দেশেই লিভার প্রতিস্থাপনে দারুণ ‘আত্মবিশ্বাসী’ বিএসএমএমইউ সার্জনরা

মনিরুজ্জামান উজ্জ্বল
মনিরুজ্জামান উজ্জ্বল মনিরুজ্জামান উজ্জ্বল , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ১১:৪৭ পিএম, ১৮ জুলাই ২০১৯

দেশে লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত রোগীদের সফল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে লিভার প্রতিস্থাপন করে তুলতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) লিভার সার্জনরা খুবই ‘আত্মবিশ্বাসী’।

গত ২৪ জুন বিএসএমএমইউতে প্রথমবারের মতো ২০ বছর বয়সী এক যুবকের লিভার ট্রান্সপ্লান্টের সফল অস্ত্রোপচার হয়। মাত্র ২৫ দিনের মধ্যেই কোনো ধরনের ইনফেকশন ছাড়া লিভারদাতা ও গ্রহীতা সুস্থ হয়ে ওঠায় লিভার সার্জনরা দারুণ আত্মবিশ্বাসী।

বৃহস্পতিবার দুপুরে বিএসএমএমইউয়ের মিল্টন হলে সিরাতুল ইসলাম নামের ওই রোগীর হাসপাতাল থেকে রিলিজ উপলক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য় অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া ও লিভার প্রতিস্থাপন অস্ত্রোপচারে নেতৃত্বদানকারী হেপাটোবিলিয়ারি, প্যানক্রিয়েটিক ও লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট সার্জারি বিভগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. জুলফিকার রহমান খান আত্মবিশ্বাসের সুরে বলেন, দেশে সফল লিভার প্রতিস্থাপনের অস্ত্রোপচারের জন্য চিকিৎসকদল প্রস্তুত।

তারা জানান, গত ২৪ জুন সিরাতুলের মায়ের দেয়া লিভারের একাংশ নিয়ে সিরাতুলের লিভার প্রতিস্থাপন করা হয়। আজ অপারেশনের ২৫তম দিন। লিভারদাতা সম্পূর্ণ সুস্থ আছেন। উনাকে হাসপাতাল থেকে আগেই ছাড়পত্র দেয়া হয়েছে। লিভার গ্রহীতাও বর্তমানে সুস্থ এবং আজ উনাকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেয়া হচ্ছে। তার ব্লাড প্রেসার এবং রেসপিরেশন নরমাল। স্বাভাবিক মুখে আহার গ্রহণ করছেন। তিনি হাইডোজের ইমিউনো সাপ্রেশন মেডিসিন পাচ্ছেন, তাই তার রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক কম। এ ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। তার প্রতিস্থাপিত লিভার কাজ শুরু করেছে।

তারা আরও জানান, সফলতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে আমাদের লিভার ট্রান্সপ্লান্টের জন্য স্থায়ী সরঞ্জামাদি যেমন- দুটি স্বতন্ত্র অপারেশন থিয়েটার, ল্যাব সুযোগ-সুবিধাসহ আইসিউ, সিআর্ম মেশিন, ডপলার আলট্রাসনোগ্রাম মেশিনসহ স্থায়ী অবকাঠামো প্রয়োজন।

উপাচার্য় জানান, চিকিৎসকদল প্রস্তুত থাকলেও অবকাঠামো নেই। তিনি এ ব্যাপারে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের আশ্বাস দেন।

যেভাবে লিভার প্রতিস্থাপিত হলো
২০ বছর বয়সী যুবক সিরাতুলের মায়ের বয়স ৪৯ বছর। তিনি তার ছেলেকে আংশিক লিভারদানে সম্মত হন। গত ১৫ জুন ওই যুবককে হেপাটোবিলিয়ারি, প্যানক্রিয়েটিক ও লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট সার্জারি বিভগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. জুলফিকার রহমান খানের অধীনে ভর্তি করা হয়। এরপর গত ২৪ জুন মায়ের কাছ থেকে আংশিক লিভার সংগ্রহ করে তার ছেলের লিভার ট্রান্সপ্লান্টের দিন ধার্য করা হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২৪ জুন ভোর ৬টা থেকে কার্যক্রম শুরু হয়। লিভার গ্রহীতার লিভার সম্পূর্ণ ফেলে দিয়ে লিভারদাতার লিভারের ডান অংশ সফলভাবে প্রতিস্থাপিত করা হয়। এই অপারেশন সম্পন্ন করতে মোট ১৬ ঘণ্টা সময় লাগে।

