ভাত না রুটি, ওজন কমাতে ভরসা রাখবেন কিসে?
ভাত আর রুটি এই দুই খাবার আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকার অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবু এদের নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। কারও কাছে ভাত হালকা ও আরামদায়ক, আবার কারও মতে রুটি বেশি পুষ্টিকর ও দীর্ঘক্ষণ পেট ভরিয়ে রাখে। অনেকেই নিজের অভ্যাস অনুযায়ী একটিকে ‘ভালো’ আর অন্যটিকে ‘খারাপ’ বলে ধরে নেন।
কিন্তু বাস্তবতা হলো খাবারের পছন্দ কেবল অভ্যাসে সীমাবদ্ধ নয়। হজমক্ষমতা, অন্ত্রের স্বাচ্ছন্দ্য আর ওজন কমানোর লক্ষ্য এই তিনটি বিষয় এখন মানুষ আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়ে ভাবছে। তাই প্রশ্নটা আরও জোরালো হচ্ছে ভাত আর রুটির মধ্যে আসলে কোনটি হজমে সহজ? আর কোনটি ওজন কমানোর পরিকল্পনায় বেশি মানানসই? চলুন বিষয়টি খোলাসা করে দেখা যাক।
হজমের দিক থেকে ভাত-রুটি পার্থক্য
ভাত ও রুটির তুলনায় হজমের প্রশ্নটাই সাধারণত আগে আসে। সাদা ভাত খুব সহজে হজম হয়, কারণ এতে তুষ বা আঁশের স্তর থাকে না। পেটের ওপর চাপ কম পড়ে, ফলে যাদের অ্যাসিডিটি, গ্যাস, পেট ফাঁপা বা হজমের দুর্বলতা রয়েছে, তাদের জন্য ভাত তুলনামূলকভাবে আরামদায়ক। ভাত দ্রুত ভেঙে যায় এবং হজমের জন্য শরীরকে বেশি পরিশ্রম করতে হয় না।
অন্যদিকে, রুটি তৈরি হয় গমের আটা দিয়ে, যেখানে আঁশের পরিমাণ ভালোই থাকে। এই আঁশ অন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী এবং মলত্যাগ নিয়মিত রাখতে সাহায্য করে। তবে আঁশ বেশি থাকার কারণে রুটি হজম হতে সময় নেয় এবং দীর্ঘক্ষণ পেটে থাকে। যাদের হজমশক্তি সংবেদনশীল, তাদের ক্ষেত্রে রুটি কখনো কখনো ভারী লাগতে পারে।
গ্লাইসেমিক সূচক ও রক্তে শর্করার প্রভাব
অনেকের ধারণা, ভাত খেলেই রক্তে শর্করা হঠাৎ বেড়ে যায়, আর রুটি তুলনামূলক নিরাপদ। কিন্তু ‘ইন্ডিয়ান জার্নাল অব এন্ডোক্রিনোলজি অ্যান্ড মেটাবলিজম’ এ প্রকাশিত ২০২০ সালের এক গবেষণা বলছে, পরিমিত পরিমাণে খাওয়া হলে সাদা ভাত ও গমের রুটির গ্লাইসেমিক সূচক প্রায় একই মাত্রার মধ্যে থাকে।
পুষ্টিবিদদের মতে, আসল পার্থক্য তৈরি করে খাবারের পরিমাণ, সঙ্গে কী খাওয়া হচ্ছে এবং রান্নার ধরন। রুটিতে থাকা আঁশ গ্লুকোজের শোষণ ধীরে করে, ফলে রক্তে শর্করার ওঠানামা তুলনামূলক কম হয়। ভাতে আঁশ কম হলেও এটি প্রাকৃতিকভাবে গ্লুটেনমুক্ত এবং অনেক মানুষের শরীর এটি সহজে গ্রহণ করতে পারে।
ওজন কমাতে কোনটি এগিয়ে?
ওজন কমানোর প্রশ্নে ভাত বা রুটিকে এককভাবে দোষী করার সুযোগ নেই। কোন খাবার খেলেই ওজন বাড়বে বা কমবে এমন সরল সমীকরণ আসলে কাজ করে না। ওজন নির্ভর করে মোট ক্যালোরি গ্রহণ, সার্বিক খাদ্যাভ্যাস এবং পরিমাণ নিয়ন্ত্রণের ওপর। শুধু কার্বোহাইড্রেট বাদ দিলেই ওজন কমবে এই ধারণা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়।
আরও পড়ুন:
রুটি খেলে অনেকের পেট দীর্ঘক্ষণ ভরা থাকে, কারণ এতে আঁশ বেশি। ফলে পরের বেলায় অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা কমতে পারে। আবার অনেকে ভাত খেলে নিজেকে হালকা ও স্বস্তিতে অনুভব করেন, যার ফলে স্বাভাবিকভাবেই কম খাওয়া সম্ভব হয়। সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন ভাত বা রুটি অতিরিক্ত পরিমাণে খাওয়া হয়, বিশেষ করে পর্যাপ্ত সবজি ও প্রোটিন ছাড়া।
ভাত আর রুটির মধ্যে কোনটি ‘ভালো’ বা ‘খারাপ’ এই প্রশ্নের একটাই উত্তর নেই। আপনার শরীর যেটা ভালোভাবে হজম করতে পারে, যেটা খেলে আপনি তৃপ্ত থাকেন এবং পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন ওজন কমানোর জন্য সেটিই সবচেয়ে কার্যকর। খাবারের ধরন নয়, বরং ভারসাম্য, সচেতনতা আর সংযমই আসল চাবিকাঠি।
তথ্যসূত্র: ইন্ডিয়ান জার্নাল অব এন্ডোক্রিনোলজি অ্যান্ড মেটাবলিজম
জেএস/