও যৌন নিপীড়নের শিকার হয়, সহজে মুগ্ধ হয়ে অবিশ্বাস্য পাতানো ফাঁদে পা দেয়। মায়ের একান্ত চাওয়া মেয়ে ক্যারিয়ার গড়ে তুলুক। বিধিনিষেধ আরোপ করেন মা। মেয়ে তখন মনে করে, মা স্বাধীনতা দিতে চায় না, বিশ্বাস করে না তাকে। মায়ের অবস্থানে মা ভাবছেন তিনি ঠিক। মেয়ের অবস্থানে মেয়ে ভাবছে, সে ঠিক। মায়ের ‘ঠিক’ এবং মেয়ের ‘ঠিক’র মাঝে সংঘাত বাধে। সংঘাত থেকে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়, ভুল করে বসে মেয়ে রিয়া। পালিয়ে যায় ঘর থেকে। এই ‘ভুল’ই হচ্ছে উপন্যাসের মূলধারা, মূলস্রোত। মায়াবতী পড়ে চিন্তনের বুননে ইতিবাচক গিঁট দেয়ার কৌশল শেখার আলোয় পাঠক-মন আলোকিত হবে। জানা যাবে টিনএজ সমস্যা মোকাবিলার কৌশল। জাগো নিউজের পাঠকের জন্য ধারাবাহিক প্রকাশিত হচ্ছে সাড়া জাগানো উপন্যাসটি-

আট.
‘নোবেল প্রাইজের গৌরবে হাসছে বাংলাদেশ। অর্থনৈতিক-সামাজিক উন্নয়নে অবদানের জন্য ‘নোবেল শান্তি পুরস্কার ২০০৬’ পেলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংক।’ দেশের সব কয়টি দৈনিক পত্রিকার প্রথম পাতায় আট কলামজুড়ে বিরাট হেডলাইন। আনন্দ-খবরটা পড়ার জন্য প্রতিটা পত্রিকা স্ট্যান্ডের সামনে ভিড়। সবাই দাঁড়িয়ে পত্রিকার হেডলাইন দেখছে, দেখছে নীলাকাশে ভাসমান দুবাহু বিস্তৃত নোবেলজয়ীর স্বপ্নময় ছবি। পেছনে অসীম আকাশ, অন্তহীন সমুদ্র। মানুষের বিস্তার হতে পারে কতদূর? মানুষের স্বপ্ন কত বড়? ড. ইউনূস দেখিয়েছেন মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়। তাঁর স্বপ্ন ছুঁয়েছে সমগ্র পৃথিবীকে। দুনিয়ার কেউ গরিব থাকবে না, গরিব না-থাকাই মানুষের অধিকার। এ স্বপ্নের ফেরিওয়ালা পৃথিবীকে জানিয়ে দিয়েছেন শান্তির প্রধান শর্ত দারিদ্র্য ও ক্ষুধা থেকে মুক্তি। আনন্দিত পৃথিবীর বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী বিস্ময়কর আনন্দে উদ্বেলিত।

এ উচ্ছ্বাসের মাইক্রো অনুভূতি ছুঁয়ে যাচ্ছে মাহিনেরও মন। পত্রিকার একটা ছোট্ট নিউজে চোখ আটকে যায় তার। ‘চট্টগ্রাম থেকে অসলো’―এ কলামের ছোটো শিরোনামের ভেতরে লেখা আছে ড. ইউনূস চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলের ছাত্র, চট্টগ্রাম কলেজের ছাত্র। নিউজ পড়ার সঙ্গে সঙ্গে পত্রিকা বুকের সঙ্গে সেঁটে ধরে ও। চোখ বেয়ে ধেয়ে আসে অশ্রুধারা। মাহিনও চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলের ছাত্র, চট্টগ্রাম কলেজের ছাত্র। মাহিনের স্কুল নোবেল পেয়েছে। মাহিনের কলেজ নোবেল পেয়েছে। ইউনূসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাই এখন নোবেলজয়ী। কান্না এলো। আনন্দের কান্না। বিজয়ের কান্না। নিউমার্কেটের দক্ষিণ গেটের পূর্ব পাশের পত্রিকা স্ট্যান্ডের সামনে দাঁড়িয়ে এ অপূর্ব দৃশ্যটা দেখল কুসুমকলি।

