বীরাঙ্গনাদের আমরা সামাজিকভাবে স্বীকৃতি দেই না

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৬:০৫ পিএম, ১০ এপ্রিল ২০১৯
ফাইল ছবি

স্বাধীনতা আন্দোলনের সশস্ত্র সংগ্রামের সময় ধর্ষণের শিকার হওয়া বীরাঙ্গনাদের রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দেয়া হলেও আমরা সামাজিকভাবে স্বীকৃতি দেই না বলে মন্তব্য করেছেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক।

বুধবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয় ও রিইব কর্তৃক বীরাঙ্গনাদের সাক্ষ্য সংগ্রহের জন্য প্রণীত নির্দেশিকা ও সচিত্র কাহিনি প্রকাশনা’ অনুষ্ঠানে তিনি এ মন্তব্য করেন।

মোজাম্মেল হক বলেন, আমাদের সমাজে তাদের এই অবদানকে আমরা স্বীকৃতি দেই না। তাদের ভিন্ন চোখে দেখি। বর্তমানে যে সামাজিক অবস্থান সেই কারণেই অনেকে আর বলে না। সাহস নিয়ে কিছু মানুষ বলেছে, তার সংখ্যা খুবই নগণ্য। এটা এখন আর স্বীকার করতেও চায় না। সেই কষ্টের স্মৃতি, পুরনো স্মৃতি আর মনে করতে চায় না।

এ সময় বীরাঙ্গনা বা যুদ্ধকালীন সময়ে ধর্ষণের শিকার হওয়াদের নিয়ে কাজ করা ও কীভাবে আইনি কাঠামোর মধ্যে এনে তা বাস্তবায়ন করা যায় সে বিষয়ে কাজ করা হবে বলেও জানান মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী।

তিনি বলেন, স্বাধীন হওয়ার পর পরই বঙ্গবন্ধু সেই সমস্ত মা-বোনদের জন্য প্রায় প্রতি জেলায় একটা করে ক্যাম্প করেছিল এই নির্যাতিত মা-বোনদের আশ্রয়ের জন্য, থাকা-খাওয়া এবং কাজ করে যেন চলতে পারে তার ব্যবস্থা করেছিল। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সেই সমস্ত ক্যাম্প বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। রেশন, টাকা-পয়সা সব বরাদ্দ বন্ধ করে দিয়ে এমন অবস্থা হলো যে তারা গিয়ে কোথায় দাঁড়াবে? কোথায় আশ্রয় নেবে? কেউ কেউ আত্মহত্যা করেছেন। কারও কারও অত্যাচারিত, নিগৃহীত হয়ে জীবন কোনো মতে বেঁচে রয়েছে।

মোজাম্মেল হক বলেন, প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতায় আসার পর আবার সেই সমস্ত মা-বোনদের খবর নেয়া শুরু করেন। ইতোমধ্যেই তাদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে তাদের পুর্নবাসন, তাদের চলার জন্য ভাতা দেয়া শুরু করেছেন। আমাদের নেত্রী তাদের সর্বোচ্চ মর্যাদা মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি দিয়েছেন।

তিনি বলেন, তারা যে কলঙ্কিত নয়, তারা দেশের জন্য। তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদের ওপর পাশবিক নির্যাতন চালিয়েছিল। এর জন্য তো তারা দায়ী নয়। সেই জন্য দায়ী হচ্ছে ওই সমস্ত নরপশুরা এবং তাদের সহযোগীরা। আমাদের স্বাধীনতার জন্য যারা এত বড় ত্যাগ করলো তাদের স্বীকৃতি দিলাম না। যার ফলে ওনারা লজ্জায় অনেকে আত্মহত্যা করেছেন, অনেকে এখন আর পরিচয় দিতে চায় না। আমরা যখন তালিকা করছি, ব্যক্তিগতভাবে যাদের সঙ্গে পরিচয় আছে, তাদের যখন বলি তারা অস্বীকার করে যায়। বলে, আর বলতে চাই না। প্রায় ৫০ বছরে আমরা সেই পুরনো ইতিহাসটা ভুলে গিয়েছি।

মন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ দিন পরে হলেও সেই বীরাঙ্গনা মা-বোনেদের নিয়ে গবেষণা হচ্ছে। তাদের ত্যাগ রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি পাচ্ছে। জাতীয়, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পাচ্ছে। আমি সেই জন্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে যারা গবেষণা করে তাদের (বীরাঙ্গনা) সামাজিক অবস্থা পরিবর্তনের জন্য, সামাজিক স্বীকৃতি জন্য যারা দীর্ঘদিন ধরে লড়াই করে যাচ্ছেন, আন্দোলন করে যাচ্ছেন, মিছিল-মিটিং করে যাচ্ছেন তাদের কাছ কৃতজ্ঞতা জানাই। আমরা যা করতে পারি নাই, অন্তত পক্ষে বেসরকারি ভাবে হলেও আপনারা তা করেছেন বা ধরে রেখেছেন। সময় এসেছে, সম্মিলিতভাবে আমরা সবাই কেন ঐক্যবদ্ধভাবে এই দাবি করতে পারব না? সেই অবস্থায় নিয়ে যাওয়ার।

যুক্তরাজ্যের ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নয়নিকা মুখার্জী ও নাজমুন নাহার কেয়ার যৌথ উদ্যোগে যুদ্ধকালীন ধর্ষণের নীতি সম্মত সাক্ষ্যসংগ্রহের উদ্দেশ্যে ‘বীরাঙ্গনা’ নামে একটি ফিকশন উপন্যাস প্রকাশ করা হয়।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন রিসার্চ ইনিশিয়েটিভস, বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. মেঘনা গুহঠাকুরতা।

এইউএ/জেএইচ/এমএস

আপনার মতামত লিখুন :