‘হেফাজতে মৃত্যু’ আইন নিয়ে পুলিশই কষ্টে!

জসীম উদ্দীন
জসীম উদ্দীন , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১০:১৩ এএম, ১০ জানুয়ারি ২০১৮ | আপডেট: ১০:১৭ এএম, ১০ জানুয়ারি ২০১৮

আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হেফাজতে কোনো ব্যক্তির সুরক্ষা নিশ্চিত না হওয়া, নির্যাতন মৃত্যু হলে ভুক্তভোগী কিংবা তাদের পরিবারের কষ্ট হওয়া স্বাভাবিক। তবে পুলিশ বলছে অন্য কথা, এ বিষয়ে প্রণীত ‘নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন’ নিয়ে পুলিশ নাকি নিজেরাই কষ্টে রয়েছে!

পুলিশ সপ্তাহ ২০১৮ এর দ্বিতীয় দিন (মঙ্গলবার) রাতে রাজারবাগ পুলিশ লাইন অডিটোরিয়ামে আয়োজিত বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সচিবদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা এ কথা বলেন।

একই সঙ্গে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হেফাজতে কোনো ব্যক্তির সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রণীত ‘নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন’-এ অসঙ্গতি রয়েছে উল্লেখ করে তা সংশোধনের দাবি জানিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তারা।

সভায় উপস্থিত একাধিক কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করে জাগো নিউজকে জানিয়েছেন, আইনে পুলিশি হেফাজতে কোনো ব্যক্তির ‘মানসিক কষ্টের’ কথা উল্লেখ থাকলেও এর সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা না থাকায় উল্টো পুলিশ সদস্যরাই কষ্টে আছেন। সভায় আইনমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে সংশ্লিষ্ট আইনটি সংশোধনের উদ্যোগ নিতে অনুরোধ জানানো হয়েছে। নির্যাতনের অভিযোগে পুলিশের বিরুদ্ধে মামলায় জামিনযোগ্য বিধান রেখে বিদ্যমান আইনটির বিভিন্ন অসঙ্গতি সংশোধন দাবি জানানো হয়।

নির্যাতন এবং অন্যান্য নিষ্ঠুর, অমানবিক অথবা অমর্যাদাকর আচরণ অথবা শাস্তির বিরুদ্ধে জাতিসংঘ সনদের কার্যকারিতা প্রদানের লক্ষ্যে প্রণীত ‘নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন- ২০১৩’ এ ২ এর ৬নং ধারায় মানসিক কষ্টকে নির্যাতন আখ্যা দেওয়া হয়েছে।

সভায় অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মোখলেসুর রহমান বলেন, নির্যাতনে এবং হেফাজতে মৃত্যু নিবারণ আইনে মানসিক কষ্টের একটা বিষয় আছে। কিন্তু সুনির্দিষ্টভাবে মানসিক কষ্টের কোনো সংজ্ঞা দেওয়া সম্ভব না। আমরা যখন একটা লোকের বিরুদ্ধে মামলা দেই তখন সে মানসিক কষ্টে থাকে। আমরা যখন তাকে ধরে নিয়ে যাই কিংবা তাকে যখন জেলখানায় পাঠাই, তখনো সে মানসিক কষ্টে থাকে। তার মানসিক কষ্ট কিন্তু শেষ হয় না।

তিনি আরও বলেন, আইনে মানসিক কষ্ট সংযোজন করার ফলে আমরা নিজেরাই (পুলিশ) এখন কষ্টে আছি। কারণ এ আইনের ফলে এখন পুলিশেরই কর্মকর্তাদের ফাঁসানো হচ্ছে। পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা হলেও জামিনের বিধান নেই। পুলিশের সাধারণত তদন্তের সবচেয়ে বড় শক্তি উপ-পরিদর্শকরা (এসআই)। এ আইনের কারণে এসআই’রা মামলার তদন্ত করতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন।

পুলিশের বিভিন্ন থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) বিরুদ্ধেও এ আইনে মামলা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, একজন ওসি থানার দায়িত্বে থাকেন। যখনই তার বিরুদ্ধে মামলা হয়ে যায়, তখন সে জেলখানায় চলে যায়। কিন্তু আইনে জামিনের বিধান নেই। আমরা এ আইনটাকে বাতিল করতে চাই না, সংশোধন চাই। জামিনযোগ্য বিধান রেখে বিভিন্ন অসঙ্গতির সংশোধন চাই।

সভায় ডিআইজি মাহবুবুর রহমানও তার বক্তব্যে নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু নিবারণ আইনের সংশোধন দাবি করেছেন। এছাড়া সন্ত্রাস বিরোধী আইনেও কিছু অসঙ্গতির কথা তুলে ধরেন কর্মকর্তারা। পরে এ প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক যাচাই-বাছাই করে আইনের অসঙ্গতিগুলো সংশোধন করার আশ্বাস দেন।

ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া পুলিশ ক্যাডারে পদের বৈষম্যের কথা তুলে ধরে বলেন, আমি যখন এসপি ছিলাম, তখন যারা টিএনও ছিলেন তারা এখন সচিব। অথচ আমি চাকরির শেষ পর্যায়ে এসেও ওই পর্যন্ত যেতে পারিনি।

এ প্রসঙ্গে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ইসমত আরা সাদেক বলেন, প্রত্যেকটা ক্যাডার সার্ভিস পদেই অসামঞ্জস্যতা রয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটা সেলও গঠন করা হয়েছে। প্রত্যেক ক্যাডার পদ-পদবীর সমন্বয় করতে আমরা কাজ করছি।

অতিরিক্ত ডিআইজি (ট্রেনিং) খন্দকার মুহিত উদ্দিন বলেন, জনপ্রশাসনে প্রশিক্ষণ নীতিমালা অনুযায়ী নির্দিষ্ট পরিমাণ ভাতার কথা বলা আছে। বিভিন্ন প্রশিক্ষণ শাখায় কর্মরতরা নিয়মিত সেই ভাতা পেয়ে থাকেন। কিন্তু একাধিকবার উত্থাপন করেও পুলিশের প্রশিক্ষণ শাখায় কর্মরতরা কোনো ভাতা পান না। এর ফলে এ শাখায় কাজ করতে মেধাবীরা অনাগ্রহ প্রকাশ করে।

তিনি আরও বলেন, পুলিশের প্রত্যেকটি বিভাগ ও ইউনিটের জন্য আলাদা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রয়োজন। পেশাগত মান ও দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রত্যেকটি ইউনিট ও বিভাগের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এক ছাদের এক ভবনের নিয়ে আসার ব্যবস্থা নিতে হবে।

পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত উপ-মহাপরিদর্শক (এডিশনাল ডিআইজি) ড. শোয়েব রিয়াজ আলম বলেন, পুলিশের নতুন নতুন ইউনিট গঠিত হচ্ছে। এ জন্য ভবন ও ব্যারাট নির্মাণের জন্য জমি দরকার হয়। ভূমি মন্ত্রণালয় দ্রুত ছাড়পত্র দিলেও অর্থে আটকে যায়। অর্থ ছাড় পেলেও ভূমি ছাড়ে আটকে যায়। এসব বিষয় সমন্বয় হওয়া জরুরি। পুলিশের অনেক স্থাপনা খাস জমি হিসেবে রেকর্ড হয়ে গেছে। এসব উদ্ধারে মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা দরকার।

সভায় সভাপতির বক্তব্যে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক বলেন, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বেতনের দিকে দিয়ে গ্রেড-১ প্রধানমন্ত্রী দিতে বলেছিলেন ৫টি। দেয়া হয়েছে দুটি। আর গ্রেড-২ ১০টি চাওয়া হয়েছিল। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ৭টি দেয়ার জন্য অনুমোদন দেয়। কিন্তু পাস হয়েছে মাত্র একটি। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী দাবিকৃত গ্রেড-১ পদ ৫টি ও গ্রেড-২ পদ ১০টি বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রতি অনুরোধ জানান তিনি।

আইজিপি বলেন, রাজধানীর ৪৯টি থানার ১৫টিই ভাড়া বাসায়। আমরা চেয়েও জায়গা পাচ্ছি না। গণপূর্ত বিভাগে অনেক কাজ থাকে। আমাদের অনেক কাজ পার করে দিয়েছেন সহজেই। পুলিশ রিলেটেড প্রজেক্টগুলো যদি তড়িৎ গতিতে সম্পন্ন করা যায় তাহলে সুবিধা হয়।

তিনি আরও বলেন, আমাদের উন্নয়নের জন্য প্রতি বছর বাজেট দেয়া হয় ৪০০ কোটি টাকা। এ কাজ করতে গিয়ে কখনো সময় শেষ হয়ে যায়, কখনো কাজ থেকে যায় বাজেট ঘাটতির কারণে। শুরু করেও শেষ করা সম্ভব হয় না। উন্নয়ন কাজের জন্য যদি ১ হাজার কোটি টাকা বাজেট দেয়া হয় তাহলে আমাদের প্রজেক্টগুলো সম্পন্ন করা যাবে।

সভা সূত্র জানায়, সন্ধ্যা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত চলা এ সভায় এসব বিষয় ছাড়াও নিজেদের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় মন্ত্রীদের কাছে বিভিন্ন দাবি এবং প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেন পুলিশ কর্মকর্তারা।

সার্বিক বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, এবারই প্রথম বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের সামনে সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন দাবির কথা তুলে ধরেছে পুলিশ। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা এ বিষয়ে পজেটিভ সাড়া দিচ্ছেন। যার ফলে দাবি বাস্তবায়নে সহজ হবে।

জেইউ/আরএস/আইআই

আপনার মতামত লিখুন :