নতুন সংস্করণে যাচ্ছে সরকারি ৩৬ হাজার ওয়েবসাইট
এগারো বছর পর নতুন সংস্করণে (ভার্সন) যাচ্ছে জাতীয় তথ্য বাতায়নে থাকা সরকারি দপ্তরের ৩৬ হাজার ৪শ ওয়েবসাইট। মানুষের তথ্য প্রাপ্তির সুবিধার্থে ২০১৪ সালের পর মন্ত্রণালয় থেকে ইউনিয়ন পর্যন্ত এ ওয়েবসাইটগুলো আর আপডেট হয়নি। যে কারণে অনেক সময় পুরোনো তথ্য অনুসন্ধানকারীদের বিভ্রান্তি তৈরি করে।
প্রযুক্তির উৎকর্ষতার এ যুগে ওয়েবসাইটগুলোর সফটওয়্যার আপডেট না করায় হঠাৎ ডাউন হওয়া, একটি নির্দিষ্ট সীমার বেশি ভিজিটর প্রবেশ করতে না পারা, সহজে পরিবর্তন আনতে না পারাসহ নানান সমস্যা ছিল। এছাড়া আগের ভার্সনের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও দুর্বল ছিল। তাই প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশনার আলোকে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
নতুন ভার্সনে এসব সমস্যা সমাধান ছাড়াও বাড়তি সুবিধা পাওয়া যাবে। ধাপে ধাপে সফটওয়্যার আপগ্রেডেশনের কাজ হচ্ছে। সফটওয়্যার উন্নয়নের জন্য মাঝেমধ্যে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের ওয়েবসাইট ডাউন পাওয়া যাচ্ছে, প্রবেশ করা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন অ্যাসপায়ার টু ইনোভেটের (এটুআই) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
তারা আরও জানান, আগামী মাসের মধ্যে সফটওয়্যার আপগ্রেডেশনের কাজ সম্পন্ন হবে। এর পেছনে মাত্র তিন কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে।
আগে তথ্য বাতায়নের ওয়েবসাইটগুলো মনোলিথিক ফ্রেমওয়ার্কে ছিল। এর মানে হলো, এটার কোথাও পরিবর্তন আনলে সফওয়্যারের পুরো কোডের ওপর পরিবর্তনটা চলে আসতো। এখন আমরা নতুন ভার্সনে মাইক্রো সার্ভিস কাঠামোতে নিয়ে এসেছি। এখন সুনির্দিষ্টভাবে যদি কোথাও সমস্যা হয়, ওইটুকু নিষ্ক্রিয় হলেও বাকিটা সচল থাকবে।-এটুআইয়ের পরামর্শক মনিরুজ্জামান
তবে সরকারি পোর্টাল ব্যবহারকারীরা জানান, ওয়েবসাইটগুলো উন্নত প্রযুক্তিতে নেওয়া হচ্ছে এটা ভালো। তবে সরকারি পোর্টালের তথ্য আপডেট থাকে না, এটা অনেক দিনের সমস্যা। প্রযুক্তি যতই উন্নত করা হোক, ওয়েবসাইটে তথ্য দিতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অনীহা থাকলে এটি খুব বেশি মানুষের উপকারে আসবে না।
আরও পড়ুন
শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পথে ‘বড় হুমকি’ অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি
প্রাথমিকে ফের নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি, উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা
এলসি জটিলতায় এলপিজি সংকট, ‘ঘি ঢালছেন’ ডিলার-খুচরা বিক্রেতা
বরাদ্দ অনিশ্চয়তায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভোটকেন্দ্র প্রস্তুতে ‘অনীহা’
জাতীয় তথ্য বাতায়ন এটুআই প্রোগ্রামের অধীনে একটি সমন্বিত সরকারি ওয়েব পোর্টাল, যেখানে দেশের সব সরকারি দপ্তর (মন্ত্রণালয়, বিভাগ, জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন) তাদের তথ্য ও সেবা দেওয়ার জন্য একটি সাধারণ প্ল্যাটফর্মে যুক্ত থাকে। এর মাধ্যমে জনগণের তথ্য প্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত এবং সরকারি সেবা সহজে পাওয়া যায়। একই সঙ্গে এটি সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত এবং ডিজিটাল সেবা প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
