পরিবেশ রক্ষার বদলে ‘ধ্বংসের আয়োজন’ করেই চললো নির্বাচনি প্রচারণা
পরিবেশ রক্ষায় এবার রাজধানী ঢাকায় কাগজের পোস্টার নিষিদ্ধ করেছিল নির্বাচন কমিশন (ইসি)। কিন্তু প্রার্থীরা যে পরিমাণে পিভিসি, রেক্সিন, অপচনশীল কাপড় ও অন্য প্লাস্টিকের ব্যানার-ফেস্টুন ব্যবহার করেছেন তাতে পরিবেশের দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের প্রচারণা শেষ হচ্ছে আগামীকাল মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ৭টায়। রাজধানী ঢাকার সড়ক, অলিগলি ছেয়ে আছে প্লাস্টিকের ব্যানার-ফেস্টুনে। পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর অপচনশীল পিভিসিসহ অন্য প্লাস্টিক ব্যবহার করেই নির্বাচনি প্রচারণা চালাচ্ছেন প্রার্থীরা।

নির্বাচনি প্রচারের শুরুতে পরিবেশ সচেতনতায় পোস্টার ব্যবহার না করাসহ বেশ কিছু নির্দেশনা দিয়েছিল নির্বাচন কমিশন (ইসি)। কিন্তু এসব নির্দেশনা তেমন বাস্তবায়ন হয়নি। নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণায় প্লাস্টিকের ব্যানার, ফেস্টুনের ব্যাপক ব্যবহার হয়েছে। অনেক আসনে পিভিসি ও অন্যান্য প্লাস্টিক সামগ্রীর ব্যবহার চোখে পড়েছে। গাছে না টাঙানোর নিষেধাজ্ঞাও মানা হয়নি। গাছ কেটে কাগজ তৈরি হলেও সেটা পচনশীল। কিন্তু এই প্লাস্টিকের ব্যানার-ফেস্টুন সহজে মাটিতে মিশবে না। ড্রেনেজ ব্যবস্থাকেও অকেজো করে দিতে পারে। আবার কাঠের ফ্রেম করেই এসব টাঙানো হয়েছে। এতে পরিবেশ রক্ষা না ধ্বংসের দিকে গেলো সেটা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন।
নির্বাচনে পোস্টার বন্ধের উদ্যোগটি বেশ ভালো হয়েছে। কিন্তু এখন বিভিন্ন আসনে পিভিসি বা প্লাস্টিকের তৈরি ব্যানার ব্যবহারের যে খবর পাওয়া যাচ্ছে, তা অত্যন্ত দুঃখজনক। এখানে কমিশনের পর্যবেক্ষণে ঘাটতি রয়েছে।-বাপা সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির
তবে প্রার্থীদের অনেকের দাবি, নির্বাচন কমিশন ব্যানার বানাতে যে আকৃতির কাপড়ের কথা বলেছে, এমন সাইজের কাপড় বাজারে সহজে পাওয়া যায় না। তাই বাধ্য হয়ে অনেক প্রার্থী পিভিসি ও অন্য প্লাস্টিক সামগ্রী ব্যবহার করছেন।

গত ১০ নভেম্বর রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের জন্য আচরণবিধিতে সংশোধন এনে গেজেট জারি করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নতুন আচরণবিধিতে বলা হয়, আগামী নির্বাচন থেকে ভোটের প্রচারণায় রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা কোনো ধরনের পোস্টার ব্যবহার করতে পারবেন না। কারণ, প্রতিটি নির্বাচনে বিপুল পরিমাণ ব্যানার, ফেস্টুন ও পোস্টার ব্যবহার হয়। পরে সেগুলোর বড় অংশ বর্জ্য হয়ে নদী-নালা ও খাল-বিলে গিয়ে পরিবেশের ক্ষতি করে।
রাজধানীর বর্জ্য অপসারণ করে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। সংস্থা দুটির সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে ঢাকা শহরে প্রায় ১৭ হাজার টন প্লাস্টিকের ব্যানার, পোস্টার অপসারণ করে ডিএনসিসি ও ডিএসসিসি। এবারও যে পরিমাণ ব্যানার টাঙানো হয়েছে, বর্জ্যের পরিমাণ কম হবে না।
সরেজমিনে যা দেখা গেলো
ওই আচরণবিধিমালায় (২০২৫) বলা হয়, অপচনশীল দ্রব্য, যেমন রেক্সিন, পলিথিন ও প্লাস্টিক, তথা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর এরূপ কোনো উপাদান দিয়ে তৈরি প্রচারপত্র, ব্যানার, লিফলেট বা হ্যান্ডবিল, ফেস্টুন ও ব্যানার ব্যবহার করা যাবে না। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট নির্বাচনি এলাকায় অবস্থিত গাছ, বিদ্যুৎ ও টেলিফোনের খুঁটিতে কোনো ধরনের ব্যানার-ফেস্টুন টাঙানো যাবে না।
