এমপিদের বাসযোগ্য করতে সংস্কার চলছে ক্ষতিগ্রস্ত সেই ভুতুড়ে ন্যাম ভবন
নগরীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের ন্যাম ভবনের নিচতলায় মরিচা ধরা খাট-সোফার কাঠের ওপরের অংশ ঘষামাজা করছেন মো. মিরাজ। এই কাজে তাকে দৈনিক মজুরি হিসেবে ৭০০ টাকা দেওয়া হবে। মিরাজ বলেন, এমপিরা থাকবেন। তাই সোফা, খাট, আলমারির কাজ করছি।
পাশেই দেখা গেল কেউ ন্যাম ভবনের নিচের অংশ ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করছেন।
রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, শেরেবাংলা নগরের মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে রয়েছে ছয়টি ভবন। সবখানে চলছে কর্মযজ্ঞ। নয়তলা বিশিষ্ট প্রতিটি ভবনে ৩৬টি ফ্ল্যাট রয়েছে। মোট ২১৬টি ফ্ল্যাটের সংস্কার করা হচ্ছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নতুন সংসদ সদস্যদের গেজেট হওয়ার একদিন পর অর্থাৎ, শনিবার থেকে শুরু হয়েছে সংস্কার। ছয়টি ভবনে এক হাজারের ওপরে শ্রমিক সংস্কার কাজ করছে।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এক সময় মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের পাশে ‘সংসদ সদস্য ভবনগুলোতে’ ছিল অন্যরকম চিত্র। এসব ভবনে বাস করতেন সংসদ সদস্য ও তাদের পরিবার। এসব ভবনেই এমপি-মন্ত্রীদের আত্মীয়-স্বজন ছাড়াও বিভিন্ন তদবির নিয়ে গ্রাম থেকে ছুটে আসতেন নেতাকর্মীরা। মানুষের আনাগোনা লেগেই থাকত। বিকেলে শিশুদের খেলাধুলা, হৈ-হুল্লোড় ও কোলাহল বিরাজ করতো। তবে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বদলে যায় চিত্র। চকচকে এই এলাকায় এখন নীরবতা, রাত হলে যা ভুতুড়ে রূপ নেয়। তবে, নতুন এমপিদের গেজেট হওয়ার পর ফের প্রাণ ফিরে পেয়েছে এই আঙিনা। ৫ আগস্টের ঘটনায় ন্যাম ভবনের দরজা, জানালা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব দরজা নতুনভাবে সংস্কার করা হচ্ছে।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, ফ্ল্যাটের টিভি, ফ্রিজ, খাটের তোশকসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী চুরি হয়েছে। যেগুলো রয়েছে তা ব্যবহারের উপযোগী না। ফ্ল্যাটের দেওয়ালে নতুন করে রঙের আঁচড় দেওয়া হচ্ছে। মেঝে ঘষামাজা করা হচ্ছে। টিভি, ফ্রিজ, এসি, ফ্যান, লাইট, ওয়াশরুম, বাথরুমে নতুন করে ফিটিংস স্থাপন করা হচ্ছে। এক মাসের মধ্যেই ফ্ল্যাটগুলোর সমস্ত কাজ সম্পন্ন করতে চান সংশ্লিষ্টরা।

ন্যাম ভবনের ম্যানেজার আরিয়ান বলেন, আমরা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করছি। ফ্ল্যাটগুলো দীর্ঘদিন অব্যবহৃত ছিল। তাই ব্যবহারের উপযোগী করা হচ্ছে। অনেক জায়গায় জানালা-দরজা ভাঙা, সেগুলো নতুন করে স্থাপন করা হচ্ছে। এক কথায় ফ্ল্যাটে যা কিছু লাগে সবকিছুর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। আগের খাট-সোফা যদি ব্যবহারের উপযোগী করা যায় সেটা করা হচ্ছে। আর যেগুলো উপযোগী না সেগুলো কেনা হচ্ছে। আমাদের হাতে সময় নাই।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঢাকায় আন্তর্জাতিক সংগঠন জোট-নিরপেক্ষ আন্দোলন বা নন-অ্যালায়েন্ড মুভমেন্টের (ন্যাম) সম্মেলনকে কেন্দ্র করে নব্বইয়ের দশকের শেষদিকে ‘ন্যাম ভবন’ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। মূলত এই সম্মেলনের অতিথিদের থাকার জন্য রাজধানীর তিনটি এলাকা- মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, নাখালপাড়া ও মিরপুরে তৈরি করা হয় এসব ভবন। পরবর্তী সময়ে অষ্টম জাতীয় সংসদে ‘ন্যাম ভবনের’ সব ফ্ল্যাট সংসদ সদস্যদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়।
এর মধ্যে শেরেবাংলা নগরের মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে রয়েছে ছয়টি ভবন, যেখানে ফ্ল্যাট রয়েছে ২৪০টি। এসব ফ্ল্যাটে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নামেমাত্র ভাড়া দিয়ে থাকতেন এমপিরা। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, গত ৫ আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের দিন দুপুর থেকেই পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে কোনো রকমে সেখান থেকে নিরাপদ গন্তব্যে চলে যান মন্ত্রী-এমপিদের স্বজনরা। অবশ্য সংসদ অধিবেশন না থাকায় অধিকাংশ এমপি আগে থেকেই নিজ এলাকায় অবস্থান করছিলেন। সরকার পতনের খবরের পর ছাত্র-জনতা সংসদ ভবন, গণভবনে ভাঙচুর চালানোর পাশাপাশি এসব ভবনেও ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। এখন সব জায়গায় চলছে মহাকর্মযজ্ঞ।
ফার্নিচার পুনঃমেরামত, দেওয়ালে রং করা হচ্ছে। এমপিদের ব্যবহারের সব কাজও হচ্ছে। খাট, তোশকের কভার, জানালা, দরজার পর্দা সংযোজনের কাজ চলছে।
ন্যাম ভবনে কর্মরত গণপূর্তের লিস্টেড পলিশ মিস্ত্রি মাসুদ হাওলাদার জাগো নিউজকে বলেন, খাট-ফার্নিচারের আগের রং উঠিয়ে নতুন রং দেওয়া হচ্ছে। ওনারা (এমপি) আসবেন, তাই সবকিছু ওয়াশ-মেরামত করা হচ্ছে। এগুলো অনেক দিন পড়ে ছিল। মোটামুটি এক মাসের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করতে হবে। সব জায়গায় অনেক ময়লা।
ফ্ল্যাটের রুম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রুমের ওয়াল রং করা হচ্ছে। ফ্লোর পরিষ্কার করা হচ্ছে। সব কাজ করে আমরা কমপ্লিট করবো। এমপিদের বাসযোগ্য করতে সব কাজ করা হবে।
এমওএস/এএমএ