বিশ্ববিদ্যালয় ফেরত যে ছেলেটি স্বাধীনতার আগে বাড়ি ফেরেনি

আবু আজাদ
আবু আজাদ আবু আজাদ , নিজস্ব প্রতিবেদক চট্টগ্রাম
প্রকাশিত: ০৯:৫১ এএম, ০৫ জুলাই ২০২০
মুক্তিযোদ্ধা শওকত আলী

শওকত আলী ১৯৭১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন। মার্চের মাঝামাঝি যান তার বাবার কর্মস্থল চট্টগ্রামে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতেই ঢাকায় শুরু হয়ে গিয়েছিল গণহত্যা। খবরটি পেয়ে ঠিক থাকতে পারেননি শওকত। সকাল বেলা ছুটে গেলেন চট্টগ্রাম মেডিকেলের হোস্টেলে। বন্ধু শওকত হোসেন শুধু বললেন, ‘যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। যাবি?’। সঙ্গে সঙ্গে বন্ধুর জিপে চড়ে চট্টগ্রাম শহরে তারা টহল দিলেন। বাসা থেকে বেরিয়ে মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের আগে আর বাসায় ফেরেননি শুওকত আলী।

যুদ্ধ জয়ের নেশায় বাড়ি ছাড়া সেই শওকত আলী বীরপ্রতীক আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন অজানার দেশে। শনিবার (৪ জুলাই) সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থার তার মৃত্যু হয়। মেজর শওকত আলীর গ্রামের বাড়ি নওগাঁয় হলেও তার শেষ ইচ্ছায় চট্টগ্রামের গরীবুল্লাহ শাহ মাজার প্রাঙ্গণে দাফন করা হবে।

এম আশরাফ আলী ও শিরিন আরা বেগমের ছোট ছেলে শওকত আলী। বাবা ছিলেন রেলওয়ের চিফ ট্রাফিক ম্যানেজার। তাদের আদি বাড়ি নওগাঁর রাণীনগর উপজেলার কট্টেশ্বর গ্রামে। কিন্তু পার্টিশনের সময় আশরাফ আলীকে পাঠিয়ে দেয়া হয় চট্টগ্রাম। ফলে ছেলে শওকত আলীর জন্ম ও বেড়ে ওঠা চট্টগ্রাম শহরেই।

নার্সারি থেকেই শওকত আলী লেখাপড়া করেন নগরের সেন্ট প্ল্যাসিড হাইস্কুলে। ম্যাট্রিক পাস করেন ১৯৬৮ সালে। অতঃপর ভর্তি হন চট্টগ্রাম গভর্মেন্ট কলেজে। ১৯৭০ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাস করে চলে যান ঢাকায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে অনার্সে ভর্তি হন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র।

৭ মার্চ, ১৯৭১। শওকত আলী তখন জিন্নাহ হলের (বর্তমান সূর্যসেন হল) ১৫৪ নম্বর রুমে থাকেন। বন্ধুদের সঙ্গে চলে আসেন রেসকোর্স ময়দানে। খুব কাছ থেকে প্রথম দেখেন বঙ্গবন্ধুকে। মার্চের মাঝামাঝি চলে আসেন বাবার কর্মস্থল চট্টগ্রামে। চট্টগ্রামে প্রতিরোধ পর্বে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একাংশের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যুদ্ধ করেন। তারা ছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রথম ব্যাচ।

চকবাজারে প্রতিরোধ

এপ্রিল মাসে শওকতরা শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলেন চট্টগ্রাম শহরে। চকবাজার রোডে কক্সবাজারমুখী রাস্তার মুখেই ডিফেন্স ছিল তাদের। তিনতলা একটা বিল্ডিংয়ের দোতলায় থাকতেন। বামপাশে ছিল এক সেকশন বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেনা। আর সামনে এক সেকশন ইপিআর। পাকিস্তানি সেনাদের ঠেকাতে হবে। তাই পাশেই একটি মসজিদের ভেতর এলএমজি ফিট করে অপেক্ষায় থাকেন বাঙালি সেনারা। পাকিস্তানিরা আসতেই শুরু হয় গোলাগুলি।