অ্যাসপায়ার টু ইনোভেটের (এটুআই) হেড অব প্রোগ্রাম ম্যানেজমেন্ট আব্দুল্লাহ আল ফাহিম জাগো নিউজকে বলেন, ‘তথ্য বাতায়নের সার্ভার আপডেট হচ্ছে। শিডিউল করে এগুলো আপডেট করা হচ্ছে, কোনটা কখন বন্ধ থাকবে সেটা শিডিউল করে এটা করা হচ্ছে। ডাটা মাইগ্রেশনের কারণে কিছু কিছু সমস্যা হতে পারে।’
৩৬ হাজার ৪শ ওয়েবসাইটেই সাইট অ্যাডমিন আছে। আমরা শুধু কারিগরি দিকটি দেখি। কিন্তু এতে কী কী কনটেন্ট থাকবে, সেটি ওই সংশ্লিষ্ট অফিসের বিষয়।-এটুআইয়ের জুনিয়র কনসালট্যান্ট মাসরুর মোহাম্মদ শান্ত
তিনি বলেন, ‘সরকারি পোর্টালগুলো নিয়ে যে তথ্য বাতায়ন এটা ২০১৪ সালে ডেভেলপ করা হয়। এরপর আর এ সিস্টেমের আপগ্রেডেশন হয়নি। এখন পোর্টালগুলো নতুন ভার্সনে নতুন প্রযুক্তিতে আনা হচ্ছে।’
এটুআইয়ের পরামর্শক (ন্যাশনাল পোর্টাল) মো. মনিরুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা ক্লাস্টার ওয়াইজ ওয়েবসাইটগুলো আপডেট ভার্সনে নিয়ে যাচ্ছি। রোববার প্রায় এক হাজারের মতো অধিদপ্তর/দপ্তরের ওয়েবসাইট নতুন ভার্সনে নিয়ে এসেছি।’
জাতীয় তথ্য বাতায়নের অধীনে ৩৬ হাজার ৪শ দপ্তরের ওয়েবসাইট রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা প্রথমে মন্ত্রণালয়গুলোর ওয়েবসাইট দিয়ে শুরু করেছি, মন্ত্রণালয়গুলোর আপগ্রেডের কাজ ইতোমধ্যে হয়ে গেছে। এরপর আমাদের দূতাবাসগুলোর ওয়েবসাইটগুলো করেছি। শিক্ষাবোর্ডসহ ফল প্রকাশের সাইটগুলো নতুন ভার্সনে নেওয়ার কাজ শেষ হয়েছে। এরপর অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটগুলো করা হচ্ছে।’
‘এরপর আমরা বিভাগ ও জেলাগুলোর সরকারি দপ্তরের ওয়েবসাইটের দিকে যাচ্ছি। অনেকগুলো বিষয় বিবেচনায় রেখে ওয়েবসাইট আপগ্রেডেশনের কাজ হচ্ছে।’
এ পরামর্শক আরও বলেন, ‘পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী ফেব্রুয়ারির মধ্যে সরকারি যত অফিসের ওয়েবসাইট আছে আমরা নতুন ভার্সনে নিয়ে আসবো আশা করছি।’
যেসব সুবিধা পাওয়া যাবে নতুন ভার্সনে
এটুআইয়ের পরামর্শক মনিরুজ্জামান বলেন, ‘আগে তথ্য বাতায়নের ওয়েবসাইটগুলো মনোলিথিক ফ্রেমওয়ার্কে ছিল। এর মানে হলো, এটার কোথাও পরিবর্তন আনলে সফওয়্যারের পুরো কোডের ওপর পরিবর্তনটা চলে আসতো। এখন আমরা নতুন ভার্সনে মাইক্রো সার্ভিস কাঠামোতে নিয়ে এসেছি। এখন সুনির্দিষ্টভাবে যদি কোথাও সমস্যা হয়, ওইটুকু নিষ্ক্রিয় হলেও বাকিটা সচল থাকবে।’
তিনি বলেন, ‘আরেকটা সুবিধা হলো ডাটাবেজ ডিস্ট্রিবিউটেড থাকে, একসঙ্গে ডাটাবেজে সব হিট পড়বে না। বিভিন্ন জায়গা ও ক্যাশ থেকে রেসপন্সটা আসবে। এসে ওয়েবসাইটে গতি আসবে, ডাউন টাইমটা কম থাকবে।’
‘এছাড়া আগের ভার্সনে নিরাপত্তা ব্যবস্থাটা দুর্বল ছিল, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতো। এখন আরও ওই জিনিসটা হবে না। নিরাপত্তা ব্যবস্থাটা জোরদার হয়েছে।’
মনিরুজ্জামান আরও বলেন, ‘এছাড়া নতুন ভার্সনটাকে আমরা খুব দ্রুত অন্য জায়গায় নিয়ে যেতে পারবো। আগের সফটওয়্যারে ওয়েবসাইটগুলো ১৮টি ভাগে ভাগ করা ছিল, এখন পুরোটাকে আমরা একটি জায়গায় নিয়ে এসেছি।’
এটুআইয়ের জুনিয়র কনসালট্যান্ট (ন্যাশনাল পোর্টাল) মাসরুর মোহাম্মদ শান্ত বলেন, ‘নতুন সাইটের সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে, এখন ডায়নামিকভাবে যে কোনো কন্টেন্ট উপস্থাপন করা যাবে।’
মাঝেমধ্যেই দেখা দিচ্ছে সমস্যা
এটুআই সংশ্লিষ্টরা জানান, সফটওয়্যার আপগ্রেডের কারণে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের ওয়েবসাইটে মাঝে মধ্যেই সমস্যা দেখা দিচ্ছে। তারা বলছেন, সফটওয়্যারের ভার্সন পরিবর্তনের কারণে অনেক ওয়েবসাইট ডাউন পাওয়া যাচ্ছে। আবার কিছুক্ষণ পর দেখা যাচ্ছে।