কুসুমকলি এসেছিল ফল কিনতে। গেটের কাছে নানা ধরনের বিরল ফলের দোকান বসে। প্রায়ই আসে কুসুম। আজও এসেছে। ফলওয়ালার সঙ্গে কথা থামিয়ে ও দেখছে মাহিনের কান্না। এমন সুদর্শন তরুণ পত্রিকা জড়িয়ে কাঁদছে কেন।

কুসুম সামনে এগিয়ে গেল। মন্ত্রমুগ্ধের মতো অদৃশ্য এক শক্তির টানে এগিয়ে এসে ও মাহিনের মুখোমুখি দাঁড়াল। মাহিনের চোখ বন্ধ। বন্ধ চোখের কোণ বেয়ে নেমে আসছে মায়াবী জলকনা। চোখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে ও সামনে দেখল অনিন্দ্য সুন্দরী এক তরুণীকে। দেখেই ভড়কে গেল। চোখে চোখে তাকিয়ে আছে মেয়েটি।
সরি। ইতস্তত স্বরে বলল মাহিন।
‘সরি’ শোনার সঙ্গে সঙ্গে কুসুমও অবাক হয়ে গেল। একটা ছেলের সামনে এভাবে কেন বোকার মতো দাঁড়াল, বুঝতে না পেরে কোনো প্রশ্ন না করেই ঘুরে দাঁড়াল কুসুমকলি।

ফিরে এলো সে ফলওয়ালার সামনে। এখানে অনেক রকম ফল বিক্রি হয়। আমলকি, হরিতকি, লটকন, করমচা, আমড়া, সফেদা, শরিফা, বনকাঁঠাল, আতা, বেল, কতবেল, তেঁতুল, বেতফল, আলুবোখারা, আপেল, নাশপাতি, বেদানা, ডালিম, কামরাঙা―এসব নানা জাতের বিরল ফলের সমাহার রয়েছে এখানে। দামও বেশ চড়া। দামাদামি না করলে ঠকতে হবে।
তেঁতুল, বেতফল, আমলকি ও শরিফা―চার রকমের ফলের দিকে আঙুল দেখিয়ে কুসুম বলল, এসব নিতে চাই।
জি আফা। নেন। ভালা ফল। তাজা ফল। এক নম্বর ফল। নেন আফা, নেন।
কুসুমকলি মুচকি হাসল।
দু-নম্বর ফল আছে না-কি?
প্রশ্ন শুনে কিছুটা থতমত খেল ফলওয়ালা।
না আফা, দুই নম্বর কারবার নাই এইহানে। এক নম্বর দোকানদার, এক নম্বর ফল, এক নম্বর কাস্টমার। সবাই এহানে এক নম্বর।
তাই! সবাই এক নম্বর!
হঁ। আফা। হঁ। নেন। আফনার জন্য দাম নাই। লাভ নিমু না আফা। নেন। কেনা দামে বিক্রি।
লাভ নেবে না কেন? অবশ্যই লাভ নেবে। তবে যৌক্তিক লাভ নেবে। বেশি ঠকাবে না। বেশি জিতবে না। কুসুমকলির কথা শেষ হয়নি। থেমে গেল ও এ সময়। একজন ভদ্রমহিলা সামনে এসে দাঁড়াল। বেশ মোটা নাদুসনুদুস মহিলা তেঁতুলের পলিথিন মোড়া প্যাকেটের দিকে দেখিয়ে বলেন, ওইটা দাও।
কথা শেষ করে হ্যান্ডব্যাগ থেকে পার্স বের করেন তিনি।
কত?
আফা, দুইশ টেহা কেজি। এইহানে আধা কেজি আছে। একশ টেহা দেন।
মহিলা টাকা দিয়ে তেঁতুলের প্যাকেট নিয়ে চলে যেতেই কিশোরোত্তীর্ণ চটপটে বিক্রেতা কুসুমকলির দিকে তাকাল।
আফা। বেয়াদবি মাফ করবেন। একশ টেহা কেজি কিননা দুইশ টেহা দরে বিক্রি করলাম। আধাআধি লাভ। আপনার জন্য একশ টেহাই সই। দেই?
কুসুম বলল, না না লাভ নাও। লাভ নিয়ে দাম নাও। কম লাভ করো।
কুসুমকলি দেখল সত্যি সত্যিই একশ টাকা দরে হিসাব করছে ছেলেটা। বেতফল, আমলকি ও শরিফার দাম তার জানা নেই। তেঁতুলের বিক্রিত দাম জেনেছে। ছেলেটি কম নিতে চাইছে কেন?
এই ছেলে? কম দামে দেবে কেন আমাকে?
ছেলেটার মুখে বিগলিত হাসি ভেসে ওঠে। চোখের মণি হাসে। ময়লা চুল, ময়লা মুখ, পুরো দেহ হেসে ওঠে। হাসিমুখে বলল, জানি না আফা। আপনার থেইকা লাভ নিমু না, এইডা জানি।

