অন্তর্বর্তী সরকার ১৭ মাস

সড়ক-রেল-নৌ ও আকাশপথ দুর্ঘটনায় ১৩ হাজার ৪০৯ জন নিহত

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৫:১৭ পিএম, ০৬ জানুয়ারি ২০২৬
সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন সেভ দ্য রোডের মহাসচিব শান্তা ফারজানা/ছবি-সালাহ উদ্দীন

অন্তর্বর্তী সরকারের ১৭ মাসে সড়ক, রেল, নৌ ও আকাশপথে দুর্ঘটনায় ১৩ হাজার ৪০৯ জন নিহত হয়েছেন। মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) সেভ দ্য রোডের মহাসচিব শান্তা ফারজানা ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন মিলনায়তনে এসব তথ্য জানান।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সড়কপথে চরম নৈরাজ্য-বিশৃঙ্খলা আর আইন না মেনে বাহন চলাচলের কারণে ছোট-বড় মোট ৫৭ হাজার ৭৯৬টি দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ৫৮ হাজার ৪৯১ এবং নিহত হয়েছেন ১২ হাজার ৬৯৪ জন। অন্তর্বর্তী সরকারের এই ১৭ মাসে সড়কে নেমেছে প্রায় ২ লক্ষাধিক মোটরসাইকেল ও ৫ লক্ষাধিক অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশা।

ঢাকাসহ সারাদেশে ১৩ হাজার ৮২৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ১৩ হাজার ৮৩২ ও নিহত হয়েছেন ২ হাজার ৬৩৮ জন। সেই সঙ্গে উল্টোপথের বাহন হিসেবে ব্যাপক সামালোচিত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, নসিমন, করিমন, পিকআপসহ এই শ্রেণির বাহনে ২১ হাজার ৬৩১ টি দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ২৩ হাজার ৬০৩ ও নিহত ৩ হাজার ৬৪৮ জন।

নির্ধারিত গতিসীমা না মেনে, বিশ্রাম না নিয়ে টানা ১২ থেকে ২০ ঘণ্টা বাহন চালানোসহ নির্ধারিত ট্রাফিক আইনসহ প্রয়োজনীয় নিয়ম না মানায় ১২ হাজার ৭৪৬টি বাস দুর্ঘটনায় আহত ১১ হাজার ৬৯৭ এবং নিহত হয়েছেন ৩ হাজার ৭৮৪ জন। ট্রাক-লরিসহ ভারী মালবাহী বাহনে নিয়ম না মেনে দ্রুতগতি ও অতিরিক্ত মালামাল বহনের কারণে ৮ হাজার ৯৬৮ দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ৯৩৫৯ এবং নিহত ২ হাজার ৬২৪জন; যার অধিকাংশই পথচারী বা স্থানীয় নাগরিক।

প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়, সেভ দ্য রোডের চেয়ারম্যান মো. আখতারুজ্জামান, প্রতিষ্ঠাতা ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান মোমিন মেহেদী, মহাসচিব শান্তা ফারজানা, ভাইস চেয়ারম্যান বিকাশ রায়, সোনিয়া দেওয়ান প্রীতি, সাংগঠনিক সম্পাদক মহিদুল মল্লিকসহ সংশ্লিষ্ট গবেষণা সেল সদস্যদের তত্ত্বাবধানে ১৭টি জাতীয় দৈনিক, ২০টি টিভি-চ্যানেল, ২২টি নিউজ পোর্টাল এবং স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী-সেভ দ্য রোডের স্বেচ্ছাসেবী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের দেওয়া তথ্যানুসারে এই প্রতিবেদন দুর্ঘটনামুক্ত পথ-এর লক্ষ্যে তৈরি করা হয়েছে।

আকাশ-সড়ক-রেল ও নৌপথ দুর্ঘটনামুক্ত করার জন্য সচেতনতা-গবেষণা ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সেভ দ্য রোডের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সড়কে চরম নৈরাজ্য-আইন না মানার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। যা ক্রমশ সড়কে দুর্ঘটনা যেমন বৃদ্ধি করছে, তেমন আহত এবং নিহতের সংখ্যাও বাড়াচ্ছে।

সড়ক-রেল-নৌ ও আকাশপথ দুর্ঘটনায় ১৩ হাজার ৪০৯ জন নিহত

সেভ দ্য রোডের দাবি অনুযায়ী প্রতি ৩ কিলোমিটারে পুলিশ বুথ বা ওয়াচ টাওয়ার স্থাপন না করা ও হাইওয়ে পুলিশসহ জেলা-উপজেলা পর্যায়ের পুলিশ-প্রশাসনের দায়িত্বে অবহেলার কারণে সড়কপথে গত ১৭ মাসে ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে ৪১১টি, এতে ডাকাতদের হামলায় আহত ২৫৭ এবং নিহত হয়েছেন দুইজন।

এছাড়াও নৌ, সড়ক ও রেলপথে নারী শ্লীলতাহানির ঘটনা ঘটেছে ৮২৫টি, ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ১৫টি। যার অধিকাংশই থানা-পুলিশের শরণাপন্ন হয়নি বলে প্রত্যক্ষদর্শী ও সেভ দ্য রোডের স্বেচ্ছাসেবীদের তথ্যে উঠে এসেছে। নৌপথে কোস্টগার্ড ও নৌপুলিশের দায়িত্ব অবহেলার সুযোগে অন্যান্য বছরের তুলনায় ডাকাতি বেড়েছে। ২১৬টি ডাকাতির ঘটনায় সর্বশেষ ১৮৮ জন আহত ও ১ জন নিহত হয়েছেন।

