নাড়ির টানে বাড়ি ফেরা: কানায় কানায় পূর্ণ সদরঘাট

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৪:৪৯ পিএম, ১৮ মার্চ ২০২৬
লঞ্চে ঘরমুখো মানুষের উপচেপড়া ভিড়/ছবি: আশিকুজ্জামান

ঈদের ছুটি শুরু হতেই রাজধানী ছাড়তে শুরু করেছে লাখো মানুষ। প্রতি বছরের মতো এবারও দক্ষিণবঙ্গের প্রবেশদ্বার খ্যাত সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে দেখা গেছে ঘরমুখো মানুষের উপচেপড়া ভিড়। যান্ত্রিক শহরের কর্মব্যস্ততা ফেলে প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে নাড়ির টানে বাড়ি ফিরছে মানুষ।

বুধবার (১৮ মার্চ) সকাল থেকেই সদরঘাট টার্মিনাল এলাকায় যাত্রীদের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভিড়ও বাড়তে থাকে। বিশেষ করে পটুয়াখালী, ভোলা, বরগুনা ও বরিশালগামী লঞ্চগুলোতে যাত্রীদের চাপ সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে। অনেক যাত্রীকে ঝুঁকি নিয়ে লঞ্চের ছাদেও উঠতে দেখা গেছে।

ভোলাগামী যাত্রী রফিকুল ইসলাম বলেন, ঈদের সময় বাসে গেলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকতে হয়। তাই পরিবার নিয়ে লঞ্চে যাচ্ছি। কিন্তু আজ ঘাটে অনেক ভিড়, লঞ্চেও জায়গা পাওয়া কঠিন।

আসন্ন ঈদুল ফিতর সামনে রেখে রাজধানীর প্রধান নদীবন্দর সদরঘাটে যাত্রীদের চাপ আরও বাড়বে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। সরকারি তথ্যমতে, এবারের ঈদে নদীপথে প্রায় ৮ থেকে ১০ লাখ মানুষ দেশের বিভিন্ন জেলায় যাতায়াত করবেন।

jagonews24

যাত্রীদের নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক ও নির্বিঘ্ন যাত্রা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) এরই মধ্যে নানা প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে।

বিআইডব্লিউটিএ’র ঢাকা নদীবন্দর সদরঘাটের নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের যুগ্ম পরিচালক মুহাম্মদ মোবারক হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ঈদকে কেন্দ্র করে সদরঘাটসহ আশপাশের এলাকায় যাত্রীদের নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল যাত্রা নিশ্চিত করতে আগাম পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, প্রতি বছর ঈদকে ঘিরে নদীপথে যাত্রীর চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। বিষয়টি বিবেচনায় রেখে এবার সদরঘাটের পাশাপাশি বসিলা ও কাঞ্চন সংলগ্ন এলাকা থেকেও লঞ্চ চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যেন সদরঘাটে অতিরিক্ত চাপ কমে। এসব ঘাট থেকে প্রতিদিন ছয়টি করে লঞ্চ ছেড়ে যাচ্ছে।

বর্তমানে প্রায় ১৭০টির মতো লঞ্চ যাত্রী পরিবহনের জন্য প্রস্তুত। এর মধ্যে ৩৮টি রুটের মধ্যে ৩৩টি রুটে লঞ্চ চলাচল করছে। ঢাকা নদীবন্দর থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫৫ থেকে ৬০টি লঞ্চ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাচ্ছে। গত ঈদের শেষ সময়ে সর্বোচ্চ ১৩৭টি লঞ্চ ঢাকা বন্দর ছেড়েছিল।

দুপুরে বরগুনাগামী আরেক যাত্রী মাহবুব আলম জাগো নিউজকে বলেন, ডেকে বসার জন্য আগেই চলে এসেছি। কিন্তু এত ভিড় যে তিল ধারণের জায়গা নেই। তারপরও পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে বাড়ি যাওয়ার আনন্দটাই বড়।

বরিশালগামী যাত্রী নাসরিন আক্তার বলেন, শিশুদের নিয়ে এসেছি, তাই একটু ভোগান্তি হচ্ছে। তবে নদীপথে যাত্রা তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক বলেই লঞ্চে যাই।

jagonews24

বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, সদরঘাটে যাত্রীদের অন্যতম অভিযোগ কুলি হয়রানি। এ সমস্যা সমাধানে এবার নির্দিষ্ট পোশাক পরিহিত অনুমোদিত কুলিদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া যাত্রীদের জন্য ট্রলি সেবার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে, যেন তারা নিজেরাই মালামাল বহন করতে পারেন। অসুস্থ, অক্ষম বা বয়স্ক যাত্রীরা কুলিদের সহায়তা নিতে পারবেন।

ঈদ যাত্রায় অসুস্থ, বৃদ্ধ ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন যাত্রীদের জন্যও বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি প্রবেশ ফটকে হুইলচেয়ারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে এবং প্রশিক্ষিত ক্যাডেটদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যারা এসব যাত্রীকে নিরাপদভাবে লঞ্চ পর্যন্ত পৌঁছে দিতে সহায়তা করবেন।

পন্টুন এলাকায় যাত্রীদের টানাটানি, ক্যানভাসিং ও হকারদের উৎপাত বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। এবারে পন্টুন এলাকা ক্যানভাসার ও হকারমুক্ত রাখা হবে। কেউ যাত্রীদের জোর করে লঞ্চে তোলার চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

jagonews24

ঈদ যাত্রাকে নিরাপদ রাখতে র‍্যাব, নৌ-পুলিশ, ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো যৌথভাবে দায়িত্ব পালন করবে। সদরঘাট এলাকায় ৪ থেকে ৫টি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ বা কন্ট্রোল রুম সার্বক্ষণিক চালু থাকবে। এছাড়া মাঠ পর্যায়ে মোবাইল টিম ও মোবাইল ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করবেন।

লঞ্চের ফিটনেস ও নিরাপত্তা বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএর বন্দর পরিচালক এ কে এম আরিফ উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, ফিটনেসবিহীন কোনো লঞ্চকে নদীপথে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হবে না। প্রতিটি লঞ্চের কাগজপত্র ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা যাচাই করা হচ্ছে। আবহাওয়া পরিস্থিতির দিকেও নজর রাখা হবে।

ভাড়ার বিষয়ে তিনি বলেন, সরকার নির্ধারিত ভাড়া অনুসরণ করা হবে এবং কোনোভাবেই অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করতে দেওয়া হবে না। এরই মধ্যে লঞ্চ মালিকেরা যাত্রীদের স্বস্তির জন্য প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত ভাড়া কম নিচ্ছেন।

বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ যাত্রীদের উদ্দেশ্যে অনুরোধ জানিয়েছে, তারা যেন নির্ধারিত নিয়ম মেনে লঞ্চে যাতায়াত করেন এবং অতিরিক্ত ভিড়ের মধ্যে ঝুঁকি নিয়ে লঞ্চে না ওঠেন। কোনো ধরনের অনিয়ম বা হয়রানির শিকার হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত জানানোর আহ্বানও জানানো হয়েছে।

এমডিএএ/এমআরএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।