শিল্পী মাত্রই বৈশাখের পূজারী
শিল্পী মনন মাত্রই সুন্দরের পূজারী, তাই বলে কিন্তু অসুন্দর উপেক্ষিত নয়। ভালোবাসা আবেগ অনুভূতি সম্পন্ন মানুষেরা শিল্পীর চোখে দেখেন সবকিছু। ব্যস্ততার কারণে বোঝা না গেলেও উপলক্ষ মাত্রই শুভ ও অশুভ পাশাপাশি আসে সমান্তরালে। বৈশাখ যেন এমনই মোক্ষম উপলক্ষ। আর বৈশাখ আগমনও যেন একই উদ্দেশ্যে।
জাতপাত আর অসুন্দরের বালাই নেই। যারও ব্যস্ততা সেও প্রিয় মানুষটির হাত ধরে বেড়িয়ে পড়েছেন আজ রাজধানীর কোলাহলে। সবাই দেশীয় সাজে সেজে পান্তা ইলিশে মুখে গুজে বেড়িয়েছেন।
যার ঘরেও বা ইলিশের কদর নেই সক্ষমতার অভাবে, সেও কিন্তু কম যাচ্ছেন না। পোড়া মরিচের বারুদ ঝালের স্বাদে পান্তা খেয়ে বেড়িয়েছেন বউ কিংবা প্রিয়জনকে সঙ্গে নিয়ে।
বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ। দিনটিকে কেন্দ্র করে সাংস্কৃতিক বলয় গড়ে উঠেছে যেন পুরো রাজধানীজুড়ে। বৈশাখের আগমনে রাজধানীর চিত্রটাই যেন হয়ে উঠে গ্রামীণ। রাজধানীর সবচেয়ে আকর্ষণস্থল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, রমনা বটমূল, ছবির হাট, কিংবা নানা পার্ক।
উৎসবের অন্যতম অংশ তরুণ-তরুণী। তরুণীদের সাজের অন্যতম একটি অংশ মাথায় ফুলের খোপা। এটি ছাড়া নারীর সাজ যেন পূর্ণতা পায় না। এ ছাড়া বৈশাখে ঘর সাজাতে এবং নববর্ষের উপহার হিসেবে ফুলের জুড়ি নেই। লাল-নীল পাঞ্জাবিতে তরুণ আর বাহারী রঙয়ের শাড়িতে তরুণীরা সেজে মাতিয়ে রেখেছে রাজধানী।
রাজধানীর চিত্র দেখে মনে পড়ে যায় বহু বছর আগে লেখা আহসান হাবীবের পঙক্তিটি...প্রেমহীন সেই বন্ধুর দেশে নীড় বাঁধলাম তবু/এই মন আর এ-মৃত্তিকায় বিচ্ছেদ নাই কভু।
ঘাতকের মনে কেবলই জিঘাংসা কাজ করলেও? ঘাতকও ভালবাসে ফুলেল ঘ্রাণ। এমন দিনে শত্রু কিংবা মিত্রের মধ্যে ব্যবধান কমে আসার মোক্ষম উপলক্ষও বটে। তাই আশা সঞ্চারিত হচ্ছে, কমে আসবে সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবধান।
ভালবাসা, আনন্দ, স্নেহ, মায়া, মমতায়, শ্রদ্ধায়, বিয়ে, জন্মদিন, পূজা, পার্বণ, ধর্মীয় ও বাঙালি উৎসবে ফুল হয়ে ওঠেছে জীবনের অন্যতম অনুষঙ্গ।
শাহবাগ. রমনা, ছবির হাট ও হাতিরঝিলের পাড় এলাকা তরুণ-তরুণীদের অভয়ারণ্যে রুপ নিয়েছে। ফুল দিয়ে নানাভাবে মাথায় খোপা বেঁধেছেন মেয়েরা। তার সঙ্গে পিছিয়ে নেই শিশুরাও। তারাও তাল মিলিয়ে হাতে ও মাথায় ফুল দিয়েছেন।
বাঙালি ছেলেমেয়ে বা রমণ-রমণীদের বাহারী ডিজাইনের সাজগোজ এখন অনেকটা মজ্জাগত। মেয়েরা বৈশাখি শাড়ি, পায়ে নূপুর, নাকে দুল, হাতে রেশমি চুড়ি এক কথায় বলে বাঙালি সাজ। ছেলেরা ধুতি, ফতুয়া লুঙ্গি, পাঞ্জাবি, গলায় ঝুলায় গামছা আরও কতো কী নজর কাড়া সব সাজ!
বৈশাখী আবহ যেন বলে দিচ্ছে সবাই চায় দিনটিকে সব বাধা পেড়িয়ে সব সীমা ছাড়িয়ে বাঙালি ঐতিহ্যকে ফুটিয়ে তুলতে। এটাই নিজস্ব ঐতিহ্যের বহিঃপ্রকাশ। আর তাই বৈশাখ উপলক্ষে টাকার মূল্যায়নে ফুল কিনছেন না কেউ। টাকার চেয়ে ভালবাসার মানুষদের মন জয় করাই যেন প্রধান উদ্দেশ্য।
রাজধানীর বাইরে সুদূর মফস্বল শহর গুলোতেও পহেলা বৈশাখ বাঙালির আদি এবং অকৃত্রিম প্রাণের উৎসব। বাঙালির নিরেট ভালোবাসার দিন। ধর্মাধর্মীর বেড়াজাল ছেঁড়া মুক্ত স্বাধীন আনন্দ আবাহন।
গ্রাম বাংলায় পহেলা বৈশাখ মানে দোকানির হালখাতা, লাল রঙের জাব্দা খাতায় ফি বছরের বাকিতে পণ্য নেওয়া আটপৌরে বাঙালির চিরায়ত সংস্কৃতি।
হালখাতার দিনে দোকানে দোকানে ক্রেতেদের ভিড়। যে যেমন পারেন ধার শোধ করেন, আর শালপাতা বা কাগজের ঠোঙায় মিষ্টি-মিষ্টান্ন নিয়ে বাড়ি ফেরেন। আবার নতুন খাতায় নাম লিখিয়ে শুরু হয় সারা বছরের প্রচলিত কষ্টেসৃষ্টে কাটিয়ে দেওয়ার লিখন!
জেইউ/বিএ/আরআই