বর্ষা মৌসুমে নগরের ড্রেনে পলিথিন, প্লাস্টিকের বিভিন্ন কিছু আটকে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। তাই ডিএনসিসি এলাকায় সংসদ সদস্য প্রার্থীদের টাঙানো পিভিসির ব্যানার-পোস্টার যাতে কোনোভাবেই সিটি করপোরেশনের ড্রেন, নালায় না যায় এ বিষয়ে ডিএনসিসির সংশ্লিষ্টদের বলবো।-ডিএনসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা কমডোর মোহাম্মদ হুমায়ুন কবীর
তবে ঢাকা-৬, ঢাকা-১১, ঢাকা-১২, ঢাকা-১৭ সহ বিভিন্ন আসনের অধিকাংশ প্রার্থীর কাপড়ের পোস্টার, ফেস্টুন গাছ, বিদ্যুতের খুঁটিতে সাঁটানো দেখা গেছে। আবার এসব আসনে শত শত পিভিসি, রেক্সিন বা অন্য প্লাস্টিকের তৈরি ব্যানার-পোস্টারও ঝুলতে দেখা গেছে।

ঢাকা-১৭ আসনের নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান, দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর স ম খালিদুজ্জামানসহ ১২ জন সংসদ সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তারা প্রতীক বরাদ্দের পর থেকে বনানী, গুলশান, ক্যান্টনমেন্ট ও ভাষানটেকের প্রায় সব অলি-গলিতে নির্বাচনি ফেস্টুন, ব্যানার টানিয়েছেন। এসব ফেস্টুন ও ব্যানারের অধিকাংশই পিভিসির তৈরি।
মহাখালী কাঁচাবাজার থেকে ওয়্যারলেস পর্যন্ত সড়কটির দৈর্ঘ্য প্রায় এক কিলোমিটার। রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) সকালে দেখা যায়, ওই সড়কে তারেক রহমানসহ অন্য প্রার্থীদের শতাধিক ব্যানার, পোস্টার টাঙানো। এসব ব্যানার বা পোস্টারের অধিকাংশই পিভিসির। এর মধ্যে যে কয়েকটি সাদা কাপড়ের ব্যানার-পোস্টার রয়েছে, সেগুলোর ওপর ধুলাবালির আস্তরণ।
এখন নির্বাচনের শেষ পর্যায়। এখন যে কারও বিরুদ্ধে অধিদপ্তর বা নির্বাচন কমিশন ব্যবস্থা নেবে, কারও কিছু করারও নেই। এখন প্রচারণা একেবারে শেষ পর্যায়ে। এগুলো খুলতে গেলে সমস্যা হবে। তাই এখন অধিদপ্তর বা পুলিশ থেকে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই। তবে শুরু থেকেই কমিশন আরও খেয়াল রাখলে ভালো হতো।-পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক জিয়াউল হক
মহাখালীর কলম্বিয়া মার্কেটের সামনে সড়ক বিভাজকের ওপর বড় আকারের (প্রায় ১০ ফুট দৈর্ঘ্য, পাঁচ ফুট প্রস্থ) পিভিসির একটি ব্যানার কাঠের ফ্রেমে টাঙিয়েছেন কাঁঠাল প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী কামরুল হাসান নাসিম। সাদা-কালো ওই ব্যানারের পাশেই কৃষ্ণচূড়া ও দেবদারু গাছের ডালে পিভিসির ব্যানার টাঙিয়েছেন জামায়াতের প্রার্থী স ম খালিদুজ্জামান। একইভাবে গুলশান-১, গুলশান-২, কড়াইল বস্তি, বনানী, সৈনিক ক্লাব, ভাষানটেকের বিভিন্ন জায়গায় পিভিসির তৈরি হাজারো ব্যানার-পোস্টার দেখা গেছে।
তেজগাঁও, হাতিরঝিল ও শেরেবাংলা নগর—এ তিনটি থানা এলাকা নিয়ে ঢাকা-১২ সংসদীয় আসনটি গঠিত। এ আসনে এবার মোট প্রার্থী ১৫ জন, যা দেশের ৩০০টি আসনের মধ্যে একক কোনো আসনে প্রার্থীর হিসাবে সবচেয়ে বেশি। এই ১৫ জন প্রার্থীর মধ্যে একই নামে আছেন তিনজন। অর্থাৎ ওই তিন প্রার্থীর নামের কমন অংশ ‘সাইফুল’। তাদের পুরো নাম সাইফুল আলম নীরব, সাইফুল হক ও সাইফুল আলম খান মিলন। এর মধ্যে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে সাইফুল আলম খান মিলন, ফুটবল প্রতীকে স্বতন্ত্র প্রার্থী (বিএনপির বিদ্রোহী) সাইফুল আলম নীরব ও কোদাল প্রতীকে বিএনপি জোটের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির প্রার্থী হয়েছেন সাইফুল হক।

