পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা জোরদার ও দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে ১১১ সুপারিশ

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০১:২৬ পিএম, ২২ আগস্ট ২০১৯

পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা জোরদার ও দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে ১১১টি সুপারিশ করেছে এ সংক্রান্ত কমিটি। বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় কমিটি সুপারিশ সম্বলিত প্রতিবেদন পেশ করে। সভা শেষে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।

ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘গত ১১ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের ২৬ তম সভায় সড়ক পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা জোরদার এবং দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে সুপারিশ প্রণয়নের জন্য ১৫ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। সাবেক নৌপরিবহন মন্ত্রী ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি শাহজাহান খানকে এ কমিটির প্রধান করা হয়। পরবর্তী সময়ে আরও ৮ জন সদস্যকে কমিটিতে কো-অপ্ট করা হয়।’

তিনি বলেন, ‘কমিটি পরপর ৭টি সভার মাধ্যমে দুর্ঘটনার কারণ চিহ্নিত এবং সুপারিশমালাসহ প্রতিবেদন চূড়ান্ত করে। প্রতিবেদনে মোট ১১১টি সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে আশু করণীয় ৫০টি, স্বল্প মেয়াদী ৩২টি এবং দীর্ঘ মেয়াদী ২৯টি সুপারিশ।’

সুপারিশে সড়কে বিশৃঙ্খলা ও দুর্ঘটনার প্রধান প্রধান কারণগুলো উঠে এসেছে জানিয়ে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘সুপারিশে উঠে আসা বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে- সড়ক ও সড়কে চলাচলের পরিবেশ, অদক্ষ চালক, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, চালকের অসর্তকতা, সড়ক নির্মাণে প্রকৌশলগত ত্রুটি, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অধীনস্থ দফতর বা সংস্থার মধ্যে দায়িত্ব পালনে অনীহা। যানবাহন ও সড়ক ব্যবহারকারী তথা চালক, যাত্রী ও পথচারীসহ সবার অসচতেনতা; সড়কের পাশে বসবাসরত জনগণের অসতেচনতা ইত্যাদি।’

তিনি বলেন, ‘এ প্রতিবেদন অনুযায়ী সুপারিশগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ক সচেতনতা ও শিক্ষা, প্রচার প্রচারণা, মহাসড়কের প্রকৌশলগত বিষয়াদি, কারিগরি দিক, রাস্তার উপর বিভিন্ন স্থাপনা ও রাস্তার দুপাশে বৃক্ষ রোপন, হাট-বাজার ব্যবস্থাপনা বা ইজারা প্রদান, বাস স্টপেজ, বাস-বে, ডিভাইডার, লেন, লেভেল ক্রসিং, মহাসড়কের সাথে গ্রামীণ রাস্তার সংযোগ, ঢাকা শহরের বাস ফ্রাঞ্চাইজিং, ফিটনেসবিহীন লক্কর-ঝক্কর যানবাহন ইত্যাদি। এখানে ড্রাইভারদের প্রশিক্ষণ দেয়ার বিষয়টিও সুপারিশমালায় যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।’

দ্রুততম সময়ে সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের সভা ডেকে এসব সুপারিশমালা উপস্থাপন করা হবে জানিয়ে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘এখানে বসেই আমরা সভার তারিখ নির্ধারণ করেছি ৫ সেপ্টেম্বর। ওইদিন বেলা ১১টায় বিআরটিএ ভবনে সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের ২৭তম সভা অনুষ্ঠিত হবে। কাউন্সিলের সভায় এই রিপোর্টটি নিয়ে বিস্তারিত আলাপ-আলোচনা হবে। এবং সুপারিশমালা সংশোধন, সংযোজন ও প্রয়োজনীয় পরিমার্জনসহ অনুমোদন করা হবে। অনুমোদনের সঙ্গে সঙ্গে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াটা কীভাবে সম্পন্ন করা যাবে, এ ব্যাপারে একটা টাস্কফোর্স করার প্রস্তাব আছে। আমরা সেটাও ভাবছি।’