অস্ত্রোপচারে যারা ছিলেন
হেপাটোবিলিয়ারি, প্যানক্রিয়েটিক ও লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট সার্জারি বিভগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. জুলফিকার রহমান খানের নেতৃত্বে শল্য চিকিৎসকদলে ছিলেন অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মোহছেন চৌধুরী, সহযোগী অধ্যাপক ডা. বিধান চন্দ্র দাস, সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. সাইফ উদ্দিন এবং সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. নূর-ই-এলাহী।

রেসিডেন্ট চিকিৎসকদের মধ্যে ছিলেন- ডা. ওমর সিদ্দিকী, ডা. মোহাম্মদ ইমরুল হাসান খান, ডা. মোহাম্মদ মশিউর রহমান, ডা. রাসেল মাহমুদ, ডা. আব্দুল্লাহ মো. আবু আইউব আনসারি, ডা. সারওয়ার আহমেদ সোবহান, ডা. মো. নাজমুল হক, ডা. এস এম মোর্তজা আহসান, ডা. জাবিউল ইসলাম, ডা. মো. আবদুল কাইউম, ডা. মো. আরিফুজ্জামান, ডা. মো. আসাদুজ্জামান নূর, ডা. মোস্তফা মামুন ওয়ারিদ, ডা. একে আজাদ, ডা. সবিতা রানা, ডা. আজফার বিন আনিস এবং ডা. মো. ইমরান আলী।

জটিল অপারেশন সম্পন্নের সময় রোগীকে অজ্ঞান করার জন্য অ্যানেস্থেসিয়া, অ্যানালজেসিয়া ও ইনটেনসিভ কেয়ার মেডিসিন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক একেএম আখতারুজ্জামানের নেতৃত্বে অ্যানেস্থসিয়া টিমে ছিলেন- অধ্যাপক মো. আব্দুল হাই, ডা. ইকবাল হোসেন চৌধুরী, ডা. সাবিনা ইয়াসমিন, ডা. সন্তোষ কুমার মন্ডল, ডা. সঞ্জয় কুমার সাহা, ডা. মো. মোস্তফা কামাল এবং রেসিডেন্ট চিকিৎসকদের মধ্যে ছিলেন ডা. মো. আসিফ মাহমুদ, ডা. কল্যাণ দেবনাথ, ডা. সানাউল হক মাসুদ, ডা. শাহরিনা শারমিন, ডা. রকি দাস গুপ্ত, ডা. সুদীপ কুমার দাস এবং ডা. মো. কামরুল হাসান।

অপারেশন চলাকালীন ইমেজিং সংক্রান্ত কাজ সম্পন্ন করার জন্য ছিলেন রেডিওলজি ও ইমেজিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. এম এইচ মোস্তফা কামাল ও রেসিডেন্ট দীপক ভার্মা।

এই চিকিৎসকদলকে সহায়তা করেন ভারতের প্রতিথযশা লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট সার্জন ডা. পি বালাচন্দ্র মেননের চার সদস্য বিশিষ্ট টিম। এই ট্রান্সপ্লান্ট কার্যক্রমে নার্স, টেকনিশিয়ান, ওয়ার্ডবয়সহ সহায়ক ভূমিকা রাখেন ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিভাগ, নিউরোসার্জারি বিভাগ, কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগ, রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিং বিভাগ, ল্যাবরেটরি মেডিসিন বিভাগ, প্যাথলজি বিভাগ, বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগসহ অন্যান্য বিভাগের চিকিৎসকবৃন্দ।

এমইউ/বিএ

আপনার মতামত লিখুন :