কুসুমকলি আর কিছু বলার সুযোগ পেল না। খেয়াল করল ওর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে পত্রিকা বুকে জড়ানো সেই তরুণ। কুসুমকলি তরুণের চোখের দিকে ফিরে তাকাল। তরুণ এখন বেশ প্রসন্ন। ওর কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ। বেশ লম্বা। দেখে মনে হলো না সে বখাটে। দেখে মনে হয় না―অসৎ উদ্দেশ্যে পাশে দাঁড়িয়েছে ছেলেটা। কুসুমকলির ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলে দিয়েছে এ তরুণ নিরাপদ। ভয়ের কিছু নেই।

ফলের প্যাকেট গোছানো শেষ করতে পারেনি কুসুম। তরুণ শরিফার দিকে আঙুল তুলে বলল, এখান থেকে দুটো নেব। কত?
ছেলেটা ঝটপট জবাব দিলো, দুইডা একশ বিশ টেহা।
‘একশ বিশ টেহা’ বাক্যটি শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে কুসুমকলি তাকাল ছেলেটির দিকে। কারণ একজোড়া শরিফা সেও নিয়েছে। আশি টাকায়। বিক্রেতা চোখের ইশারায় বুঝিয়ে দেয়, আফনার কাম আফনি করেন। প্যাকেট গুছিয়ে নেন। কথা কইয়েন না।
সুদর্শন তরুণ বলল, একশ দিই?
না না। একদাম সাব। একদাম।
সে আর দামাদামি না করে প্যান্টের পেছন পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে একশ বিশ টাকা তুলে দিয়ে শরিফা নিয়ে ঘুরে দাঁড়াল। ঘোরার সময় চোখাচোখি হয়ে গেল কুসুমকলির সঙ্গে। কুসুমকলির মুখে হাসি ফুটে আছে। মায়াবতী রূপবতীর এই হাসি সব সময় লেগেই থাকে মনে হচ্ছে। এটা আরোপিত হাসি নয়; নির্ভেজাল মনের বাইরের আলাদা প্রকাশমাত্র। বুঝল এ তরুণ।

হাসির দ্যুতি দেখে নিজেকে সামলে নেয় তরুণটি। কথা বলার ইচ্ছা হয়েছিল। ইচ্ছা থামিয়ে দিয়েছে ও। শরিফার প্যাকেট নিয়ে নিউমার্কেটের পশ্চিম দিকের করিডরে চলে এল। উদ্দেশ্য ‘ঢাকা বুক কর্পোরেশন’। বই কেনার ইচ্ছা আছে তার। এখানে বিরল সব বই পাওয়া যায়। বইয়ের পোকা মাহিন আর পেছনে না ফিরে, কোনোদিক না তাকিয়ে হাঁটতে লাগল সামনে।
কুসুমকলিও ফল নিয়ে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়।
বিক্রেতা বলল, আবার আইয়েন। আফনার জন্য ফাস্ট কেলাস ফল রাইখ্যা দিমু।
কুসুমকলি আর কথা না বাড়িয়ে ফলের প্যাকেট নিয়ে চলে এলো।
কোনো দোকানে কিনতে গেলে বিক্রেতারা তাকে অসম্ভব খাতির করে। শিক্ষিত ছেলেরাও গায়ে পড়ে কথা বলতে চায়। দাম কম নিতে চায়। অনেকক্ষণ ধরে রাখতে চায় সামনে। বিষয়টি বেশ এনজয় করে কুসুম। কেন এমন করে? নিজের মধ্যে এমন কী আছে? তবে কি সব রূপবতী মায়াবতী মেয়েদেরই ছেলেরা খাতির করে বেশি? প্রশ্ন জাগে ওর মনে।

