বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ-কর অব্যাহতি চান পোল্ট্রি খাতের প্রান্তিক খামারিরা
বেশ কয়েকমাস ধরে সংকট চলছে পোল্ট্রি খাতে। খাদ্যের দাম বাড়লেও মুরগি ও ডিমের নায্যদাম পাচ্ছেন না প্রান্তিক খামারিরা। সঙ্গে বেড়ে গেছে নানান ধরনের রোগ-বালাই ও বাচ্চা মৃত্যুর হার। কমেছে ডিমের উৎপাদন।
এ পরিস্থিতিতে আসন্ন বাজেটে পোল্ট্রির শিল্পের ওপর করের বোঝা কমিয়ে অর্ধেকে নিয়ে আসার দাবি জানিয়েছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, পোল্ট্রি খাতের এই গভীর সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় বাজেটে পোল্ট্রি খাতের জন্য বিশেষ বরাদ্দ ও কর অব্যাহতি সুবিধা রাখা। আয়কর, আমদানি শুল্ক ও অগ্রিম আয়করে (এআইটি) সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রান্তিক খামারিদের জন্য সহায়ক বাজেট ব্যবস্থাপনা এখন জরুরি।
এ খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাজেটে ভালো ব্যবস্থাপনা না থাকলে পরবর্তীতে এ খাতে নিরুৎসাহিত হবে প্রন্তিক খামারিরা। এতে সাধারণ মানুষের সহজলভ্য প্রোটিনের সবচেয়ে বড় উৎস পোল্ট্রি শিল্প খাদের কিনারে গিয়ে পড়বে। বড় বড় করপোরেট কোম্পানির অধীনে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। ভোক্তাকে দ্বিগুণ দামে ডিম ও মুরগি কিনতে হতে পারে।
বেশ কয়েকজন খামারি জানিয়েছেন, পাঁচ বছরের ব্যবধানে দেশের এই পোল্ট্রি খাতে উৎপাদন খরচ বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি খরচ বেড়েছে চলতি বছরে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে তৃণমূল খামারে। এরমধ্যে চলমান জ্বালানি সংকটে পরিবহন ভাড়া ও খাদ্যের দাম বৃদ্ধি মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যে কারণে ব্যয়ের সঙ্গে আয়ের অঙ্ক না মেলায় খামার বন্ধ করে বেকার হয়ে পড়ছেন হাজার হাজার খামারি। চলতি বাজেটে এক লাফে করপোরেট কর ১৫ থেকে বাড়িয়ে ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধিসহ সব ধরনের কর ও শুল্ক বেড়েছে। এতে দফায় দফায় পোল্ট্রির খাদ্যসহ অন্যান্য উপকরণের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সার্বিক দিক দিয়ে বর্তমানে চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে দেশের অন্যতম এ শিল্প।
আরও পড়ুন
যে পাঁচ সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল বিশ্বের বাণিজ্য
বাঁশ শিল্পে বিষাদের ছায়া
এসব বিষয়ে বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিআইএ) সভাপতি মোশারফ হোসেন চৌধুরী জানান, বিশ্বের কোথাও খাদ্য উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত কোনো খাতের সঙ্গে এত উচ্চ কর নেই। বরং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো কর অব্যাহতি দিয়ে উদ্যোক্তা ও খামারিদের সহায়তা দিয়ে থাকে। অথচ কৃষিপ্রধান দেশ হিসেবে আমরা উল্টোটা করছি। যে কারণে বর্তমানের কর ও শুল্ক অর্ধেকে নামিয়ে নিয়ে আসা জরুরি। তাছাড়া প্রান্তিক খামারিদের আর টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। আর প্রান্তিক খামারি না থাকলে এ শিল্প পুরোটাই বড় করপোরেট কোম্পানির অধীনে চলে যাবে।
এসময় তিনি কিছু দাবি তুলে ধরেন। সেগুলো হলো- খামারিদের পণ্য বিক্রিতে ট্যাক্স ও ভ্যাট রাখা যাবে না, খামার থেকে শুরু করে খুচরা পর্যায়ে বাজারে ডিম বিক্রি পর্যন্ত যেসব মধ্যস্বত্বভোগী ও চাঁদাবাজি চলছে তা বন্ধ করতে হবে, বিদ্যুতের ভর্তুকিসহ সহজ শর্তে ঋণ এবং সরকারের কৃষক কার্ডে খামারিদের অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানান।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রিপন কুমার মন্ডল বলেন, পোল্ট্রি শিল্প বাঁচাতে চাইলে প্রথমে খাদ্যের দাম কমাতে হবে। কেননা খামারির মোট খরচের ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশই হয় খাদ্য কেনায়। কম দামে খামারিদের খাদ্য দিতে হলে খাদ্যের উৎপাদন খরচ কমাতে হবে। খাদ্য উৎপাদনের উপকরণ আমদানিনির্ভর হওয়ায় আয়কর ও শুল্ক কমাতে হবে।
তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনা জরুরি। পাশাপাশি দেশীয় খাদ্য উৎপাদনে উদ্যোক্তা তৈরি করে তাদের যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্কছাড়সহ নানান সুবিধা দেওয়ার পরামর্শ দেন এই অধ্যাপক। বর্তমানে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এ থেকে উত্তরণের এটিই একমাত্র পথ। যদি এর সমাধান না হয় তাহলে সহজলভ্য প্রাণিজ আমিষের এই উৎস গভীর সংকটে পড়তে পারে।
এনএইচ/কেএসআর