বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ
২০২৫ সালে ব্র্যাকের সেবা পেয়েছেন ২ কোটি ৬০ লাখ মানুষ
২০২৫ সালে দেশের প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ মানুষ ব্র্যাকের বিভিন্ন সেবা ও সহায়তা পেয়েছে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ্।
সোমবার (১১ মে) বেলা সাড়ে ১১টায় রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় তিনি এ তথ্য জানান। ব্র্যাকের বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে এ সভার আয়োজন করা হয়। সভায় ব্র্যাকের বার্ষিক প্রতিবেদনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিক ও কার্যক্রম তুলে ধরা হয়।
ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক বলেন, ব্র্যাক বাংলাদেশের জন্য এবং দেশের মানুষের কাছে দায়বদ্ধ। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালে দেশের প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ মানুষ ব্র্যাকের বিভিন্ন সেবা ও সহায়তা পেয়েছে, যা দেশের প্রতি ৭ জনে ১ জন মানুষের সমান।
আসিফ সালেহ্ বলেন, এ সময় ব্র্যাকের সহায়তা পেয়েছেন ১ কোটি ৯০ লাখ নারী এবং ২ লাখ ২৩ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি। সংস্থাটি যাদের কাছে সরাসরি পৌঁছেছে, তাদের প্রতি ৩ জনের মধ্যে ২ জনই নারী।
স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আর্থিক সেবায় অন্তর্ভুক্তি, দুর্যোগ ও সংকট মোকাবিলা, নিরাপদ পানি ও পয়োনিষ্কাশন (ওয়াশ), জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, অভিবাসন এবং দক্ষতা উন্নয়নসহ বিভিন্ন খাতে এসব সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
ব্র্যাকের বার্ষিক প্রতিবেদনে বেশ কিছু কথা তুলে ধরা হয়।
অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন
ব্র্যাকের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্ষুদ্রঋণ, আলট্রা-পুওর গ্র্যাজুয়েশন এবং দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আয় ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কাজ করছে ব্র্যাক। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচির আওতায় ঋণ সহায়তার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি নারী উদ্যোক্তা তৈরি এবং কৃষি সহায়তাও জোরদার করা হয়েছে। দারিদ্র্য বিমোচনে ৫ বছরে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার সম্পদ দেওয়া হয়েছে। ৩ লাখ ১২ হাজার অতিদরিদ্র পরিবার অতিদারিদ্র্য থেকে মুক্তি পেয়েছেন। মোট ঋণ সহায়তার পরিমাণ ২৯ হাজার কোটি টাকা থেকে সাড়ে ৪৮ হাজার কোটি টাকা হয়েছে।
স্বাস্থ্য ও পুষ্টি
কমিউনিটি-ভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবার মাধ্যমে মা ও শিশু স্বাস্থ্য, যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়া এবং অসংক্রামক রোগ মোকাবিলায় কাজ করছে ব্র্যাক। ৫ বছরে ২১ লাখ মা নিরাপদ প্রসবসেবা পেয়েছেন। ৩৫ লাখ মানুষের অসংক্রামক ব্যাধি, প্রতিবন্ধিতা ও চোখের সমস্যা শনাক্ত হয়েছে। ১০ লাখের বেশি যক্ষ্মা রোগী শনাক্ত ও চিকিৎসার আওতায়
এসেছেন।
অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা
