‘আব্বা, ওই যে তারেক রহমান’, শিশু রাফানের উচ্ছ্বাসে ঐতিহাসিক মুহূর্ত
মঙ্গলবার, বিকেল আনুমানিক সোয়া ৪টা। শেষ বিকেলের আলো নরম হয়ে নেমে এসেছে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজাজুড়ে। সারি সারি আসনে বসে আমন্ত্রিত অতিথিরা—কেউ স্থির, কেউ অস্থির। সবার চোখে একধরনের প্রতীক্ষা। কখন আসবেন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী, কখন শুরু হবে শপথের আনুষ্ঠানিকতা—এই অপেক্ষায়ই যেন সময় ধীরে এগোচ্ছে।
হঠাৎ মাইকে ঘোষণা ভেসে আসে—মহামান্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে শপথবাক্য পাঠ করাবেন।
ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশে নড়াচড়া। কেউ সোফা ছেড়ে দাঁড়ান, কেউ সামনে তাকিয়ে গলা বাড়ান। পেছন দিক থেকে ভেসে আসে বিনীত অনুরোধ—‘আপনারা দাঁড়ালে তো আমরা দেখতে পাই না, দয়া করে বসুন।’
আনুষ্ঠানিকতার এই সুশৃঙ্খল আবহে আচমকাই এক টুকরো স্বতঃস্ফূর্ততা, একটি শিশুকণ্ঠ— ‘আব্বা, ওই যে তারেক রহমান!’
মুহূর্তের জন্য আশপাশের শব্দ যেন স্তব্ধ। কয়েকটি মুখ ঘুরে যায় শব্দের উৎসের দিকে। মায়ের কোলে বসা ছয়-সাত বছরের রাফান—চোখ বিস্ময়ে বড় বড়, আঙুল তুলে দেখাচ্ছে অদূরের জায়ান্ট স্ক্রিন। স্ক্রিনে তখন শপথবাক্য পাঠ করছেন তারেক রহমান।
উপস্থিত অনেকে হেসে ফেলেন। কারও চোখে স্নেহ, কারও মুখে আনন্দ। আর ছোট্ট রাফান? চারপাশের দৃষ্টি টের পেয়ে লজ্জায় মায়ের বুকে মুখ লুকিয়ে ফেলে।
রাফান এসেছে বাবা-মা, মামা ও খালার সঙ্গে। তার মামা মুকুলের কণ্ঠে এদিন আলাদা আবেগ। তিনি বলেন, ‘কয়েক বছর দলীয় কার্যালয়ে কাজ করেছি। দীর্ঘদিন পর এমন একটি দিন—পরিবারকে সঙ্গে না আনলে যেন নিজের কাছেই জবাবদিহি থাকতো।’

তার কথায় ফুটে ওঠে ব্যক্তিগত স্মৃতি আর রাজনৈতিক সময়ের এক মিশ্র অনুভূতি। এ যেন কেবল রাষ্ট্রের অনুষ্ঠান নয়, ব্যক্তিগত ইতিহাসেরও এক পুনর্মিলন।
বসার জায়গা না পেয়ে পরিবারটি ছিল শপথস্থল থেকে খানিক দূরে। তবু দক্ষিণ প্লাজাজুড়ে স্থাপিত বিশাল জায়ান্ট স্ক্রিন দূরত্বের সীমা মুছে দেয়। কাছে থেকে না দেখেও দেখা—রাফানের বিস্মিত চোখে যেন সেই অভিজ্ঞতার উজ্জ্বল প্রতিফলন।
প্রথার পথ পেরিয়ে এদিনের আয়োজনও ছিল ভিন্ন। এতদিন যেখানে বঙ্গভবন ছিল শপথের চিরচেনা মঞ্চ, সেখানে এবার জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজাই হয়ে ওঠে রাষ্ট্রক্ষমতার নতুন অধ্যায়ের প্রেক্ষাগৃহ। রাজনৈতিক পালাবদলের পর এই শপথ—একই সঙ্গে আনুষ্ঠানিক, প্রতীকী এবং ঐতিহাসিক।
দক্ষিণ প্লাজা সেদিন ছিল মানুষে মানুষে পূর্ণ। রাষ্ট্রপতি, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, বিদেশি প্রতিনিধি—সবাই উপস্থিত। ভিড়ের মধ্যেও চোখে পড়ে বৈচিত্র্য—শিশু থেকে প্রবীণ। কেউ স্মৃতির টানে, কেউ কৌতূহলে, কেউবা ইতিহাসের সাক্ষী হতে।
রাষ্ট্রের বড় মুহূর্তগুলো সাধারণত প্রোটোকল, ভাষণ আর আনুষ্ঠানিকতার আবরণে আবদ্ধ থাকে। কিন্তু সেই বিকেলে, এক শিশুর সরল উচ্চারণ সেই আবরণে এনে দেয় মানবিক এক ফাঁক। মনে করিয়ে দেয়—ইতিহাস শুধু নেতাদের নয়, দর্শকদেরও; শুধু দলিলের নয়, অনুভূতিরও।
জায়ান্ট স্ক্রিনে শপথের দৃশ্য চলতে থাকে। করতালি ভেসে ওঠে, ক্লিক ক্লিক ক্যামেরার ফ্ল্যাশ। আর ভিড়ের কোথাও, মায়ের কোলে মাথা রাখা রাফান হয়তো ভাবছে—আজ সে যাকে দেখলো, তাকে নিয়ে বড়দের এত উচ্ছ্বাস কেন। সময় হয়তো একদিন সেই উত্তরও তাকে বুঝিয়ে দেবে।
সেদিনের দক্ষিণ প্লাজার বিকেল তাই কেবল শপথের আনুষ্ঠানিকতা নয়; এক শিশুর বিস্ময়, এক পরিবারের আবেগ, আর এক রাষ্ট্রের চলমান ইতিহাসের এক মৃদু, উজ্জ্বল দৃশ্য।
এমইউ/ইএ