ক্যাপ্টেন হারুন ও লেফটেন্যান্ট শমসের মবিন চৌধুরী ছিলেন সেখানে। ক্যাপ্টেন হারুন ছিলেন ইপিআরের। উনারা কমান্ড করতেন। সহযোগিতার জন্য অস্ত্রহাতে তাদের সঙ্গে থাকতেন শওকতরা। একপর্যায়ে পাকিস্তানিরা ট্যাঙ্ক নিয়ে আক্রমণ করলে শওকতদের এক সেকশন উড়ে যায়। টিকতে না পেরে তারা তখন চলে যান কালুরঘাট ব্রিজে।

কালুরঘাটে মরণপণ যুদ্ধ

১১ এপ্রিল কালুরঘাটে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরাট একটি দল তাদের আক্রমণ করে। এ সময় সেতুর পশ্চিম প্রান্তের বামদিকে তিনি ও আরও কয়েকজন গণযোদ্ধা প্রতিরক্ষা অবস্থানে ছিলেন। ডানদিকে ক্যাপ্টেন হারুন আহমদ চৌধুরী (বীর উত্তম ও পরে মেজর জেনারেল) ও কয়েকজন গণযোদ্ধা। পাকিস্তানি সেনারা তাদের ঘেরাও করে ফেলে। এ সময় হারুন আহমদ চৌধুরীর পেটে গুলি লাগলে তিনি সেতুর ওপর পড়ে যান। তখন প্রয়োজন হয়ে পড়ে তাকে উদ্ধারের। প্রচণ্ড গোলাগুলির মধ্যে এ কাজটি ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সেই ঝুঁকিপূর্ণ কাজটিই তিনি করেন। লেফটেন্যান্ট মাহফুজ (বীর বিক্রম ও পরে লে. কর্নেল) ও তিনি মিলে হারুন আহমদ চৌধুরীকে উদ্ধার করে সেতুর ওপারে নিয়ে যান। সেদিন এখানের যুদ্ধে তাদের আটজন শহীদ এবং শমসের মবিন চৌধুরী আহত অবস্থায় পাকিস্তানিদের হাতে বন্দী হন।

সে ইতিহাস নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা শওকত আলী নিজের জবানিতে বলেছিলেন, “ওখানে আমরা ডিফেন্স নিলাম। সামনে এক সেকশন ইপিআর। এরপর এইট বেঙ্গল। আর পেছনে ছিল বেঙ্গল রেজিমেন্ট। সবাই ট্রেইন্ড সোলজার (সৈনিক)। শমসের মবিন ও হারুন সাহেবের সঙ্গে থাকাই ছিল কাজ। উনারা বললে আমরা ফায়ার ওপেন করতাম। পুরো দলের কমান্ড করতেন মেজর মীর শওকত। কালুরঘাট ব্রিজে ফ্ল্যাগ দেখিয়ে গাড়ি পারাপার করা হতো। ফ্ল্যাগ হাউসের পজিশনে ছিলেন ক্যাপ্টেন হারুন। উনার সঙ্গে বন্ধু শওকত ছিল। পাশেই একটা বাঙ্কারে এ কে ফোরটি সেভেন নিয়ে পজিশনে শমসের মবিন। একটি ব্রিটিশ স্টেনগান নিয়ে তার সঙ্গে ছিলাম আমি।’