গত কিছুদিন ধরেই বিভিন্ন ওয়েবসাইটে প্রবেশে সমস্যা দেখা যাচ্ছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে গত ১২ জানুয়ারি বিকেলের দিকে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রবেশ করা যাচ্ছিল না।
এ বিষয়ে পরামর্শক মনিরুজ্জামান বলেন, দ্রুত সাড়া পেতে আমরা দুই ধরনের ক্যাশ ব্যবহার করেছি, ‘একটা ক্যাশ ফেল করছিল। এটা থেকে সমস্যা সৃষ্টি হওয়ায় ওয়েবসাইটগুলো ডাউন হয়ে যায়। পরে এটি সমাধান করা হয়।’
এটিআইয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে জানান, নতুন সার্ভারে যাওয়ার কারণে সরকারি ওয়েবসাইটগুলো বন্ধ হচ্ছে, আবার চালু হচ্ছে। গত ১২ জানুয়ারি বিকেলের দিকে হঠাৎ অনেকগুলো ওয়েবসাইট ডাউন হয়ে যায়। অবশ্য ১০ মিনিটের মধ্যে সেগুলোর বেশিরভাগ আবার ফিরেও আসে। এমনকি এটুআইয়ের সাইটও এর আগে ছয় ঘণ্টার মতো বন্ধ ছিল।
তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে পিছিয়ে
জাতীয় তথ্য বাতায়নে অনেক মন্ত্রণালয়-বিভাগ ও আওতাধীন দপ্তর এবং সংস্থার ওয়েবসাইট নিয়মিত হালনাগাদ করা হয় না- এমন অভিযোগ অনেক দিনের। এতে তথ্য পাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে জনগণ। অনেক পোর্টালে কয়েক বছর আগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নাম-পদবি এখনো রয়ে গেছে। বিভিন্ন সময়ে এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে নির্দেশনাও দেওয়া হয়।
সবশেষ গত বছরের এপ্রিল মাসে ওয়েবসাইটগুলো হালনাগাদ রাখার নির্দেশনা দিয়ে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সিনিয়র সচিব এবং সচিবকে চিঠি দেয় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। ওই চিঠিতে বলা হয়, জাতীয় তথ্য বাতায়নে অনেক মন্ত্রণালয়/বিভাগ ও আওতাধীন দপ্তর/সংস্থার ওয়েবসাইট নিয়মিত হালনাগাদ করা হচ্ছে না। বিশেষ করে কর্মকর্তাদের নাম, পদবি, মোবাইল নম্বর, টেলিফোন নম্বর, ছবি ও দাপ্তরিক ই-মেইলসহ প্রয়োজনীয় তথ্যাবলি ওয়েবসাইটে যথাযথভাবে প্রদর্শিত হচ্ছে না।
এ অবস্থায় মন্ত্রণালয়/বিভাগ এবং আওতাধীন দপ্তর ও সংস্থার ওয়েবসাইটে সব কর্মকর্তার প্রয়োজনীয় তথ্যাবলিসহ অন্য তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অনুরোধ জানানো হয় ওই চিঠিতে।
এ বিষয়ে এটুআইয়ের জুনিয়র কনসালট্যান্ট মাসরুর মোহাম্মদ শান্ত জাগো নিউজকে বলেন, ‘৩৬ হাজার ৪শ ওয়েবসাইটেই সাইট অ্যাডমিন আছে। আমরা শুধু কারিগরি দিকটি দেখি। কিন্তু এতে কী কী কনটেন্ট থাকবে, সেটি ওই সংশ্লিষ্ট অফিসের বিষয়।’
২০০৬ সালে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) অর্থায়নে ‘অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) প্রোগ্রাম’। প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় অক্টোবর ২০০৬ সালে এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ছিল এর বাস্তবায়নকারী সংস্থা। তথ্যপ্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে বৈষম্যহীন, অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের লক্ষ্য সামনে রেখে এ প্রকল্পটি নেওয়া হয়। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ এ প্রকল্পের তত্ত্বাবধান করছে।
‘কাউকে পেছনে ফেলে নয়’ এই স্লোগান ধারণ করে, এটুআই ধীরে ধীরে এর কর্মকাণ্ড ও অগ্রাধিকার খাতগুলো বিস্তৃত করেছে। ২০২০ সালে প্রকল্পটির নাম পরিবর্তন করে ‘অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন’র পরিবর্তে ‘অ্যাসপায়ার টু ইনোভেট’ রাখা হয়।
আরএমএম/এএসএ/এমএফএ/জেআইএম