এছাড়াও সড়ক-রেল ও নৌপথে প্রতিনিয়ত ছিনতাইয়ের ঘটনা বেড়েই চলছে। গত ১৭ মাসে সারাদেশে ১৭ হাজার ৪১২টিরও বেশি ছিনতাই ঘটনা ঘটেছে বলেও জানানো হয় এই প্রতিবেদনে।

আরও জানানো হয়, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত- নৌপথে ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে ২০৫২টি। আহত ১৭৫৪ জন, নিহত হয়েছেন ১৮৭ জন এবং নিখোঁজ আছেন ৪৬ জন; রেলপথে ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে ১১০৬টি। আহত হয়েছেন ১০৭৬ জন, নিহত হয়েছে ৪৯২ জন; আকাশপথে একটি দুর্ঘটনায় ৩৬ জন নিহত এবং ১৭২ জন আহত হন। সেই সাথে বিমানবন্দরের কর্মরতদের হয়রানি, নির্যাতন ও হেনস্তার শিকার হয়েছেন ১৭ জন।

নতুন করে বছর বছর দাবি বা সুপারিশ উপস্থাপন না করে, সেভ দ্য রোড গত ১৮ বছর যাবৎ সড়কপথ দুর্ঘটনামুক্ত করতে ৭ দফা দাবি নিয়ে কাজ করছে।

৭ দফা

১. মিরসরাই ট্রাজেডিতে নিহত অর্ধশত শিক্ষার্থীর স্মরণে ১১ জুলাইকে ‘দুর্ঘটনামুক্ত পথ দিবস’ ঘোষণা ও পঞ্চম শ্রেণি থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পাঠ্যবইয়ে সড়ক, রেল, নৌ ও আকাশপথে চলাচলের নিয়ম-নীতি যুক্ত করতে হবে।

২. ৩ কিলোমিটার অন্তর পুলিশ বুথ স্থাপন, প্রতিটি সড়ক সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা, সড়ক প্রশস্ত করার পাশাপাশি ফুটপাত দখলমুক্ত করে যাত্রীদের চলাচলের সুবিধা দিতে হবে।

৩. সড়ক পথে ধর্ষণ-হয়রানি রোধে ফিটনেস বিহীন বাহন নিষিদ্ধ এবং কমপক্ষে অষ্টম শ্রেণি উত্তীর্ণ ও জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যতীত চালক-সহযোগী নিয়োগ ও হেলপার দিয়ে পরিবহন চালানো বন্ধে সংশ্লিষ্ট সবাইকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

৪. সড়ক-নৌ-রেল ও আকাশপথ দুর্ঘটনায় নিহতদের কমপক্ষে ১০ লাখ ও আহতদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত ও ৩ লাখ টাকা সরকারিভাবে দিতে হবে।

৫. ‘ট্রান্সপোর্ট ওয়ার্কার্স রুল’ বাস্তবায়নের পাশাপাশি সত্যিকারের সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে ‘ট্রান্সপোর্ট পুলিশ ব্যাটালিয়ন’ বাস্তবায়ন করতে হবে।

৬. পথ দুর্ঘটনার তদন্ত ও সাজা ত্বরান্বিত করণের মধ্য দিয়ে সতর্কতা তৈরি করতে হবে এবং ট্রান্সপোর্ট পুলিশ ব্যাটালিয়ন গঠনের পূর্ব পর্যন্ত হাইওয়ে পুলিশ, নৌ পুলিশসহ সংশ্লিষ্টদের আন্তরিকতা-সহমর্মিতা-সচেতনতার পাশাপাশি সকল পথের চালক-শ্রমিক ও যাত্রীদের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। সকল পরিবহন চালকের লাইসেন্স থাকতে হবে।

৭. ইউলুপ বৃদ্ধি, পথ-সেতুসহ সংশ্লিষ্ট সকল মন্ত্রণালয়ে দুর্নীতি প্রতিরোধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। যেন ভাঙা পথ, ভাঙা সেতু আর ভাঙা কালভার্টের কারণে আর কোনো প্রাণ দিতে না হয়।

‘সেভ দ্য রোড-এর অঙ্গীকার পথ দুর্ঘটনা থাকবে না আর...’ স্লোগানকে সামনে রেখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি থেকে ২০০৭ সালের ১৪ আগস্ট প্রাথমিক ও ২৮ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে পথচলা শুরু করে আকাশ-সড়ক-রেল ও নৌপথ দুর্ঘটনামুক্ত করার জন্য স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সেভ দ্য রোড।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন সেভ দ্য রোডের চেয়ারম্যান মো. আখতারুজ্জামান, প্রতিষ্ঠাতা ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান মোমিন মেহেদী, মহাসচিব শান্তা ফারজানা, ভাইস চেয়ারম্যান বিকাশ রায়, সোনিয়া দেওয়ান প্রীতি, সমাজসেবী ও পথবন্ধু আনিসুর রহমান মাস্টার, সাংগঠনিক সম্পাদক মহিদুল মল্লিক।

এসইউজে/এমআরএম/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।