দায়িত্বশীল নাগরিক ছাড়া স্মার্ট সিটি হতে পারে না
বাংলাদেশের নগর নিয়ে স্বকীয় উদ্ভাবনী ক্ষমতার বিকাশ ও উৎসাহ প্রদান করতে আগামী বছর থেকে ‘স্মার্ট সিটি ইনোভেশন এক্সেলেন্স অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান করা হবে। নগর সুশাসন, পরিকল্পনা, স্থাপত্য, গণ-যাতায়াত ব্যবস্থা এবং উদ্ভাবনী প্রযুক্তি এই পাঁচ ক্যাটাগরিতে এ পুরস্কার দেয়া হবে।
বঙ্গবন্ধু আর্ন্তজাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে স্মার্ট সিটি ক্যাম্পেইনের সমাপনী অনুষ্ঠানে এ ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এরপর রাজধানীর দিয়াবাড়ীতে এক বর্ণিল ঘুড়ি উৎসবের মধ্য দিয়ে ২৯ নভেম্বর শুরু হওয়া সপ্তাহব্যাপী ‘স্মার্ট সিটি ক্যাম্পেইন’-এর কার্যক্রম শেষ হয়।
বঙ্গবন্ধু নভো থিয়েটারে গত ২৯ নভেম্বর থেকে ১ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত ‘স্মার্ট সিটি উদ্ভাবনী প্রদর্শনীতে অংশ্রগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে চারটি ক্যাটাগরিতে পুরস্কার বিতরণ করা হয়।
স্মার্ট সিটি উইকের এই আয়োজনে অংশ নিয়ে আমন্ত্রিত অতিথিরা আশা প্রকাশ করেছেন ‘স্মার্ট নেতৃত্ব, স্মার্ট পলিসি, আইনের শাসন ও দায়িত্বশীল নাগরিক’ - এর সমন্বয়েই বাংলাদেশের শহরগুলো আধুনিক শহর হয়ে উঠবে। সবার অংশগ্রহণে ‘বাংলাদেশের স্মার্ট সিটি’ গড়তে তাই নাগরিকদেরও সংবেদনশীল এবং দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন নগর সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
তারা বলেছেন, দায়িত্বশীল নাগরিক ছাড়া কোনো শহর ‘স্মার্ট’ হতে পারে না। সেজন্য, এই প্রচারণা বাংলাদেশের সব শহর ও নগরে ক্রমান্বয়ে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য তারা র্স্মাট সিটি উইকের আয়োজকদের প্রতি আহ্বান জানান। এই প্রচারণার বিভিন্ন কার্যক্রমে ‘সবার অংশগ্রহণে শহর’ এই ধারণাকে বিকশিত করেছে। এজন্য তারা আয়োজকদের ধন্যবাদ জানান।
ইউএনডিপি বাংলাদেশ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এটুআই প্রকল্প ও বিভিন্ন অংশীদারদের সম্মিলিত উদ্যোগে অনুষ্ঠানটিতে বক্তব্য দেন এ কে খান অ্যান্ড কো. লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সালাহউদ্দিন কাশেম খান, সেন্টার ফর আরবান স্টাডিজের চেয়ারম্যান নগরবিদ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম, স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানী, পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, বাংলাদেশ ইনস্টিটিটিউট অব প্ল্যার্নার্সের সাধারণ সম্পাদক আকতার মাহমুদ, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সম্পাদক স্থপতি ইকবাল হাবিব, ইউএনডিপি বাংলাদেশের আরবান প্রোগ্রাম এনালিস্ট আশেকুর রহমান, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সারোয়ার জাহান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. হেলাল উদ্দিন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. নুরুল্লাহ, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যার্নাসের সভাপতি প্রফেসর আবুল কালাম এবং জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী মিয়া সেপ্পো।
