বিচারকদের জন্য শৃংখলা বিধিমালা হচ্ছে
বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের জন্য পৃথক শৃংখলা বিধিমালা তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের নির্দেশনার আলোকে আইন মন্ত্রণালয় এ উদ্যোগ নিয়েছে। এ সংক্রান্ত বিধিমালা প্রণয়ন কমিটি ইতিমধ্যে একটি বৈঠকও করেছে। অধস্তন আদালতের বিচারকদের শৃংখলা বিধিমালা তৈরির বিষয়টি বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ মামলার (মাসদার হোসেন মামলার) ১২ দফা নির্দেশনার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
শৃংখলা বিধিমালা প্রণয়ন কমিটির সদস্য ও আইন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (প্রশাসন) মিজানুর রহমান খান বলেন, ‘শৃংখলা বিধিমালা তৈরির কাজ চলছে। আমরা কমিটি গঠন করে একটি মিটিং করে ফেলেছি। অনেক বড় কাজ। শেষ হতে সময় লাগবে।’
এদিকে প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগে মাসদার হোসেন মামলার শুনানিকালে এ বিধিমালা তৈরির জন্য রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সময় চান। এর পরিপ্রেক্ষিতে আদালত এই মামলার শুনানি চার সপ্তাহের জন্য মুলতবি করেন। তবে এতদিনেও কেন শৃংখলা বিধিমালা তৈরি সম্ভব হয়নি- এ ব্যাপারে মন্তব্য চাইলে মাসদার হোসেন মামলার প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার এম আমীর উল ইসলাম কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
১৯৯৯ সালে মাসদার হোসেন মামলার রায়ে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে পৃথকীকরণের জন্য সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ ১২ দফা নির্দেশনা দেন। এসব নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে সরকারকে একের পর এক নির্দেশনা দিতে হয়েছে আপিল বিভাগকে। সরকারের অনাগ্রহ থাকায় বছরের পর বছর এই ১২ দফা নির্দেশনা অবাস্তবায়িত থেকে যায়। অবশেষে ২০০৪ সালে আদালত অবমাননার মামলাও করতে হয়েছে বাদীপক্ষকে। তারপরও বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের এ রায় বাস্তবায়ন হচ্ছিল না।
অবশেষে ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর ১২ দফা নির্দেশনার আলোকে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক ঘোষণা করে তখনকার সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। কিন্তু ওই ঘোষণাতেই শেষ। রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব আর সরকারের অনাগ্রহের কারণে ওই ১২ দফা নির্দেশনার বেশ কয়েক দফা আজও অবাস্তবায়িত রয়ে গেছে। এর মধ্যে রয়েছে বিচারকদের শৃংখলা বিধানের জন্য একটি স্বতন্ত্র বিধিমালা তৈরির নির্দেশনাটিও।
জানতে চাওয়া হলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা জানান, ২০০৭ সালে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের আগেই বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস বিধিমালা (কর্মস্থান নির্ধারণ, পদোন্নতি, ছুটি মঞ্জুরি, নিয়ন্ত্রণ, শৃংখলা বিধান এবং চাকরির অন্যান্য শর্তাবলী)-২০০৭ তৈরি করা হয়। কিন্তু এই বিধিমালায় দেখা যায় কয়েকটি ক্ষেত্রে বিচারকদের সরকারি কর্মচারীদের সঙ্গে একীভূত করে রাখা হয়েছে। বলা হয়েছে, আলাদা বিধান প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত সুপ্রিমকোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে ‘উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ’ (আইন মন্ত্রণালয়) সরকারের একজন প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ১৯৮৫ সালের শৃংখলা বিধিমালার প্রয়োজনীয় অভিযোজন সহকারে বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের শৃংখলা বিধান করবে। এ রকম ব্যবস্থা রাখা হয়েছে বিচারকদের অবসর গ্রহণ, পেনশন, ভবিষ্যৎ তহবিল ইত্যাদি ক্ষেত্রেও।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বিচার বিভাগ পৃথক ঘোষণার পরও বিচারকদের শৃংখলা বিধানের বিষয়টি এক প্রকার সরকারের হাতে রেখে দেয়া হয়েছে। যখনই কারও বিরুদ্ধে শৃংখলা বিধানের প্রশ্ন উঠবে, সেই প্রশ্ন ১৯৮৫ সালের শৃংখলা ও আপিল বিধিমালা বলে সরকারের হাতে। শৃংখলা বিধানের উপলব্ধি হতে হবে সরকারের। সরকার এটা অনুভব করলে সে সুপ্রিমকোর্টের সঙ্গে পরামর্শ করবে, না হলে করবে না। এই বিধানের মধ্য দিয়ে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করে থাকে সরকার। এ বিধান সংবিধানের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।
বিচারকদের জন্য পৃথক শৃংখলা বিধিমালা তৈরির নির্দেশনাটি বাস্তবায়নের জন্য আপিল বিভাগ সর্বশেষ গত ৮ ফেব্রুয়ারি আদেশ দেন। আপিল বিভাগের নির্দেশনার আলোকে বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের জন্য পৃথক শৃংখলা বিধিমালা প্রণয়নসংক্রান্ত একটি কমিটি গঠন করেছে মন্ত্রণালয়। যে কমিটির সভাপতি করা হয়েছে যুগ্ম সচিব শফিকুল ইসলাম তালুকদারকে। এ ছাড়া কমিটির সদস্য হিসেবে রয়েছেন উপসচিব (প্রশাসন) মিজানুর রহমান খান, উপসচিব (বাজেট ও উন্নয়ন) শেখ হুমায়ুন কবীর এবং সিনিয়র সহকারী সচিব (বিচার শাখা-১) উৎপল চৌধুরী। কমিটির সদস্যসচিব করা হয়েছে সিনিয়র সহকারী সচিব মোশতাক আহাম্মদকে। এই কমিটি গত ৫ মার্চ প্রথম সভা করে।
সূত্র : যুগান্তর
এসএইচএ/আরআইপি