কোরাম সংকটে সংসদের ক্ষতি ১২৫ কোটি ২০ লাখ টাকা

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৩:১৬ পিএম, ১৭ মে ২০১৮ | আপডেট: ০৩:৫৩ পিএম, ১৭ মে ২০১৮

চলমান জাতীয় সংসদের ১৮তম অধিবেশন পর্যন্ত সংসদে ১৫২ ঘণ্টা ১৭ মিনিট কোরাম সংকট হয়েছে। যা প্রকৃত সময়ের ১২ শতাংশ। এতে রাষ্ট বা জাতীয় সংসদের ক্ষতি হয়েছে ১২৫ কোটি ২০ লাখ ৬৯ হাজার ৪৪৫ টাকা। প্রতিদিন সংসদের বৈঠক শুরুর পর ৩০ থেকে ৩২ মিনিট কোরাম সংকট হয়।

এছাড়া সংসদে ৩৫০ জন এমপির মধ্যে ৬০ জন উপস্থিত না থাকলেও কোরাম সংকট হয়।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) আয়োজিত পার্লামেন্ট ওয়াচ নামে সংসদ বিষয়ে এক ‘গবেষণাপত্রে’ এ তথ্য জানানো হয়। টিআইবি গত বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৪তম অধিবেশন থেকে ১৮তম অধিবেশন পর্যন্ত একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করে।

সংসদ অধিকতর কার্যকরের জন্য ১৪টি সুপারিশও দিয়েছে দুর্নীতিবিরোধী সামাজিক আন্দোলন নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানটি।

প্রতিবেদনটি উপস্থাপ করেন রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি পরিচালক মোহাম্মাদ রফিকুল হাসান। তিনি বলেন, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে জাতীয় সংসদের সংশোধিত বাজেটের মধ্যে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও বিভিন্ন ভাতা, সম্পদ ও অবকাঠামো মেরামত ও সংরক্ষণ, বিদ্যুৎ বিলসহ বিভিন্ন প্রাক্কলিত ব্যয় থেকে কোরামের টাকার হিসাব করা হয়েছে। ওই চার অধিবেশনে প্রতিদিনি গড় কোরাম সংকট ৩০ মিনিট। ওই চার অধিবেশনে কোরাম সংকটের কারণে ক্ষতি হয়েছে ৩৭ কোটি ৩৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৩৮ টাকা।

টিআইবি দেয়ার তথ্য অনুযায়ী, সংসদের ১৪তম অধিবেশন থেকে ১৮তম অধিবেশন পর্যন্ত কার্যদিবস ছিল ৭৬টি। এ সময়ে ২৬০ ঘণ্টা ৮ মিনিট সংসদ চলেছে। প্রতিদিন গড়ে তিন ঘণ্টা ২৫ মিনিট সংসদ চলেছে। ওই চার অধিবেশনে গড় উপস্থিতি ৩০৯। যা মোট সংসদের ৮৮ শতাংশ।

এমপিদের প্রধান কাজ আইন প্রণয়ন হলেও মাত্র সাত শতাংশ সময় ব্যয় হয়েছে আইন প্রণয়ন কাজে। এ সময়ে ২৪টি সরকারি বিল পাস হলেও প্রতিটি বিল পাস হতে সময় লেগেছে গড়ে ‘মাত্র’ ৩৫ মিনিট। সবচেয়ে বেশি সময় ব্যয় হয়েছে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবে। এ কাজে ৬৬ শতাংশ সময় ব্যয় হয়েছে।

তবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সংসদ সদস্যদের উপস্থিতি তুলনামূলক বাড়লেও মন্ত্রীদের উপস্থিতি কমেছে। সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ- উভয়ের উপস্থিতি বৃদ্ধি পেলেও বিরোধী দলের নেতার উপস্থিতি সংসদ নেতার চেয়ে উল্লেখ্যযোগ্যভাবে কম। তবে সরকারি ও বিরোধী উভয় দলের সংসদে দেয়া বক্তব্যে আর্থিক খাতে অনিয়ম ও দুর্নীতির উল্লেখসহ বাজেটে প্রস্তাবিত বিষয়ের ওপর গঠনমূলক আলোচনাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে টিআইবি।

টিআইবি প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অসংসদীয় ভাষার ব্যবহারও অব্যাহত ছিল। সংসদের বাইরের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ সম্পর্কিত ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিষয় উপস্থাপন করা হয়েছে। আর স্পিকার অসংসদীয় ভাষা ব্যবহার বন্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গত সংসদে চারটি কমিটির সভাপতি বিরোধী দল থেকে নেয়া হলেও এবার শুধু বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি বিরোধী দল থেকে নেয়া হয়েছে। সংসদের নারী এমপিদের উপস্থিতি উল্লেখ্যযোগ্য হলেও তাদের কার্যক্রম উল্লেখ করার মতো ছিল না।

প্রতিবেদনে বরাবরের মতো এবারও বিরোধী দল জাতীয় পার্টিকে নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। বলা হয়, ‘আইন প্রণয়নে জনমত যাচাই-বাছাই ও সংশোধনী প্রস্তাবের আলোচনার তুলনামূলকভাবে বিরোধী দল বেশি অংশ নিলেও তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেয়া হয়নি। এমনকি সংসদে বিরোধী দল নিজেদের ভূমিকা নিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছে তাতে নিজের দলের আত্মপরিচয় বা অবস্থান সংকট- এর প্রতিফলন ঘটেছে।

প্রতিবেদনে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। তাকে এ নিয়োগ দেয়া হলেও কোনো প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়নি। অথচ বিভিন্নভাবে তার পেছনে রাষ্ট্রের প্রতি মাসে খরচ পাঁচ লাখ টাকা। তিনি বিশেষ দূত হিসেবে কী দায়িত্ব পালন করছেন তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে প্রতিষ্ঠানটি।

সংসদের এ কোরাম সংকটকে উদ্বেগের বিষয় উল্লেখ করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘এটা সংসদ সদস্যদের সংসদীয় কার্যক্রমে ঘাটতির পরিচয়। কোরাম সংকট যাতে না হয় সেদিকে সবাইকে সচেতন হতে হবে।’

সংসদে আইন পাসের সময় কম হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমাদের পাশ্র্ববর্তী দেশ ভারতে একটি বিল পাস হতে গড়ে ২ ঘণ্টা ২৩ মিনিট সময় লাগলেও আমাদের লাগে ৩৫ মিনিটের মতো। এতে দেখা যায় এমপিদের সংসদের সার্বিক কার্যক্রমে যেমন ঘাটতি তেমনি আইন প্রণয়নেও ঘাটতি তার চেয়ে বেশি। সরকার দলীয় সদস্যদের ক্ষেত্রে সেই উৎসাহটা আরও কম।

এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন টিআইবির উপদেষ্টা সুলতানা কামাল, নির্বাহী ব্যবস্থাপনা উপদেষ্টা ড. সুমাইয়া খায়ের, জুলিয়েট রোজেটি প্রমুখ।

এইচএস/এমএমজেড/এমএআর/পিআর/জেআইএম