ভারতের পরেই চীন সফর, ভারসাম্য কূটনীতিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কৌশলী যাত্রা
ভারত সফরের মাত্র এক মাসের মাথায় চীন যাচ্ছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। তার প্রথম বেইজিং সফরকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক নতুন গতি পাচ্ছে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক কূটনীতিতে আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠছে ঢাকার ‘ভারসাম্যনীতি’।
কূটনৈতিক সূত্র জানায়, আজ মঙ্গলবার (৫ মে) দুপুরে তিন দিনের সফরে চীনের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়বেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। এটি দায়িত্ব নেওয়ার পর তার প্রথম চীন সফর। সফরসঙ্গী হিসেবে থাকছেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। তারা কুনমিং হয়ে বেইজিং পৌঁছাবেন এবং ৭ মে দেশে ফিরবেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হবে ৬ মে বেইজিংয়ে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও কমিউনিস্ট পার্টির পলিটব্যুরো সদস্য ওয়াং ই-এর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক। একই দিনে চীনের উন্নয়ন সহযোগিতা বিষয়ক মন্ত্রী এবং উচ্চপর্যায়ের নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠক শেষে যৌথ বিবৃতি প্রকাশের বিষয়ে দুই পক্ষই নীতিগত সম্মত হয়েছে।
ঢাকা-বেইজিং সম্পর্ককে আরও ‘কৌশলগত ও বাস্তবমুখী সহযোগিতায়’ রূপ দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েই এ সফর। সফরে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি সহযোগিতা, পানি ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।
ঢাকা-বেইজিং সম্পর্ককে আরও ‘কৌশলগত ও বাস্তবমুখী সহযোগিতায়’ রূপ দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েই এ সফর বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়। সফরে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি সহযোগিতা, পানি ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।
বিশেষ গুরুত্ব পাবে তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প। প্রায় আট হাজার কোটি টাকার এই মহাপরিকল্পনায় চীনের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তার সম্ভাবনা রয়েছে। নদী শাসন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও দীর্ঘমেয়াদি পানি ব্যবস্থাপনায় এটি একটি বড় প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এছাড়া পূর্বাচলে চীনের সহযোগিতায় আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল নির্মাণ, মোংলা বন্দরের উন্নয়ন এবং বাংলাদেশে চীনা শিল্প-কারখানা স্থানান্তরের বিষয়গুলোও আলোচনায় আসতে পারে। কূটনৈতিক মহল মনে করছে, এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক নতুন মাত্রা পাবে।
আরও পড়ুন
দুই বছরের টানাপোড়েন শেষে বরফ গলাতে দিল্লি যাচ্ছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার অঙ্গীকার
চীন সফরে যাচ্ছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
সফরে চীনের প্রস্তাবিত বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগ (জিডিআই) নিয়েও আলোচনা হতে পারে। তবে একাধিক সূত্র জানায়, বাংলাদেশ এখনই এই উদ্যোগে যোগ দেবে না। একইভাবে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই), গ্লোবাল সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভ (জিএসআই) এবং গ্লোবাল সিভিলাইজেশন ইনিশিয়েটিভ (জিসিআই)-এর মতো বহুপাক্ষিক উদ্যোগগুলো নিয়েও সতর্ক অবস্থানে রয়েছে ঢাকা।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব উদ্যোগে ভূরাজনৈতিক প্রভাব জড়িত থাকায় সুবিধা— ঝুঁকি বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নিতে চায় বাংলাদেশ।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সফরকে ঘিরে আঞ্চলিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়েও নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। এর আগে গত ৭ এপ্রিল তিনি ভারত সফর করেন। দুই বড় শক্তির রাজধানীতে একের পর এক সফরকে অনেকেই বাংলাদেশের ‘সামঞ্জস্যপূর্ণ কূটনীতি’র অংশ হিসেবে দেখছেন।
সবসময়ই বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ককে প্রতিযোগিতামূলক নয়, বরং সহযোগিতামূলক হিসেবে দেখতে চায় বাংলাদেশ। ভারত ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে আলাদা দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে ঢাকা।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্কর্মকর্তারা জানান, সবসময়ই বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ককে প্রতিযোগিতামূলক নয়, বরং সহযোগিতামূলক হিসেবে দেখতে চায় বাংলাদেশ। ভারত ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে আলাদা দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে ঢাকা।
এরই মধ্যে বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্বকে বেইজিং সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছে চীন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দেওয়া এই আমন্ত্রণকে দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগও বেড়েছে। ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত একাধিক বৈঠকে পানিসম্পদ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, প্রযুক্তি সহযোগিতা ও জনসম্পর্ক বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
বিশেষ করে পানি ব্যবস্থাপনা খাতে ৫০ বছরের একটি মাস্টারপ্ল্যান তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে দুই দেশ। বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদী খনন এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় এই সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জেপিআই/কেএসআর