অনুষ্ঠানে ‘কেমন শহর চাই’ শীর্ষক উপস্থাপনায় বেঙ্গল ইনস্টিটিটিউট ফর আর্কিটেকচার, ল্যান্ডস্কেপ অ্যান্ড সেটেলমেন্টের মহাপরিচালক স্থপতি খালিদ আশরাফ বলেন, ঢাকার যোগাযোগ ব্যবস্থাকে নেটওয়ার্কের আওতায় না আনলে যানজট সমস্যার সমাধান হবে না। আর এই নেটওয়ার্ক মূলত রেল নির্ভর হতে হবে।
‘ভবিষ্যৎ শহর’ শীর্ষক উপস্থাপনায় ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বাংলাদেশের নিজস্ব আঙ্গিকে ভবিষ্যতের শহর গড়তে ‘স্মার্টনেস’-এর প্রচলিত ধারায় আবদ্ধ না হতে পরামর্শ দেন। কোনো ধরনের বিভাজন তৈরি না করে অন্তুর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করে বাংলাদেশের উপযোগী আধুনিক শহর গড়ার পরামর্শ দেন তিনি।
বাংলাদেশের স্মার্ট সিটি কীভাবে গড়া যেতে পারে, তার ভিত্তি বা সূচক কী হতে পারে তার ওপরে বক্তব্য উপস্থাপন করেন ড. আকতার মাহমুদ। স্মার্ট সিটি ক্যাম্পেইনের আওতায় পরিচালিত অনলাইন জরিপ এ প্রাপ্ত তথ্য এবং বিশেষজ্ঞ মতামতের মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে দশটি বিষয়ে দুটি করে সূচক উপস্থাপন করেন তিনি।
তিনি তার বক্তব্যে বলেন, এই দশটি অগ্রাধিকারভিক্তিক বিষয় বাংলাদেশের স্মার্ট সিটি গড়ার ক্ষেত্রে প্রাথমিক ভিত্তি বা সূচক হতে পারে। উপস্থাপিত বিষয় এবং সূচকসমূহে নগর-সংশ্লিষ্ট সবাইকে তাদের গুরত্বপূর্ণ মতামত প্রদান করার জন্য অনুরোধ জানানো হয়।
বঙ্গবন্ধু নভো থিয়েটারে গত ২৯ নভেম্বর থেকে ১ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত ‘স্মার্ট সিটি উদ্ভাবনী প্রদর্শনীর’ অংশ্রগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে চারটি শ্রেণিতে পুরস্কার বিতরণ করা হয়। ‘স্মার্ট সিটি’ ক্যাটগরিতে চাঁদপুর, ঝিনাইদহ, ফরিদপুর এবং মংলা পৌরসভা নিজ নিজ শহরে উদ্ভাবনী কার্যক্রমের জন্য এ পুরস্কার লাভ করে।
অনুষ্ঠানে বাস্তবায়নাধীন হচ্ছে এবং আগামীতে হবে এমন আটটি স্মার্ট উদ্ভাবনী ধারণার জন্য নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন, ব্র্যাক, ওয়ার্ক ফর বেটার বাংলাদেশ ট্রাস্ট, ওয়াসা, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক এর স্থাপত্য বিভাগ, নগর উন্নয়ন অধিদফতর, প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন এবং রাজউক পুরস্কার লাভ করে।
শহরের যে কোনো সমস্যা সমাধান বা আধুনিক শহর গড়তে ভূমিকা রাখবে এমন যে কোনো ধারণা বা উদ্ভাবনের জন্য আগামী বছর থেকে পাঁচটি বিষয়ে ‘ইউএনডিপি বেঙ্গল স্মার্ট সিটি ইনোভেশন এক্সেলেন্স’ পুরস্কার প্রদান করা হবে।
নগরখাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণে একটি জুরি বোর্ড নতুন ঘোরষিত এই পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন প্রদান করবেন। পুরস্কারের জন্য নির্ধারিত পাঁচটি বিষয় বা খাত হলো- নগর সুশাসন, পরিকল্পনা, স্থাপত্য, গণ-যাতায়াত ব্যবস্থা এবং উদ্ভাবনী প্রযুক্তি। ‘ইউএনডিপি বেঙ্গল স্মার্ট সিটি ইনোভেশন এক্সেলেন্স’ পুরস্কারের বিস্তারিত ঘোষণা পরে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে।
প্রসঙ্গত. ক্যাম্পেইনে ‘স্মার্ট সিটি ইনোভেশন হাব’ নামে তিনদিনব্যাপী একটি জাতীয় প্রদর্শণী, ময়মনসিংহে হ্যাকাথন, পেশাজীবীদের সঙ্গে মতবিনিময়, সাইকেল র্যালি, ছবি প্রদর্শনী, রং তুলিতে শিশুর স্বপ্নের শহর, তৃণমূল সংলাপ, নিরাপদ নগর নিয়ে কমিউনিটির সঙ্গে পরামর্শ সভাসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
জেডএ/আইআই