৩৪ বছর পর গণভোট, চলছে ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারণা

মনিরুজ্জামান উজ্জ্বল
মনিরুজ্জামান উজ্জ্বল মনিরুজ্জামান উজ্জ্বল , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০৯:৩০ এএম, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন একইসঙ্গে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে, ছবি: সংগৃহীত

 

৩৪ বছর পর দেশে আবারও গণভোট হতে যাচ্ছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন একইসঙ্গে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দেশে গণভোট করতে যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে প্রচার চালানোর সিদ্ধান্তও নিয়েছে ৫ আগস্ট জুলাই আন্দোলনের পর গঠিত এই সরকার।

আইন বিশেষজ্ঞরা এতে সরকারের নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ন হতে পারে বলে মন্তব্য করলেও এতে কোনো বাধা দেখছে না নির্বাচন কমিশন (ইসি)। যদিও রিটার্নিং কর্মকর্তারা ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের পক্ষে কোনো ধরনের প্রচার চালাতে পারবেন না বলে জানিয়েছে সাংবিধানিক সংস্থাটি।

গণভোটের প্রশ্ন

ক) নির্বাচনকালীন সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে।

খ) আগামী সংসদ হবে দুই কক্ষ বিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ জন সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে।

গ) সংসদে নারীর প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে যে ৩০টি প্রস্তাবে জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য হয়েছে সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাধ্য থাকবে।

ঘ) জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে।

‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে ব্যাপক জনমত গঠন

প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে রাজনৈতিক সংস্কারের অংশ হিসেবে চারটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রশ্নে জনগণের মতামত নেওয়ার লক্ষ্যে এ গণভোট আয়োজন করা হচ্ছে। আসন্ন গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে ব্যাপক জনমত গঠন ও ভোট প্রদানে উৎসাহিত করতে রাজধানীসহ সারাদেশে সরকারিভাবে জোরালো প্রচার-প্রচারণা চালানো হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারীরাও মাঠে নেমেছেন ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে জনমত তৈরিতে। শুধু সরকারই নয়, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রায় সব রাজনৈতিক দলই প্রকাশ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

হ্যাঁ ও না, দুই পক্ষেই বলার অধিকার সবার

আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল বলেছেন, গণভোটে হ্যাঁ-এর পক্ষে বলার অধিকার যেমন সবার আছে, না-এর পক্ষে বলার অধিকারও সবার আছে। ১৫ জানুয়ারি রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, কেউ যদি মনে করেন শেখ হাসিনার আমলের শাসনব্যবস্থা, বৈষম্য ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ধারাবাহিকতা বজায় থাকা উচিত, তাহলে তিনি ‘না’-এর পক্ষে অবস্থান নিতে পারেন। সরকার কারও প্রচারণা বন্ধ করতে চায় না, এমন কোনো ইচ্ছাও নেই।তবে মাঠপর্যায়ে প্রচারণার চিত্র ভিন্ন, এমন অভিযোগও উঠছে।

শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ায় শাহ সৈয়দ আহমদ গেছুদারাজ (রহ.) এর মাজার জিয়ারত শেষে সাংবাদিকদের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, নির্বাচন নিয়ে কোনো শঙ্কা নেই। নির্বাচন খুব ভালোভাবে হবে। পুরো পৃথিবীতেই সরকার গণভোট নিয়ে পক্ষ নেয়। কখনো ‘হ্যাঁ’এর পক্ষ নেয়, কখনো ‘না’ এর। যারা গণভোট নিয়ে সমালোচনা করছেন, তাদের জানার পরিধি কম। মূলত সংস্কারের সমষ্টিগত প্যাকেজ গণভোট। আমাদের তো সংস্কারের পক্ষে দেশের অপশাসন দূর করতে হবে। যাতে এ দেশে অপশাসন অথবা স্বৈরাচার ফিরে না আসে কিংবা শেখ হাসিনার মতো শাহি দৈত্যদানব না হয়, সে জন্য গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে হবে। চুরিচামারি বন্ধ করতে হলে হ্যাঁ ভোটের পক্ষ নিতে হবে। যেহেতু এই সরকার সংস্কারের পক্ষে, তাই ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে কথা বলছে।

বিএনপির অবস্থান: সংস্কারের পক্ষে ‘হ্যাঁ’

দেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল বিএনপিও গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খান বলেন, আমরাই সবার আগে সংস্কারের দাবি তুলেছি। গণভোটে হ্যাঁ ভোট দেবো, এটাই আমাদের সিদ্ধান্ত। সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি একথা বলেন।

২৭০ আসনে ‘হ্যাঁ’ ভোটের অ্যাম্বাসেডর থাকছে এনসিপির

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয় নিশ্চিত করতে আসনভিত্তিক কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। যেসব আসনে দলের প্রার্থী রয়েছে, সেখানে প্রার্থীর নেতৃত্বে প্রচারণা চলবে। আর যেখানে প্রার্থী নেই, সেসব ২৭০ আসনে অ্যাম্বাসেডর নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
দলটির দাবি, এ উদ্যোগের মাধ্যমে সারাদেশে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে সমন্বিত জনমত গড়ে উঠবে।

অন্তর্বর্তী সরকারের জোরালো প্রচারণা

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে সবচেয়ে বিস্তৃত ও সংগঠিত প্রচারণা চালাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার। এর মধ্যে রয়েছে, উপদেষ্টাদের জেলা সফর, সরকারি দপ্তর ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ব্যানার, ব্যাংক শাখায় বাধ্যতামূলক প্রচার, এনজিও ও উন্নয়ন সংস্থাকে নির্দেশনা, স্কুল-কলেজ-মাদরাসার শিক্ষকদের মাধ্যমে প্রচার, জুমার খুতবা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে আলোচনা, পোশাক কারখানা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রচারণা এবং প্রধান উপদেষ্টার ফেসবুক পেজে ভিডিও ও ফটোকার্ড প্রকাশ।

এর আগেও গণভোট হয়েছিল

বাংলাদেশে এর আগেও গণভোট হয়। ১৯৭৭ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে রাষ্ট্রপতির নেতৃত্বের প্রতি আস্থা বিষয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। সে সময় সরকারি হিসাবে প্রায় ৯৯ শতাংশ ভোট ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে আসে।

১৯৮৫ সালে রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদের আমলে শাসনব্যবস্থার প্রতি সমর্থন বিষয়ে গণভোট হয়। সরকার বিপুল ‘হ্যাঁ’ ভোটের দাবি করলেও বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ ছিল ব্যাপক কারচুপির।

এরপর ১৯৯১ সালে তৃতীয় গণভোট হয়। রাষ্ট্রপতি শাসন থেকে সংসদীয় গণতন্ত্রে মানুষ ফিরতে চায় কি না তা নিয়ে গণভোট হয়। সে সময় ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছিল ৮৪ শতাংশ।

এমইউ/এসএনআর

 

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।