হঠাৎ ‘বাঁচাও’ বলে একটা চিৎকার হয়। শব্দটা আসছে ফ্ল্যাগ হাউস থেকে। কী হয়েছে? শুনলাম ক্যাপ্টেন হারুনের গুলি লাগছে...গুলি লেগেছিল তার পেটে। ভুঁড়ি প্রায় বেরিয়ে যাচ্ছিল। বন্ধু ফারুকও তখন এগিয়ে আসে। হারুন স্যারের পেটে আমার গামছাটা বেঁধে দিই। ওখানে একটা মাইক্রোবাস রাখা ছিল। ফারুককে বলি, ‘তুই স্যারকে নিয়ে পটিয়া হেল্থ কমপ্লেক্সে নিয়ে যা।’ ওটা না করলে তাকে সেদিন বাঁচানো যেত না।

Sawkat

হঠাৎ ইপিআরদের ওখান থেকে পাকিস্তান সেনাদের রকেট লঞ্চার মারার শব্দ পাই। বাইনোকুলার নিয়ে শমসের মবিন দেখেই বললেন, সর্বনাশ। ওরা তো খুব কাছে চলে এসেছে! আমি পজিশনে চলে যাই। দূরে একজন এগোলে ফায়ার করি। সঙ্গে সঙ্গে সে পড়ে যায়। তবুও ওরা এগোচ্ছিল। সেরু ভাই বললেন, ‘শওকত গো ব্যাক। আমি যেতে রাজি হই না। উনি বোঝালেন, আমাকে ধরলে জেনেভা কনভেশনে বিচার হবে। কারণ আর্মি অফিসার আমি। আর তোমাদের ধরলে স্পটেই গুলি করে মারবে ওরা।”

ফেনী নদীর যুদ্ধ

কালুরঘাটে প্রাণে বেঁচে গেলেও আরেক অপারেশনে ডান পায়ের গোড়ালিতে স্প্রিন্টার বিদ্ধ হয় এই যোদ্ধার। সেটা নিয়েই তিনি যুদ্ধ করেন সপ্তাহ দুয়েক। খাগড়াছড়ি জেলার রামগড়ের সাইডে পাকিস্তানিদের বাঙ্কার ছিল। মুক্তিযোদ্ধারাও ছিলেন কাছাকাছি। পাকিস্তানিদের বাঙ্কার দখলে নিতে হবে। শীতের রাতে ফেনী নদীতে বুক পর্যন্ত পানি পেরিয়ে শুরু হয় অপারেশন। কিন্তু তখনি শুরু হয় প্রচণ্ড গোলাগুলি ও শেলিং। হঠাৎ ছুঁটে আসা শেল থেকে স্প্রিন্টার ঢুকে যায় ডান পায়ের গোড়ালির নিচে। প্রথম বুঝতে পারেননি। রক্ত পড়তে দেখে গামছা দিয়ে বেঁধে দেন। সপ্তাহ দুয়েক পরেই পা যায় ফুলে। সেক্টর কমান্ডার দেখেই তাকে পাঠিয়ে দেন বেইজ হাসপাতালে, গৌহাটিতে। পায়ের এক্স-রে করে মুখের দিকে খানিক তাকিয়ে থেকে ডাক্তার বললেন, ‘ভেতরে তো স্প্রিন্টার। তুমি আছো কীভাবে?’ পরে অপারেশন করে ডান পায়ের গোড়ালি থেকে স্প্রিন্টার বের করে আনা হয়। দুই সপ্তাহ হাসপাতালে ছিলেন। অতঃপর কাউকে কিছু না জানিয়েই ক্যাম্পে ফিরে আসেন।

