২০৩২ সালের মধ্যে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা
- অন্তর্বর্তী সরকার এডিপি থেকে প্রকল্পটি বাদ দেয়
- বিএনপি সরকার ফের এটি যুক্ত করতে যাচ্ছে
- নতুন সেতুতে থাকবে রেলসংযোগ
- সেতুটি যুক্ত করবে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়াকে
- দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ৪ দশমিক ৯ কিলোমিটার
রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে বাস নদীতে পড়ে বহু হতাহতের ঘটনায় ফের আলোচনায় এসেছে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্প। সংশ্লিষ্টদের যুক্তি, পদ্মা পাড়ি দিতে এখানে সেতু থাকলে হয়তো এমন দুর্ঘটনা নাও ঘটতো। সেই সঙ্গে ফেরিতে করে পারাপারের দুর্ভোগ লাঘবের বিষয়টি তো রয়েছেই।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) বৈদেশিক সহায়তা প্রাপ্তির সুবিধার্থে অননুমোদিত প্রকল্পের তালিকায় দ্বিতীয় পদ্মা সেতু প্রকল্পটি ছিল। তবে অন্তর্বর্তী সরকার চলতি অর্থবছরের এডিপি থেকে তা বাদ দেয়। বর্তমান বিএনপি সরকার ফের এটি সেখানে যুক্ত করতে যাচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩২ সালের মধ্যে সেতুটি নির্মাণ করা হবে।
২০১২ সালে ১১ জুন রাজধানীর নয়াপল্টনে ১৮ দলীয় জোটের গণসমাবেশে বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ঘোষণা করেছিলেন, তারা ক্ষমতায় গেলে শুধু একটি নয়, দুটি পদ্মা সেতু করা হবে। একটি হবে মুন্সিগঞ্জের মাওয়া ও শরীয়তপুরের জাজিরা দিয়ে এবং অপরটি রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ও মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া হয়ে। এখন যেহেতু মাওয়া দিয়ে একটি সেতু হয়েছে, তাই দৌলতদিয়া হয়ে দ্বিতীয় সেতু বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে সরকার।
আরও পড়ুন
বায়তুল মোকাররমে বসবে চলন্ত সিঁড়ি-১৬৪ ফুট উঁচু মিনার
ফারাক্কা থেকে দেশ বাঁচাতে হবে পদ্মা ব্যারাজ, ব্যয় ৩৪৪৯৭ কোটি টাকা
প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়ন সময়ের দাবি উল্লেখ করে সেতু বিভাগের যুগ্ম সচিব (উন্নয়ন অনুবিভাগ) মাহমুদ ইবনে কাসেম জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা এই সেতুর কাজ শুরু করবো। বর্তমান সরকারের ইশতেহারে প্রকল্পটি আছে।’
এজন্য নতুন করে সম্ভাব্যতা যাচাই করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, একটি পুরোনো সম্ভাব্যতা যাচাই আছে। এর পাশাপাশি নতুন করেও যাচাই করতে হবে। সেতু কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তা করা হবে। সেতু কত কিলোমিটার হবে, কোথা থেকে শুরু হবে, ব্যয় কত লাগবে- সব কিছু বের করতে হবে।
প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয় ১২ হাজার ৭৫০ কোটি
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় থেকে জানা গেছে, দ্বিতীয় পদ্মা সেতু করার জন্য প্রাথমিকভাবে ১২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের ২০২৩-২৪ অর্থবছরের এডিপির অননুমোদিত প্রকল্পের তালিকায় তা রাখা হয়েছিল। যার অনুমোদন প্রক্রিয়া অর্থ পাওয়া সাপেক্ষে শুরু হয়েছিল।
একটি পুরোনো সম্ভাব্যতা যাচাই আছে। এর পাশাপাশি নতুন করেও যাচাই করতে হবে। সেতু কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তা করা হবে। সেতু কত কিলোমিটার হবে, কোথা থেকে শুরু হবে, ব্যয় কত লাগবে- সব কিছু বের করতে হবে।- সেতু বিভাগের যুগ্ম সচিব মাহমুদ ইবনে কাসেম
এখন প্রকল্পটি নীতিগত অনুমোদন-পরবর্তী প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। নতুন করে সম্ভাব্যতা যাচাই করলে ব্যয় আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যা মেটাতে সরকারের নিজস্ব অর্থায়নের পাশাপাশি ঋণ নেওয়া হতে পারে।
বাঁচবে সময় ও অর্থ
বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ বলছে, দেশের মধ্য ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কিছু জেলার বাসিন্দাদের সেতুতে করে পদ্মা পারাপারের জন্য মাওয়া-জাজিরায় যাওয়া অনেক সময় ও অর্থ অপচয়ের ব্যাপার। তাই ঢাকা এবং দেশের পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, মাগুরা, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, নড়াইল, গোপালগঞ্জ, যশোর ও মাদারীপুরের দূরত্ব কমানোর জন্য পাটুরিয়া-দৌলতদিয়ায় দ্বিতীয় সেতু নির্মাণ করা প্রয়োজন। সে জন্য এখানে সমীক্ষা করা হয়।
বর্তমানে কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ ও রাজবাড়ী থেকে রাজধানীতে যেতে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়ায় ফেরিতে করে পদ্মা পার হতে হয়। যানবাহনের চাপ থাকায় প্রায়ই ঘাটে আটকে থাকতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। এ পথে ঢাকার সঙ্গে কুষ্টিয়ার দূরত্ব ১৭৫ কিলোমিটার। এছাড়া, সিরাজগঞ্জ ঘুরে যমুনা সেতু দিয়েও যাতায়াত করে এখানকার যানবাহন। সে ক্ষেত্রে দূরত্ব প্রায় ২৭০ কিলোমিটার। সেই পথেও প্রায়ই যানজট লেগে থাকে।
আরও পড়ুন
৭ বছরেও সংস্কার হয়নি শহীদ জিয়া শিশু পার্ক, আনন্দবঞ্চিত শিশুরা
সাইকেল লেনেও পার্কিং-দোকান, চলছে বাস-ট্রাক ঘেঁষে
অন্যদিকে, কুষ্টিয়া থেকে সড়কপথে যেদিক দিয়েই যাক, বাস-ট্রাকের ছয় থেকে সাত ঘণ্টা সময় লেগে যায়। কোনো কোনো সময় তার চেয়েও বেশি সময় লাগে। বর্তমান পদ্মা সেতু দিয়ে ঘুরে কুষ্টিয়া থেকে ঢাকায় যেতে পাড়ি দিতে হয় ২২৫ কিলোমিটার। মেহেরপুর-চুয়াডাঙ্গা থেকে লাগে কুষ্টিয়ার চেয়ে আরও এক ঘণ্টা বেশি।
নির্মাণ ২০৩২ সালের মধ্যে
পরিকল্পনা কমিশন জানিয়েছে, প্রকল্পের প্রস্তাব আসলে দ্রুত সময়ে পরবর্তী কাজ শুরু হবে। সরকার ২০৩২ সালের মধ্যে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়ায় দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা করছে। সেতুর দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ৪ দশমিক ৯ কিলোমিটার।
পরিকল্পনা কমিশনের অতিরিক্ত সচিব মো. আশরাফুজ্জামান জাগো নিউকে বলেন, ‘প্রকল্পটি সেতু বিভাগ পাঠালে দ্রুত সময়ে আমাদের পরবর্তী প্রক্রিয়া শুরু করবো। দ্বিতীয় পদ্মা সেতু সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে আছে।’
দ্বিতীয় পদ্মা সেতু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অনেক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা) চূড়ান্ত হলে তখন আমরা ঋণের জন্য উন্নয়ন সহযোগীদের চিঠি পাঠাবো। তবে এই পর্যায়ে প্রকল্পটি এখনো আসেনি।- অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা
সেতুতে থাকবে রেলসংযোগ
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দ্বিতীয় পদ্মা সেতুতে রেলসংযোগ থাকবে। ফলে রেলের নেটওয়ার্ক আরও বিস্তৃত হবে। এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ১৯৯৯ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত পদ্মা সেতুর প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়। সেখানে পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য উপযুক্ত দুটি পথ চিহ্নিত করা হয়েছিল। এর মধ্যে মাওয়া-জাজিরা পথটিকে সেতু নির্মাণের জন্য তখন বেছে নেওয়া হয়। ওই সময় আরেকটি নির্বাচিত পথ ছিল পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া। এখন এখানেই দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সেতুটি নির্মিত হলে রাজধানীর সঙ্গে দেশের মধ্য ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হবে। পাশাপাশি দেশের প্রধান স্থলবন্দর বেনাপোল ও দর্শনা এবং সমুদ্রবন্দর মোংলার সঙ্গে সংযোগ আরও সহজতর হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জাগো নিউজকে বলেন, ‘দ্বিতীয় পদ্মা সেতু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অনেক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা) চূড়ান্ত হলে তখন আমরা ঋণের জন্য উন্নয়ন সহযোগীদের চিঠি পাঠাবো। তবে এই পর্যায়ে প্রকল্পটি এখনো আসেনি।’
এমওএস/একিউএফ