ভোটাররা বলছেন, ওই আসনে তিন সাইফুলই শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী। প্রতীক বরাদ্দের পর থেকে তারা প্রচারণা শুরু করেছিলেন। এখন পুরো সংসদীয় আসনে তাদের ব্যানার-পোস্টারে ছেয়ে গেছে। তবে তেজগাঁও, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, হাতিরঝিল, মধুবাগে টাঙানো এসব ব্যানারের অধিকাংশই পিভিসির তৈরি। অধিকাংশই টাঙানো হয়েছে বৈদ্যুতিক খুঁটি, গাছের ডালে। এছাড়া তাদের তিনজনকেই কাঠের ফ্রেমের ওপর পিভিসির তৈরি বড় বড় রঙিন পোস্টার সড়কের গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে ঝোলাতে দেখা গেছে।
পুরান ঢাকার সূত্রাপুর, গেন্ডারিয়া, বংশাল, ওয়ারী থানা এলাকা নিয়ে ঢাকা-৬ আসন গঠিত। এ আসনে নির্বাচনে আলোচনার তুঙ্গে ধানের শীষের প্রার্থী ইশরাক হোসেন ও দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী মো. আব্দুল মান্নান। তারা দুজনই ওই আসনের বিভিন্ন এলাকায় পিভিসির তৈরি রঙিন পোস্টার টাঙিয়েছেন।
জানতে চাইলে মো. আব্দুল মান্নান জাগো নিউজকে জানান, তিনি কোথাও পিভিসির তৈরি ব্যানার টাঙাননি। রিটার্নিং কর্মকর্তাকে অবগত করে নিয়মের মধ্য থেকেই বেশ কয়েকটি স্থানে রঙিন বিলবোর্ড টাঙিয়েছেন। রঙিন বিলবোর্ডের বিষয়ে ইসির সুনির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা ছিল না।
রামপুরা-বাড্ডা এলাকায় ঢাকা-১১ আসনে বিএনপির প্রার্থী এম এ কাইয়ুম ও জামায়াত জোট থেকে এনসিপির প্রার্থী নাহিদ ইসলামের বড় বড় পিভিসি ব্যানার দেখা গেছে সড়কজুড়ে। এছাড়া কাপড়ের ব্যানার তো আছেই।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির জাগো নিউজকে বলেন, ‘নির্বাচনে পোস্টার বন্ধের উদ্যোগটি বেশ ভালো হয়েছে। কিন্তু এখন বিভিন্ন আসনে পিভিসি বা প্লাস্টিকের তৈরি ব্যানার ব্যবহারের যে খবর পাওয়া যাচ্ছে, তা অত্যন্ত দুঃখজনক। এখানে কমিশনের পর্যবেক্ষণে ঘাটতি রয়েছে। এখনো সময় আছে, অভিযান চালিয়ে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার। যাতে ভবিষ্যতে কেউ তা করতে না পারে।’
ব্যানার-পোস্টার অপসারণে যা বলছে সিটি করপোরেশন
ডিএসসিসিতে ৭৫টি ও ডিএনসিসিতে ৫৪টি ওয়ার্ড নিয়ে রাজধানী ঢাকা শহর গঠিত। এ শহরে সংসদীয় আসন ১৮টি। এসব আসনে নির্বাচনের পর ব্যানার-পোস্টার অপসারণের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের।
জানতে চাইলে ডিএনসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা কমডোর মোহাম্মদ হুমায়ুন কবীর জাগো নিউজকে বলেন, ‘বর্ষা মৌসুমে নগরের ড্রেনে পলিথিন, প্লাস্টিকের বিভিন্ন কিছু আটকে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। তাই ডিএনসিসি এলাকায় সংসদ সদস্য প্রার্থীদের টাঙানো পিভিসির ব্যানার-পোস্টার যাতে কোনোভাবেই সিটি করপোরেশনের ড্রেন, নালায় না যায় এ বিষয়ে ডিএনসিসির সংশ্লিষ্টদের বলে দেবো।’
যা বলছে পরিবেশ অধিদপ্তর
এবারের নির্বাচনে ব্যানার, পোস্টার ব্যবহার বন্ধে বেশ কয়েক মাস আগেই নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়েছিল পরিবেশ অধিদপ্তর। তার পরিপ্রেক্ষিতেই নির্বাচন কমিশন এবারের নির্বাচনে পোস্টার ব্যবহার বন্ধের নির্দেশনা দেয়। কিন্তু তারপরও পিভিসির তৈরি ব্যানার-পোস্টার লাগানোয় হতাশা প্রকাশ করেছেন পরিবেশ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্টরা।
পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক জিয়াউল হক জাগো নিউজকে বলেন, ‘এখন নির্বাচনের শেষ পর্যায়। এখন যে কারও বিরুদ্ধে অধিদপ্তর বা নির্বাচন কমিশন ব্যবস্থা নেবে, কারও কিছু করারও নেই। এখন প্রচারণা একেবারে শেষ পর্যায়ে। এগুলো খুলতে গেলে সমস্যা হবে। তাই এখন অধিদপ্তর বা পুলিশ থেকে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই। তবে শুরু থেকেই কমিশন আরও খেয়াল রাখলে ভালো হতো।’
এমএমএ/এএসএ