এই তো সেদিন গিয়েছিল অর্কিড প্লাজায়। ঈদের কয়েকদিন আগে। এক সুদর্শন বিক্রেতা বসেছিল ক্যাশে। সঙ্গে ছিল মনু আপা। মনু আপা শাড়ির দাম করছিল। কিছুতেই দাম কমাবে না বিক্রেতা। কুসুম এগিয়ে এসে ক্যাশের তরুণের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, দেখেন তো, উনার বলা মূল্যে শাড়িগুলো দেওয়া যায় কি-না। এবার বিগলিত হাসি দিয়ে একলাফে মূল্য এক হাজার টাকা কমিয়ে দেয় বিক্রেতা। কী এমন শক্তি আছে নিজের মধ্যে!

নিজের আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়। নিজেকে সুন্দরী ভাবতে ভালো লাগে। ভালোলাগাটা অনিয়মমতো কাজে লাগাতে চায় না ও। প্রয়োজনে কাজে লাগায়। সামনে দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে যেকোনো পুরুষের চোখ ধাঁধিয়ে যায়। সঙ্গে রিয়া থাকলে তো কথা নাই। পুরুষচোখ গলতে শুরু করে। এ গলার অর্থ কী! বোঝে না কুসুমকলি।

রিয়ার কথা মনে হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে গেল ডায়েরি নেওয়ার কথা। রিয়া বলেছিল ডায়েরি নিতে। ভুলেই গিয়েছিল।
নিউমার্কেটের ভেতরের দিকে হেঁটে এসে পশ্চিমে এগোতে থাকে কুসুম। বাঁ পাশে সারি সারি বুক স্টল। স্টলের সামনের বারান্দায় বসে আছে হকার। কেউ কলম বিক্রি করে। নানা ধরনের কলমের ছড়াছড়ি। কেউ বিক্রি করে ডায়েরি, খাতা। রকমারি ডায়েরি পাওয়া যায় এখানে।

এক হকারের সামনে দাঁড়াল কুসুম। প্রায় একই সঙ্গে সামনে এসে দাঁড়াল ওই যুবক। একটু আগে শরিফা কিনেছে। তারও আগে পত্রিকা বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছিল। বারবার ওর সঙ্গে দেখা হয়ে যাচ্ছে। দেখা হওয়াকে স্বাভাবিক কো-ইনসিডেন্স হিসেবে দেখছে কুসুম। চোখাচোখি হয়। সঙ্গে সঙ্গে হাসি ফোটে কুসুমের মুখে। তরুণও হাসে। উভয়ের হাসির মধ্যে আছে অবাক হওয়ার দোলা।

কুসুম একটা ডায়েরি হাতে নিয়েই ছেলেটার দিকে তাকাল। একটা কথা জিজ্ঞেস করব আপনাকে?
কিছুটা অবাক হয় তরুণ। পরক্ষণেই সহজ হয়ে বলল, অবশ্যই।
পত্রিকা বুকে জড়িয়ে কাঁদছিলেন কেন?
ওটা ছিল আনন্দের কান্না। আমার স্কুল নোবেল পেয়েছে। আমার কলেজ নোবেল প্রাইজ পেয়েছে। আনন্দে কান্না চলে এসেছিল তখন। ওটা ছিল সুখের কান্না।
ড. ইউনূস কি আপনার স্কুলের ছাত্র ছিলেন?
হ্যাঁ। আমার স্কুলের। আমার কলেজের। এটা হচ্ছে বিশ্বের বৃহত্তম জয়ের ক্ষুদ্রতম চিন্তা। ক্ষুদ্রঋণের এ প্রবক্তা আমার। আমি ভাবতে পেরেছি তিনি একদম আমার শেকড়ের কেউ। আমার প্রতিটা স্নায়ুকোষ নাড়া খেয়েছে নিউজটি পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আনন্দে কেঁদে উঠেছে মন।

