সংকট মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০১:৪৪ পিএম, ১৩ এপ্রিল ২০২৬
জাতীয় প্রেস ক্লাবের আব্দুস সালাম হলে বিএসআরইএর সংবাদ সম্মেলন

দেশের চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআরইএ)।

সোমবার (১৩ এপ্রিল) জাতীয় প্রেস ক্লাবের আব্দুস সালাম হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির নেতারা এ আহ্বান জানান।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বাংলাদেশ বর্তমানে গভীর জ্বালানি সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যার মূল কারণ আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ। বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত এলএনজি, কয়লা ও তেলের উচ্চমূল্যের কারণে সরকারকে প্রতিদিন আনুমানিক ২০০ কোটিরও বেশি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।

বাংলাদেশ সাস্টেইনেবল অ্যান্ড রিনিউএবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসআরইএ) সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ লিখিত বক্তব্যে বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষ করে সৌর বিদ্যুৎ দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব সমাধান হলেও এ খাতটি প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা পাচ্ছে না। বর্তমানে নবায়নযোগ্য জ্বালানির যন্ত্রপাতি আমদানিতে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক ও কর আরোপ রয়েছে, যা বিনিয়োগে বড় বাধা সৃষ্টি করছে। অথচ প্রচলিত জ্বালানি খাত বিভিন্ন পর্যায়ে ভর্তুকি ও নীতিগত সুবিধা পাচ্ছে, যা একটি নীতিগত বৈষম্য তৈরি করেছে।

তিনি জানান, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে সঠিক নীতিগত সহায়তা পেলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি দ্রুত জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। পাকিস্তান, ভারত, ভিয়েতনাম ও চীনের মতো দেশগুলো কর অব্যাহতি, কম শুল্ক এবং সহজ অর্থায়নের মাধ্যমে এই খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে বাংলাদেশে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি ও এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম আমদানিতেও উচ্চ শুল্ক বিদ্যমান, যা খাতটির বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে।

সংবাদ সম্মেলনে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনাসহ বিভিন্ন ভূ-রাজনৈতিক কারণে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৫-১২০ মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে এবং হরমুজ প্রণালি ঝুঁকির মুখে রয়েছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রুট।

এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার ৬০ শতাংশের বেশি আমদানিনির্ভর হওয়ায় মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ বিঘ্ন- উভয়ের চাপ একসঙ্গে পড়ছে। বর্তমানে এলএনজি আমদানির প্রায় ৭০ শতাংশ কাতারের ওপর নির্ভরশীল। তবে সরবরাহ ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ধরনের সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিএসআরইএ জানায়, বিদ্যুৎ খাতে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ২৫০০ এমএমসিএফডির বেশি হলেও সরবরাহ নেমে এসেছে ৮৫০-৯০০ এমএমসিএফডিতে। এতে প্রায় ১৫০০ থেকে ১৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ঘাটতির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এছাড়া, দেশে কৌশলগত জ্বালানি মজুদ মাত্র ৩৫-৪০ দিনের জন্য যথেষ্ট, যা উন্নত দেশের তুলনায় অনেক কম। জ্বালানির এই সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিল্প খাতে, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পে। গ্যাস সংকট ও লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদনশীলতা ৩০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাচ্ছে, যা রপ্তানি আয় ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা আরও বলেন, বর্তমান সংকট কেবল সাময়িক নয়; বরং এটি দেশের জ্বালানি কাঠামোর দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতার প্রতিফলন। তাই টেকসই সমাধানের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত রূপান্তর অপরিহার্য।

এ সময় সংগঠনটি বেশ কিছু সুপারিশ তুলে ধরে। এর মধ্যে রয়েছে- নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর শুল্ক ও কর কমিয়ে আনা, লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারিতে শূন্য শুল্ক নির্ধারণ, স্বল্পসুদে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন নিশ্চিত করা এবং স্থগিত থাকা সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা।

এছাড়া, রুফটপ সোলার কর্মসূচি পুনরায় চালু, নেট মিটারিং প্রক্রিয়া সহজীকরণ, সৌরচালিত সেচ পাম্প সম্প্রসারণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে কর অবকাশ প্রদানের সুপারিশও করা হয়।

বিএসআরইএর মতে, যথাযথ নীতি সহায়তা ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি দ্রুত দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন, বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসআরইএ) সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান সরকার রোজেল সিনিয়র সহ-সভাপতি জাহিদুল আলম, ও পরিচালক (অর্থ) নিতাই পদ সাহা সহ আরও অনেকে।

এনএস/এএমএ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।