এরপর ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামানের নেতৃত্বে শওকত আলীরা অবস্থান নেন রাঙামাটি জেলার নান্নেরচড় থানার অন্তর্গত বুড়িরঘাট এলাকায়। ১৮ এপ্রিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কমান্ডো ব্যাটালিয়ন তাদের অবস্থানে আক্রমণ করে। তখন তাদের লোকবল খুবই কম। গোলাবারুদ নেই বললেই চলে। আছে শুধু অসীম মনোবল ও প্রত্যয়। এখানেও তারা নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে পড়ে দীর্ঘক্ষণ যুদ্ধ করে পিছিয়ে আসেন। মুন্সি আবদুর রউফ (বীরশ্রেষ্ঠ) এখানে শহীদ হন। বুড়িরঘাট থেকে পশ্চাদপসরণ করে তারা অবস্থান নেন মহালছড়িতে। ২৭ এপ্রিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কমান্ডো দল স্থানীয় মিজোদের (মুক্তিযুদ্ধের সময় সহায়ক বাহিনী হিসেবে যোগ দিয়েছিল ভারতের মিজোরাম রাজ্যের তৎকালীন সশস্ত্র বিদ্রোহী বাহিনী মিজো ন্যাশনাল ফ্রন্ট-এমএনএফ এর মিজো বাহিনী। মুক্তিযুদ্ধে সেই মিজো বাহিনীর নিজস্ব ঘাঁটি ছিল রাঙামাটিতে) সঙ্গে নিয়ে তিন দিক থেকে তাদের আক্রমণ করে। এ সময় তিনি ছিলেন ক্যাপ্টেন আফতাবুল কাদেরের (বীর উত্তম) সঙ্গে। তুমুল যুদ্ধের একপর্যায়ে আফতাবুল কাদের তার চোখের সামনেই গুলিবিদ্ধ হন। তখন শওকত আলীই ফারুক নামের একজনকে সঙ্গে নিয়ে তাকে উদ্ধার করে রামগড়ে নিয়ে যান।

শওকত আলী এরপর ভারতে যান। পরে যোগ দেন প্রথম বাংলাদেশ ওয়ার কোর্সে। প্রশিক্ষণ শেষে ১ নম্বর সেক্টরের মনুঘাট সাবসেক্টরে মুক্তিবাহিনীর একটি কোম্পানির কমান্ডার হিসেবে যোগ দেন। ফটিকছড়িতে এক যুদ্ধে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এক অফিসারসহ বিপুলসংখ্যক সেনা তাদের হাতে নিহত হয়।

সেক্টর ওয়ানে শওকত আলী যখন যোগ দেন তখন সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর রফিকুল ইসলাম। ইপিআর ও বেঙ্গল রেজিমেন্টসহ মোট ৩১০ জন সেনা দিয়ে উনি শওকতকে পাঠিয়ে দেন ফটিকছড়িতে। সেখানে কিরাম পাহাড়ে ডিফেন্স গড়েন শওকত আলী। পাকিস্তানি আর্মিদের ক্যাম্প তখন ছিল হাটহাজারিতে ও নাজিরহাট কলেজে। শওকত আলীর ট্রুপস সামনে এগিয়ে গিয়ে হিট করেই আবার ফিরে আসত। ফটিকছড়ির বাসস্ট্যান্ডের পাশে একবার অ্যাম্বুশে (গুপ্ত হামলা) শওকতদের এগারজন যোদ্ধা শহীদ হয়েছিলেন। কিন্তু ওইদিনই তারা উড়িয়ে দিতে সক্ষম হন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এক লেফটেনেন্ট কর্নেল, তিন মেজর ও দুইজন লেফটেনেন্টসহ ১৭২ জনের এক বাহিনীকে। তার নেতৃত্বে হেঁয়াকো-নাজিরহাটে তারা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করে কিছু এলাকা মুক্ত করে সেখানে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন।

মুক্তিযুদ্ধে সাহস ও বীরত্ব প্রদর্শনের জন্য শওকত আলীকে বীরপ্রতীক খেতাবে ভূষিত করা হয়েছে। শওকত আলীর বাড়ি নওগাঁ জেলার রানীনগর উপজেলার হলেও সেখানে তিনি থাকতেন না। চট্টগ্রামের নাসিরাবাদে ইশানা ভ্যালি আবাসিক এলাকার ২ নম্বর সড়কে বসবাস করে আসছিলেন। মেজর শওকত আলী স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়েসহ অসংখ্য সহযোদ্ধা ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

তথ্যসূত্র : গণমাধ্যমে শওকত আলীর সাক্ষাৎকার এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর ১।

এসআর/পিআর

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]