কুসুমকলি মুগ্ধ হয়ে গেল। তরুণের চমৎকার বর্ণনা বুকের গহিনে টোকা দিয়ে বসল। এই টোকায় নড়ে উঠল মন। নড়ে উঠল দেহ। নাড়া খেল নিজের অহমিকা। কথা বলতে ইচ্ছা করল ওর সঙ্গে। পাশে থাকার ইচ্ছাও। তবুও নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল কুসুম।

ছেলেটা এবার পালটা প্রশ্ন করে বসল, আপনি তখন আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছিলেন কেন?
কুসুমকলির কণ্ঠে জড়তা নেই। জড়তাহীন নিঃসংকোচে বলে ফেলল, দৃশ্যটা ছিল অপূর্ব। অপূর্ব দৃশ্যই আমাকে ওইখানে টেনে নিয়ে গিয়েছিল। এমন সৌন্দর্য সহজে ভেসে ওঠে না, ফোটে না মানুষের মুখে। আপনার ভঙ্গিমায় সেই দৃশ্য ফুটেছিল।
তরুণ এবার নাড়া খেল। নিজের প্রশংসা শুনে সংকুচিত হলেও জমে গেল না ও। সংকোচের খোলস থেকে বেরিয়ে বলল, আমি মাহিন। বুয়েটে পড়ছি। আপনি?
কুসুমকলি সাধারণত অপরিচিত কারোর সঙ্গে বাইরে কথা বলে না। কাউকে নিজের পরিচয় দেয় না। এ মুহূর্তের পরিচয়ের উত্তরে পরিচয় দিতে হয়। নিজেকে অভদ্র মনে করে না ও। সজ্জন কুসুমকলি। অনেক বাস্তববাদী। নিজের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যের মোড়ক খুলে বেরিয়ে সহজ হয়ে বলল, আমি কুসুমকলি। ভিকারুননিসা নূনে পড়ছি, ইন্টারমিডিয়েট সেকেন্ড ইয়ার।
থ্যাঙ্কস। আপনার পরিচয় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ। মাহিনের কণ্ঠে কৃতজ্ঞতা।
আপনাকেও ধন্যবাদ। আপনার সঙ্গে পরিচিত হয়ে ভালো লাগছে। ড. ইউনূসের প্রাপ্তিকে আপনি নিজের প্রাপ্তি মনে করেছেন―এ বিষয়টি আমার ভালোলাগার প্রধান কারণ। এজন্য আবারও ধন্যবাদ আপনাকে।
মাহিনের ভেতর থেকে অন্য কেউ জেগে উঠেছে। প্রশ্নের পর প্রশ্ন ঠেলে বেরিয়ে আসছে ভেতর থেকে। প্রশ্নের জোয়ার সামাল দিয়ে বিনীত ভঙ্গিতে প্রশ্ন করল, আপনার সেল নম্বরটা পেতে পারি?
কুসুমকলি এবার স্বতঃস্ফূর্তভাবে শক্ত হয়ে গেল। নিজের আবেগ সামাল দিয়ে হেসে দেয়। হালকা হাসির অর্থ আমি সেল নম্বর কাউকে দিই না। মুখ ফুটে বলেও ফেলল, নিজের সেল নম্বর কাউকে দিই না আমি। তবে আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে, আপনার সেল নম্বরটা চাইতে পারি আমি। দেবেন?
মাহিন লজ্জিত হয়েও জ্বলে ওঠে। অপমানবোধ করার সুযোগ পেল না ও। কুসুমকলি সেই অপমানবোধের সুযোগ দেয়নি। বরং পালটা ফোন নম্বর চেয়ে ওর আবদার পরোক্ষভাবে মেনে নিয়েছে, বুঝতে পারল মাহিন। ও নিজের নম্বর বলতে থাকে। কুসুমকলি নিজের সেটে নম্বরটা স্টোর করে নেয়। মিষ্টি করে হাসে মাহিন। হাসি লেগে আছে কুসুমের ঠোঁটেও। মাহিন আর দাঁড়ায়নি। ‘আসি’ বলে সামনে এগোতে থাকে।