ব্র্যাকের শিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে লাখো শিশু ও কিশোর-কিশোরী শিক্ষার সুযোগ পেয়েছে। প্রান্তিক ও জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার শিশুদের জন্য শিক্ষা, পুষ্টি ও মানসিক সহায়তা সমন্বিতভাবে দেওয়ার পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে। ৫ বছরে ৬ লাখ ৪৪ হাজার শিক্ষার্থী ব্র্যাকের শিক্ষা কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে, যাদের ৫৬ শতাংশ ছাত্রী দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীদের মেধাবিকাশ বৃত্তি দেওয়া হয়েছে। ১ হাজার ৭৪০ টি স্কুলে ৮ লাখ ৮ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য নিরাপদ খাবার পানি, স্যানিটেশন ও হাত ধোয়ার সুবিধা প্রদান করা হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ সহনশীলতা
জলবায়ু সহিষ্ণু কৃষি, নিরাপদ পানি, অভিযোজন ক্লিনিক এবং দুর্যোগ প্রস্তুতি কার্যক্রমের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সক্ষমতা বাড়াতে কাজ করছে ব্র্যাক। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ১১ লাখ দুর্যোগকবলিত পরিবার মানবিক সহায়তা পেয়েছে। ১ লাখ ৩৩ হাজার পরিবার জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় উপযুক্ত সমাধান পেয়েছেন। ১ লাখ ৫ হাজার ৭২৯ জন দুর্যোগ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষ জলবায়ু সহিষ্ণু প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিরাপদ পানি পেয়েছেন।
নারী ও সামাজিক ক্ষমতায়ন
নারী, কিশোরী ও তরুণদের নেতৃত্ব বিকাশ, আইনি সহায়তা এবং বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে ব্র্যাকের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। ৫ বছরে ৯৮ হাজার ৬০০ নারী ও শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত অভিযোগ নথিভুক্ত করেছেন এবং আইনি সহায়তা পেয়েছেন। ১ লাখ ২ হাজার কিশোরী আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি এবং লক্ষ্য অর্জনে উদ্বুদ্ধকরণ সহায়তা লাভ করেছেন। ২০২৫ সালে অংশগ্রহণকারীদের প্রত্যক্ষ উদ্যোগে ২ হাজার ২৩৭টি বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ করা হয়েছে।
আগামীর ব্র্যাক
আগামী পাঁচ বছরে নারী ও যুবসমাজকে কেন্দ্র করে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মানসম্মত শিক্ষা, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দেবে ব্র্যাক।
সমন্বিত উন্নয়নের ৭টি অগ্রাধিকারের মাধ্যমে ১০ লাখ কর্মসৃজন, ১৯ লাখ শিক্ষার্থীর শিখন ঘাটতি পূরণে সহায়তা পাবে, ২ কোটি মানুষ আর্থিক সেবার আওতায় আসবে, প্রতি বছর ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হবে, চর, হাওর, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও উপকূলীয় এলাকায় ২০০টি নতুন আর্থিক সেবাকেন্দ্র চালু করা হবে, বছরে ৭০ হাজার পরিবার আল্ট্রা-পুওর গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করবে (শহরে ২০ ও গ্রামে ৫০ হাজার), শহরাঞ্চলে আল্ট্রা-পুওর গ্র্যাজুয়েশন কর্মসূচির কার্যক্রম ১৭ জেলা থেকে ৩০ জেলায় সম্প্রসারিত হবে, জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ ২০টি জেলায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে, ১২ লাখ ৫০ হাজার নারী কৃষকের কাছে সহায়তা পৌঁছাবে, ২৬৮টি উপজেলায় ৬৫ হাজার কিশোরী প্রয়োজনীয় সহায়তা পাবে, ২৬৮টি লিগ্যাল এইড ক্লিনিকের মাধ্যমে আইনি সেবা আরও সহজলভ্য করা হবে, ৩৯ জেলায় স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে।
মতবিনিময় সভায় ব্র্যাকের ঊর্ধ্বতন পরিচালক (অ্যাডভোকেসি, কমিউনিকেশনস অ্যান্ড এনগেজমেন্ট) কেএএম মোর্শেদ, পরিচালক (মিল, রিস্ক ম্যানেজমেন্ট, সেফগার্ডিং অ্যান্ড সোশ্যাল কমপ্লায়েন্স) আফম শহিদুর রহমানসহ ঊর্ধ্বতন পরিচালক ও পরিচালকেরা বক্তব্য দেন।
এমএমএ/এমএএইচ/