সুখী মানুষের প্লেটে কী থাকে? জানলে অবাক হবেন
প্রতীকী ছবি, এআই দিয়ে বানানো
মন খারাপ, অস্থিরতা কিংবা সারাদিনের ক্লান্তি এসবের কারণ আমরা অনেক সময় শুধু মানসিক চাপেই খুঁজি। কিন্তু আধুনিক গবেষণা বলছে, এর পেছনে বড় ভূমিকা রাখতে পারে আমাদের প্রতিদিনের খাবার। বিজ্ঞানীদের মতে, আমাদের অন্ত্র ও মস্তিষ্কের মধ্যে রয়েছে নিবিড় যোগাযোগ ব্যবস্থা, যাকে বলা হয় গাট–ব্রেইন অ্যাক্সিস। সহজ ভাষায়, আপনি যা খান সেটাই প্রভাব ফেলে আপনার মেজাজ, ঘুম এমনকি মানসিক স্থিতিশীলতার ওপর। তাই সুখী ও ইতিবাচক থাকতে চাইলে নজর দিতে হবে নিজের প্লেটের দিকেও।
পাকস্থলী ভালো তো মনও ভালো
আমাদের অন্ত্রে বাস করে অগণিত উপকারী ব্যাকটেরিয়া। এরা শুধু খাবার হজমই করে না, তৈরি করে সেরোটোনিন ও ডোপামিনের মতো গুরুত্বপূর্ণ হরমোন। এই হরমোনগুলোই আমাদের আনন্দ, প্রশান্তি ও আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে অন্ত্রের স্বাস্থ্য ঠিক থাকলে মনও থাকে হালকা ও স্থির।
খাবারই হতে পারে প্রাকৃতিক মুড বুস্টার
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত ফল, শাকসবজি, পূর্ণ শস্য ও মানসম্মত প্রোটিন গ্রহণ মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। এসব খাবার শরীরে প্রদাহ কমায় এবং ইতিবাচক অনুভূতি বাড়ায়। অর্থাৎ, সঠিক খাদ্যাভ্যাস অনেক ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক অ্যান্টিডিপ্রেসেন্টের মতো কাজ করতে পারে।
মেডিটেরিয়ান ডায়েট কেন সুখের সঙ্গে যুক্ত
বিশ্বজুড়ে মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে আলোচিত খাদ্যাভ্যাসগুলোর একটি হলো মেডিটেরিয়ান ডায়েট। এতে থাকে প্রচুর ফল ও শাকসবজি, মাছ, বাদাম, ডাল, অলিভ অয়েল এবং পরিমিত দুগ্ধজাত খাবার। অন্যদিকে কমানো হয় ভাজা খাবার, প্রক্রিয়াজাত মাংস, অতিরিক্ত মিষ্টি ও সফট ড্রিঙ্কস। গবেষণায় দেখা গেছে, এই ডায়েট মানসিক ক্লান্তি ও বিষণ্নতার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে।
প্রোবায়োটিকস: মনের নীরব সহযোদ্ধা
দই, টক দুধ, কিমচি কিংবা কম্বুচার মতো ফারমেন্টেড খাবার অন্ত্রের ভালো ব্যাকটেরিয়া বাড়ায়। এর ফলে শরীরের প্রদাহ কমে এবং মানসিক প্রশান্তি বাড়ে। নিয়মিত এসব খাবার খেলে মুড স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করে।
দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন-

- ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড: তেলতেলে মাছ, আখরোট, চিয়া বীজ
- ম্যাগনেশিয়াম: বাদাম, বিভিন্ন বীজ, পালং শাকসহ গাঢ় সবুজ শাক
- ফোলেট ও ভিটামিন বি: ডিম, কলা, ডালজাত খাবার
- আয়রন ও জিংক: সামুদ্রিক মাছ, কলিজা, মটরশুঁটি
এই উপাদানগুলো মস্তিষ্কে শক্তি জোগায়, ক্লান্তি কমায় এবং মনোযোগ ধরে রাখতে সাহায্য করে।
যেসব খাবার মন খারাপের কারণ হতে পারে
অতিরিক্ত ক্যাফেইন, অ্যালকোহল, প্যাকেটজাত ও অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার, চিনি ও পরিশোধিত ময়দা শরীরে প্রদাহ বাড়ায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে মেজাজ ও মানসিক ভারসাম্যে।
সচেতনভাবে খান, তাতেই মিলবে শান্তি
শুধু পেট ভরানোর জন্য নয়, মন দিয়েও খাবার খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। কী খাচ্ছেন, কখন খাচ্ছেন এ বিষয়ে সচেতন হলে হজম ভালো হয় এবং শরীর নিজেই জানিয়ে দেয় কতটুকু খাবার তার প্রয়োজন।
একসঙ্গে খাওয়ায় আছে সুখের সূত্র
বন্ধু বা পরিবারের সঙ্গে বসে খাবার খাওয়া শুধু সামাজিকতা নয়, এটি মানসিক স্বাস্থ্যেরও যত্ন। একসঙ্গে খাওয়ার সময় মস্তিষ্কে নিঃসৃত হয় অক্সিটোসিন, যা সুখ ও নিরাপত্তাবোধ বাড়াতে সাহায্য করে।
ছোট অভ্যাসেই বড় পরিবর্তন
পুরো খাদ্যাভ্যাস একদিনে পাল্টানোর দরকার নেই। ধীরে শুরু করুন প্রতিদিন এক বাটি ফল, বাইরের খাবারের বদলে ঘরের রান্না, সফট ড্রিঙ্কের জায়গায় লেবু পানি বা হারবাল চা। এই ছোট পরিবর্তনই সময়ের সঙ্গে বড় প্রভাব ফেলবে।
আরও পড়ুন:
- খাবারেই লুকিয়ে আছে কিডনি সুরক্ষার চাবিকাঠি
- ভাত না রুটি, ওজন কমাতে ভরসা রাখবেন কিসে?
- ফাস্ট ফুডের যুগেও শিশুর প্লেটে সবজি রাখার কৌশল
মনের যত্ন শুরু হোক প্লেট থেকে
মানসিক সুস্থতা শুধু ওষুধ বা থেরাপির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর বড় অংশ জুড়ে আছে খাদ্যাভ্যাস। তাই খাবারের তালিকায় রাখুন রঙিন ফল, তাজা সবজি, স্বাস্থ্যকর ফ্যাট ও পর্যাপ্ত পানি।
সর্বোপরি মন ভালো রাখতে চাইলে প্রথম যত্নটা নিন আপনার নিজের প্লেট থেকেই। খান পুষ্টিকর, খান সচেতনভাবে আর দিনটা শুরু করুন এক চিলতে হাসি নিয়ে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি লাইফস্টাইল
জেএস/