কুসুমকলি এবার ডায়েরি নেড়েচেড়ে দেখে। এমন সময় নিজের সেটের রিংটোন বেজে ওঠে। রিয়ার কল। কল অ্যাটেন্ড করে কুসুম।
কিরে, কোথায় তুই? এখনো আসছিস না কেন?
নিউমার্কেটে আছি। তোর জন্য ডায়েরি কিনছি।
ডায়েরি কিনছিস, নাকি হ্যান্ডসাম ছেলে দেখে বেড়াচ্ছিস?
হাসিমুখের প্রশ্ন। তবুও প্রশ্নটি ধাক্কা দেয় কুসমকে। তাই তো, ছেলে দেখেই তো বেড়াচ্ছিলাম। মনে মনে ভাবে, রিয়া জানল কীভাবে! একেই কি তবে বলে টেলিপ্যাথি?
কিরে, কথা বলছিস না কেন? রাগ করলি?
না। রাগ করিনি। তুই ঠিকই বলেছিস। এজন্য একটু ভড়কে গিয়েছিলাম।
ভড়কানোর কিছু নেই। ইদানীং মেয়েরাও ছেলে দেখে বেড়ায়। এটা জেনারেশনের দাবি, সহজে মেনে নিতে হবে।
লেকচার বাদ দে। কেন কল করলি, বল।
মামণিকে অন্যরকম লাগছে। আমি যে পালিয়ে গিয়েছিলাম কিছুই মনে করতে পারছে না। একদম স্বাভাবিক। আবার একদম অস্বাভাবিক। ওই সময়ের কোনো কথা মনে নেই তার।
বলিস কী?
হ্যাঁ। তুই চলে আয়। মামণিকে ডাক্তারের কাছে নিতে হবে।
তুই অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে রাখ। বিকেলে আন্টির সঙ্গে আমিও যাব চেম্বারে।
আচ্ছা। বলেই রিয়া লাইন কেটে দেয়।

কুসুমকলির মনে কোনো জড়তা নেই। শঙ্কা নেই। তার নিশ্চিত বিশ্বাস, আন্টি ভালো হয়ে যাবেন। সব কাজে আস্থাশীল কুসুম হঠাৎ আনমনা হয়ে গেল। রিয়ার জন্য খারাপ লাগে। নিজেকে অন্যভাবে গড়ে তুলেছিল রিয়া। মেধা, রূপ এবং এক্সটা কারিকুলার ফিল্ডে অসাধারণ রিয়ার ভক্ত কম নয়। এই রিয়া হঠাৎ এমন কাণ্ড করল! এখন চারপাশের ঝামেলা চেপে ধরছে নিজেদের।

মাহিন বখাটে না। দেখেই বোঝা গেছে। বুয়েট-পড়ুয়া ছেলে বখাটে হতে পারে না। ভেবেছিল কোনো ছেলের সঙ্গে কখনো ফোনে কথা বলবে না। এ ভাবনা সফল হবে মনে হচ্ছে না। মাহিনকে ফোন করতে ইচ্ছা করছে। কেন ইচ্ছা হচ্ছে জানে না কুসুম।

নিউমার্কেটের মাঝের গলিতে হাঁটতে হাঁটতে মোবাইল ফোনসেটের ডিসপ্লে থেকে মাহিনের নাম বের করে ও। বের করেই নামের দিকে তাকিয়ে থাকে। অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকে। ইচ্ছা হচ্ছে ইয়েস বাটনে চাপ দিতে। ইচ্ছা থামিয়ে ঘাড়ে ঝোলানো ক্যাজুয়াল ব্যাগের মধ্যে ঢুকিয়ে রাখে সেলফোন।

অপ্রতিরোধ্য ইচ্ছার লাগাম টেনে ধরতে পেরেছে কুসুম। নিজের সাফল্যে মুগ্ধ ও। নিজেকে বাহবা দিলো। বাহবা বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারল না। হাত চলে গেল ব্যাগের ভেতর। আবার সেলফোন বের করে। ‘মাহিন’ নামটির দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকে।