সড়ক পরিবহনমন্ত্রী বলেন, ‘এর মধ্যে নিরাপত্তা কাউন্সিলের সব সদস্যের কাছে এই রিপোর্টটি আমরা পাঠিয়ে দেব। এজন্য একটু সময় নিচ্ছি, তা না হলে আমরা এই মাসেই বসতাম। এই কাজটি যত দ্রুত করা সম্ভব ততই দুর্ঘটনা-যানজট এসব নিয়ে... আজকে এসব জাতীয় একটি দুর্ভাবনা হয়ে গেছে, এটা আসলে দুঃশ্চিন্তার বিষয়, এটা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি আমাদের যথেষ্ট ভাবাচ্ছে।’

‘অনেক রিপোর্টই এতদিন হয়েছে। প্রকাশেও প্রয়োজনের অতিরিক্ত সময় ব্যয় করা হয়েছে। বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াটা একেবারেই মন্থর। সুপারিশ করে কোনো লাভ নেই। যদি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াটা সঠিক ও যথাযথ না হয়। আমরা ভাষণের চেয়ে অ্যাকশনকেই বেশি গুরুত্ব দিতে চাই’, বলেন ওবায়দুল কাদের।

আইন প্রয়োগ, সচেতনতা সৃষ্টিসহ সবমিলিয়ে সমাধানে যে পথগুলো, সেগুলোকে সঠিকভাবে অ্যাকশন প্ল্যানের মধ্যে নিয়ে আসা হবে বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন মন্ত্রী।

সড়ক পরিবহন আইন প্রণয়নের এক বছর হতে চললো। আইনটি বাস্তবায়নের বিষয়ে কোনো আলোচনা আছে কিনা- জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, ‘সড়ক পরিবহন আইনের বিধিমালা, বিধি প্রণয়নের জন্য আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রী বিষয়টি নিয়ে বসেছেন। আলোচনা করেছেন, কয়েকবার বৈঠক করেছেন, অগ্রসরও হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে আমি ফোন করেছিলাম, তিনি এখন বিদেশে আছেন। আমরা আশা করি তিনি আগামীকাল দেশে ফিরবেন, তিনি আসার পার বিষয়টি এক্সপ্রেডাইড করা হবে। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দ্রুত হবে।’

সড়ক পরিবহন আইন বাস্তবায়নে কোনো বাধা আছে কি না- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াটা শুরু করার আগে কী করে বলব বাধা আছে কিনা। এই ধরনের কাজে বাধা চ্যালেঞ্জ থাকবে। এই চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করতেই হবে, সেই কমিটমেন্ট থাকলে কোনো বাধা বাধা হিসেবে থাকবে না।’

সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন গত বছর সড়ক পরিবহন আইনের বিভিন্ন ধারা বিরোধিতা করে কর্মবিরতি করেছে। তারা ৯টি দাবি জানিয়েছে। তাদের দাবিগুলো বিবেচনায় নেয়া হবে কিনা- এ বিষয়ে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আইন যিনি করেন, আইনমন্ত্রী আছেন। বাস্তবায়নের এনফোর্সমেন্টের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আছেন। আইনগত বিষয়টি ঠিক রেখে কীভাবে এটি অ্যাডজাস্টমেন্ট করা যায়- এখানে কারও সাথে কারও শত্রুতা নেই। আমরা চাই আইনের ভেতরে যতটা অ্যাডজাস্টমেন্ট-অ্যাকোমোডেশন করা যায়, সেটাই করা হবে।’

আইনটি কেন দ্রুত কার্যকর হচ্ছে না- জানতে চাইলে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী বলেন, ‘দেখুন আমি নিজেই তো চারমাস নষ্ট করলাম অসুস্থ হয়ে। ধৈর্য ধরেন না, আমরা তো এখন শুরু করেছি।’

সভায় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি ও সংসদ সদস্য শাহজাহান খান, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক সচিব মো. নজরুল ইসলাম, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির সভাপতি মো. মসিউর রহমান রাঙ্গা, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি সৈয়দ আবুল মকসুদসহ ঢাকা মেট্রোপলিটর পুলিশ, পুলিশ সদর দফতর, রাজউক নিরাপদ সড়ক চাই-এর প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।

আরএমএম/এমএসএইচ/আরআইপি