নিজের মনের গোপন টানে কী যে হয়! ইয়েস বাটনে চাপ দিয়ে সেট চোখের সামনেই ধরে থাকে। কল হচ্ছে। এক...দুই...তিন...চার... কয়েক সেকেন্ড চলে গেছে। কল চলছে। এখনো অ্যাটেন্ড করেনি অপরপক্ষ। বুক ধকধক করছে। কুসুম ঘেমে যাচ্ছে। কল অ্যাটেন্ড করেছে মাহিন। ডিসপ্লে মনিটরে দেখা যাচ্ছে, সেকেন্ডের গতি অন হয়েছে... বিশ সেকেন্ড চলে গেছে। সে কানের কাছে নিয়ে এলো সেট।
হ্যালো, মাহিন বলছি।
কুসুম চুপ। জবাব দিচ্ছে না।
হ্যালো। কে বলছেন, প্লিজ? মাহিন সহজ স্বরে জানতে চায়।
কুসুম লাইন কেটে দিলো।
কথা বলতে ইচ্ছা হয়েছিল। ইচ্ছাটা আবারও চেপে ধরে ও। নিজেকে আটকাল। আটকিয়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে সেট আবারও ব্যাগের ভেতর চালান করে দিলো।

সামনে এগোতে লাগল কুসুম। নিউমার্কেটের পুবদিকের গেট দিয়ে বেরোতে হবে। ওইদিকে এগোচ্ছে ও। পায়ে গতি দ্রুত হচ্ছিল। আবার গতি কমে গেছে। ধীরে ধীরে হাঁটছে এখন। চোখ বারবার ক্যাজুয়াল ব্যাগের দিকে যাচ্ছে। ওইখানে আছে নিজের সেলফোন সেট।

মনে হচ্ছিল কল ব্যাক হবে। মনে হচ্ছিল মাহিনের কল আসবে। আসছে না। আসুক। মন তা চায়। মনের চাওয়া পূর্ণ হচ্ছে না।
অভিমানী হয়ে ওঠে মন। খারাপ হতে থাকে মন। এ কী দুর্গতি মনের! মন খারাপ হচ্ছে কেন! কষ্ট হচ্ছে কেন? বড় করে একটা শ্বাস টেনে বুক খালি করে শ্বাসটা ছেড়ে দিলো কুসুমকলি। বুকে চাপ কম লাগছে এখন। তবে খারাপ ভাবটা যাচ্ছে না। কেন ব্যাক কল আশা করছে ও? নিজেই তো কথা বলেনি। কেন বলেনি? কেন আবার ফিরতি কল আশা করছে! ইচ্ছাকৃত নিজের মাথা একবার ঝাঁকি দিলো ও। চিন্তা সরে যাচ্ছে না। নিজেকে চেপে রাখছে প্রশ্নের পাথর। পাথর সরাতে পারছে না কুসুমকলি।
এক কিশোর সামনে দিয়ে যাচ্ছে। ‘পেপার পেপার’ বলে পথচারীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছে।
মুহূর্তের সিদ্ধান্তে কুসুম বলল, এই পেপারওয়ালা! এদিকে এসো।
ছেলেটা সামনে এসে দাঁড়াল।
একটা দাও।
কী পেপার লইবেন আফা?
হ্যাঁ। তাই তো! কী পেপার? মাহিন কোন পেপার বুকে জড়িয়ে ধরেছিল? ভালো করে খেয়াল করেনি কুসুম। ছেলেটার সহজ প্রশ্নেই বিমূঢ় হয়ে গেল ও।
না। থাক। পেপার লাগবে না। তুমি যাও। কুসুম কথা শেষ করেও দাঁড়িয়ে রইল।
কিশোর হকার আর দাঁড়াল না। সময় নেই তার প্রতিক্রিয়া দেখার। সময় নেই তর্ক করার। কাজই তার প্রধান দায়িত্ব। যত বেশি বিক্রি তত লাভ। অন্য পথচারীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে ছোটে সে সামনে।

ফলের ব্যাগ বাঁ হাতে ধরা। ডায়েরিটাও ফলের ব্যাগে ঢুকিয়ে রেখেছে। নেটের ব্যাগ দুই আঙুলের মাথায় ধরে রেখেছিল। আঙুলে চাপ পড়েছে। লাল হয়ে গেছে। একটু ব্যথা হচ্ছে। ব্যাগ পাশে রেখে সড়কের ওপরই দাঁড়াল ও। সামনে তাকিয়ে দেখে এক তরুণী ক্ষুব্ধ চোখে তাকিয়ে আছে তার পাশে চলমান সঙ্গী-পুরুষটার দিকে। পুরুষটা তাকিয়ে আছে ওর দিকেই। সামনে হাঁটছে। তবুও ঘাড় ঘুরিয়ে দেখছে ওকে।

কুসুমকলি মনে মনে বলল, পাশের দিকে তাকা। ব্যাটা আমাকে দেখছিস কেন? পাশের জনও তো সুন্দরী। ওকে দেখ।
মুখ বাঁকিয়ে আচমকা একটা খ্যামটা মারে ও।
পুরুষটা বারবার দেখছে ওকে। কী আছে এমন দেখার!
চট করে মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়াল কুসুমকলি। পাশে সুন্দরী রেখেও অন্য মেয়ের দিকে তাকায় পুরুষের দল। তাকাতেই থাকে। বিরক্তিকর!
হঠাৎ মনে পড়ল মুনার কথা। মুনা বলেছিল, তাকাক না। যত পারে তাকাক। বিরক্ত হব কেন? এনজয় করব। গণচোখের গণচাউনি টানতে পারছি। টেনে টেনে ওদের চোখ লম্বা করে দেবো। নো প্রবলেম।
কথাটা মনে হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসল কুসুমকলি। রাস্তায় দাঁড়িয়ে একা একা হাসছে। একা হাসি দেখছে অনেকে। সেদিকে খেয়াল নেই কুসুমের। একা হাসির সময় গোপন কথা ভাবতে থাকে মানুষ। গোপন কথার গোপন হাসি ফুটে ওঠে মুখে। অন্যকে খেয়াল করার সময় থাকে না। বোধ থাকে না চারপাশের। জানে ও।

এ সময় আকস্মিক সামনে এসে দাঁড়াল মাহিন। মাহিনের দিকে চোখ তুলে তাকাল কুসুমকলি। অবাক হয়। খুশিও। ভেবেছিল মাহিন ওকে কেয়ার করেনি। গুরুত্ব দেয়নি। কল ব্যাক করেনি! মন ছোটো হয়ে গিয়েছিল। আবার মন ভালো হয়ে গেল এ মুহূর্তে।

ভেবেছিলাম আপনি চলে গেছেন। কুসুমকলি অল্প হাসিমুখে বলল।
হ্যাঁ। নিউমার্কেট থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলাম। অপরিচিত নম্বর থেকে মিসকল পেলাম। চট করে মনে হয়েছিল কলটা আপনার। মনে হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আবার ভেতরে এসেছি। খুঁজতে খুঁজতে এখানে পেয়ে গেলাম আপনাকে। আপনিই কি কল করেছিলেন?
কেন মনে হলো আমার কল?
মাহিন বলল, জানি না। মনে হলো। মন তো কত কিছু ভাবে। বলতে বলতে নিজের ফোনসেটের মিসকল ফোকাস করে ইয়েস বাটনে চাপ দিল সে। কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে কুসুমকলির ফোনসেটের রিংটোন বেজে উঠল।

হেসে উঠল কুসুম।
হেসে উঠল মাহিন।
দুই হাসির মধ্যে অদ্ভুত এক মিলন ঘটে গেল।
দুজনার কেউ খেয়াল করতে পারল না এ হাসি-বন্ধনের অপরূপ দৃশ্য। অদ্ভুত শিহরণ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে মাহিন। দাঁড়িয়ে থাকে কুসুম। এ দাঁড়ানোর অর্থ জানা নেই ওদের। ওরা জানল না কোনো এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা পড়ে গেছে ওদের সর্বস্ব।

চলবে...

এসইউ/জিকেএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]